সুমাইয়ার মৃত্যু, এ দায় কার?

বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২০ ২:৫৩ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


শ্বশুড় বাড়ীর লোকজন সুমাইয়াকে হত্যা করেছে। নির্যাতন করে মেরে ফেলে ফ্যানের সাথে তার লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিলো। প্রমাণ করতে চেয়েছিলো মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। আজ তার মাস্টার্সের রেজাল্ট হয়েছে। ঢাকা ভার্সিটি থেকে সে প্রথম শ্রেণি পেয়েছে। এতো মেধাবী একটা মেয়ের স্বপ্ন নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। কতো সাধনা করে একটা মেয়ে ঢাকা ভার্সিটির মতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়। সেই মেধার আজ কোনো মূল্য থাকলো না।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী থাকবে ঘরের মধ্যে। তার চাকরী করার কোনো অধিকার নাই। বিয়ের পর থেকে বাবাই সুমাইয়ার ভরণ পোষণ দিয়ে আসতো। বাবার মৃত্যুর পর আর সুমাইয়াকে টাকা দিতে পারতো না পরিবার। এসব নিয়ে অত্যাচার করতো তার স্বামী ও শ্বশুড় বাড়ীর লোকজন। আইন অনুযায়ী একটা মেয়ের বিয়ের পর তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তার স্বামীর। সে ব্যর্থতা তো আছেই তাদের। তার উপর মেয়েটির স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্খাও ছিলো। সেটাও মেনে নিতে পারে নি তারা।

সুমাইয়া চেয়েছিলো সে বিসিএস দিবে, সরকারী চাকরী করবে। এটাই তার স্বামী ও শ্বশুড় বাড়ীর লোকজন মেনে নিতে পারে নি।

সমাজ কতো বদল হয়েছে, নারীরা এখন অনেক শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে সংসারের হাল ধরছে, স্বামীকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছে। এ যুগেও এসে সুমাইয়ার মতন মেধাবী ছাত্রীকে আমাদের হারাতে হলো। এই দায় কার?

একজন নারী স্বাবলম্বী হবে এটাই তার বড় দোষ। নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী চাকরী করার স্বপ্ন দেখেছিলো মেয়েটি। তার ভাবনা ঠিক ছিলো, কিন্তু তার ভাবনার সাথে মিলতে পারে নি অন্ধ সমাজ ব্যবস্থার মানুষগুলোর চিন্তা-চেতনা। সেই মানসিকতার বলি হতে হলো সুমাইয়াকে। এখানে অপরাধী দুটি পরিবারের লোকজন। পড়াশুনা শেষ না হতেই তাকে কেনো বিয়ে দিলো তার পরিবারের লোকজন? তারা জানতো তাদের মেয়ে মেধাবী। সে ভবিষ্যতে ভালো চাকরী করতে পারবে। আর নিজে স্বাবলম্বী হলে তার নিজের মতন চলতে পারবে। আমাদের সমাজ একটি মেয়ের বিয়ে হওয়াকে যতো সুখকর মনে করে, তার পড়াশুনাকে, তার স্বাবলম্বীতাকে ততোটা সুখকর মনে করে না। কারণ তারা স্বামীর ঘরটাকেই নারীর নিরাপদ আশ্রয় মনে করেন। এই শতকে এসেও আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা দেখতে পাচ্ছি। তাহলে নারী মুক্তির যে আন্দোলন সেটার স্বার্থকতা কোথায়?

বিয়ের আগে নারীদের পরিবারের বোঝা মনে করা হয়। পাড়াপড়শীরাও অন্য ঘরের নারীদের বিয়ে নিয়ে চিন্তায় থাকে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই এমন নারীদের শ্বশুড় বাড়ীতে পাঠাতে পারলেই নিজেদের মুক্ত মনে করে। তারপর সে কোন পরিস্থিতিতে আছে সেটা দেখার দায়ভার তাদের থাকে না।

আর সুমাইয়ার উপর নির্যাতনের বিষয়টি মা-বাবার পরিবার জানতো। তবুও তাকে সেই পরিবারেই থাকতে হয়েছে নির্যাতন সহ্য করে। কারণ আমাদের সামাজিক কাঠামোই হলো বিয়ের পর শ্বশুড় বাড়ীর সব কিছুকেই মেনে নিয়ে চলতে হবে। সমঝোতা করে চলাটাই এই সমাজের রীতি। মেনে নাও, মানিয়ে নাও।

এমন মৃত্যু আমরা আর চাই না। আমাদের অভিভাবকদেরও মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। মেয়ে কী চায় সেটাকে প্রধান্য দিতে হবে। অভিভাবক সবসময় সন্তানের মঙ্গল কামনা করবে এটাই স্বাভাবিক। এই মঙ্গল যেনো জীবন দিয়ে অর্জন করতে না হয়। স্বামী এবং শ্বশুড় বাড়ীর লোকজনকেও হতে হবে বউয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী।

স্বাবলম্বীতা নারীর প্রধান শক্তি। নারীরা জেগে উঠুক আপন শক্তি আর মেধায়। আর এটাও চাই না কোনো নারী স্বাবলম্বী না হয়েই বিয়ে করুক। একজন স্বাবলম্বী নারীই তার জীবনকে নিজের মতন করে পরিচালনা করতে পারে।


  • ৩৫৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কেয়া তালুকদার

কবি ও প্রাবন্ধিক কেয়া তালুকদারের তিনটি কবিতার বই বের হয়েছে; "পূর্ণতা ফিরে এসো", "ছায়ামানব" এবং কলকাতার কবি মোনালিসা রেহমান'র সাথে যৌথ বই ভালোবাসার সাতকাহন প্রকাশিত হয় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের একুশের বই মেলায়। ২০১৬ সালে পেয়েছেন 'সমতটের কাগজ' থেকে প্রাবন্ধিক হিসাবে পুরস্কার। ১৬ বছর আন্তর্জাতিক এনজিওতে চাকরী শেষে বর্তমানে "হেঁসেল" নামে রংপুরে একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। লেখকের লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে।