কিরণ (ধারাবাহিক উপন্যাস-পর্ব-৭)

মঙ্গলবার, মার্চ ১৯, ২০১৯ ৩:৫৯ AM | বিভাগ : সাহিত্য


কিরণ ও মালতি পরস্পরের চোখে তাকিয়ে থাকে। মুখে কিছু বলতে পারে না। মুখে না বলা কথা একে অপরের চোখ বুঝিয়ে দেয়। একে অপরের বুক ফেটে অঝোরে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়।

মৃত্যু এতো নির্মম কিভাবে হয়! কেন হয়! একটা ছোট বাচ্চাকেও এভাবে লড়াই করতে হয় মৃত্যুর সাথে! বন্যা তো কোনো অন্যায় করে নি। এখন তো তার হেসে, খেলে, বাচ্চামি করে কাটানোর সময়। দৌড়ে বেড়ানোর সময়। অথচ সে নিথর শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়! এ কেমন পরিহাস!

মালতির তো ওই বন্যাই একমাত্র বেঁচে থাকার প্রেরণা! ওই বন্যার জন্যই তো সে বেঁচে আছে! বন্যার মুখের দিকে তাকিয়েই তো সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন সাজিয়েছে! বন্যার জন্মের দুমাসের মাথায় ওর বাবা চলে গেলো। সেই তখন থেকে এখনও পর্যন্ত মালতি তো বন্যাকে বুকে জড়িয়েই কাটিয়ে এসেছে এতোটা সময়! এখন মালতি কি নিয়ে বাঁচবে! কাকে ওভাবে বুকে জড়িয়ে রাখবে! 

মালতির চোখে তাকানো যাচ্ছে না। কিরণ অসহায় হয়ে উঠেছে। মালতিকে দেখে কিরণের মায়ের মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে। তার মাও তো কতো স্বপ্ন সাজিয়েছে তাকে নিয়ে! অথচ কতো সময় পেরিয়ে গেছে, মায়ের সাথে, বাবার সাথে কিরণ দেখা করতে পারে নি। আর কখনো দেখা করতে পারবে কিনা সে জানে না। আজ সে সামনে এক সন্তানহারা মাকে দেখে নিজের মায়ের কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারছে। 

শুধু কি মা!

আর বাবা! সেই যে ছোটবেলায় বাবা রোজ রাতে আফিস থেকে ফিরে ঘুমন্ত কিরণকে জাগিয়ে কতো আদর করতো! ওই রাতেই তাকে নিয়ে বই খুলে বসতো পরের দিনের স্কুলের টাস্ক করানোর জন্য! কিরণের একটু জ্বর, সর্দি হলেই মা, বাবা দুজনই ব্যস্ত হয়ে উঠত!

বাবা, মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়েই বুকে স্বপ্ন রেখে বেঁচে থাকে, অজস্র ত্যাগ করে, রোদে পোড়ে, জলে ভেজে, তবু ছাতা হয়ে সন্তানদের রোদ, জল থেকে রক্ষা করে!

কিরণও কেঁদে উঠতে চায় আজ মালতির সাথে।

ডাক্তার বাবু, নার্সরা কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে ব্যর্থ মুখ নিয়ে। কিছু বলতে চায় ওরা। পারে না। চলে যায়। 

মালতি ও কিরণ আস্তে আস্তে কেবিনের ভিতরে ঢোকে। বন্যা শুয়ে আছে বিছানায়। একদম চুপচাপ! আর কোনো যন্ত্রণা নেই, শরীর খারাপ নেই, অস্থিরতা নেই। মালতি বন্যার পাশে বসে বন্যার মাথায় হাত বোলাতে থাকে, কপালে চুমু খায়। কিরণ দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে আর কিভাবে মালতিকে শান্তনা দেবে, জানে না। সেই শক্তিও আর কিরণের মধ্যে অবশিষ্ট নেই।

কিরণ কেঁদে ওঠে। অঝোরে কেঁদে ওঠে। চিৎকার করে ওঠে “মা” বলে। সে একটিবার মাকে দেখতে চায়। বাবাকে দেখতে চায়। সে একটিবার তার বাড়িতে ফিরতে চায়। মায়ের কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়। বাবার স্নেহের হাত বোলানোকে সে একটিবার উপলব্ধি করতে চায়। কিরণ ছুটে গিয়ে মালতিকে জড়িয়ে ধরে। আজ যেন মালতিকে জড়িয়ে ধরে সে বাবাকে, মাকে উপলব্ধি করতে পারছে! যেন মালতির মধ্যে সে সেই স্নেহের ছোঁয়া পাচ্ছে! মালতির শরীরের গন্ধ আর মা, বাবার গন্ধ যেন একই! যেন সব বাবা, মায়েদের স্নেহের ছোঁয়া ও গন্ধ একই হয়! কিরণ মালতিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। মালতিও কিরণকে চেপে ধরে। 

আজ এক সদ্য সন্তানহারা মা, ও বাবা – মাকে গভীর তৃষ্ণা নিয়ে ছুঁতে চাওয়া সন্তানের মিলনপর্ব বোধয় এমনই স্থির করা ছিল! বিধাতার লেখাতে কিরণ কখনো বিশ্বাস করে নি। তবু সে আজ বিশ্বাস করছে, “হয়তো বিধাতাই আজ এমন লিখে রেখেছে দুজন মানুষের গভীর তৃষ্ণায় মিলন পর্বকে!”

রাত কেটে যায়। কেবিনে বন্যার নিথর শরীর, কিরণ ও মালতি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে।

ভোর হতেই নার্স এসে কিরণ ও মালতিকে হাসপাতালের নিয়মানুযায়ী বাকি কাজগুলির কথা বলে। বন্যাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। ডাক্তারের কাছ থেকে ডেথ সার্টিফিকেট নিতে বলে।

মালতি মাথা নিচু করে রাখে। তার কাছে কোনো জবাব নেই। মুখে ভাষা নেই। কিরণ উঠে দাঁড়ায়। মালতিকে বন্যার পাশে বসিয়ে রিসেপশনে গিয়ে ফর্মালিটির বাকি কাজ সারে। সমস্ত খরচ জমা করে ডাক্তারের সাথে দেখা করে। সে ডাক্তারকে এই সংক্রামক রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। কিরণ হেরে যাবে না। সে এই মৃত্যুখেলার সামনে অসহায় হয়ে মাথা নত করবে না। বরং সে লড়বে। সে এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করবে, সমাধান খুঁজবে। এভাবে সে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মরতে দেখতে পারবে না। এভাবে সে অদৃষ্টের হাতে সব ছেড়ে, অসহায় হয়ে মরে যাবে না। বরং সে এক নতুন সূর্যের কিরণ হয়ে সবাইকে নতুন দিশা দেবে।

কিরণ – আমি জানতে চাই এই মৃত্যুর কারণ। আমি জানতে চাই কেন এতো মানুষ অসুস্থ হচ্ছে?

ডাক্তার – বাতাসে ফেন্টানিল হাইড্র ক্লোরাইড নামক একটি যৌগের মিশ্রণে অক্সিজেন গ্যাস দূষিত হয়ে উঠেছে এবং প্রশ্বাসের সাথে ফুসফুসে প্রবেশ করে তা ক্রমশ মানুষের শরীরে রক্তের সাথে মিশছে, মস্তিস্কে বাহিত হয়ে বিভিন্ন নার্ভসেলকে করাপ্টেড করে দিচ্ছে, এবং যার ফল মাল্টি অরগ্যান ফেইলিওর। ভীষণ দ্রুত এই যৌগ মিশ্রিত হচ্ছে বাতাসে, এবং তেমনই দ্রুততার সাথে জীবকুলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, জীবকুলকে সংক্রমিত করছে।

কিরণ – এর প্রতিকার কি?

ডাক্তার – পরিস্কারভাবে বলতে গেলে আমরা এই মুহূর্তে অসহায়। আমাদের হাতে এমন কোনো অ্যান্টিডট নেই বা এসে পৌঁছয়নি যা দিয়ে আমরা চিকিৎসা করতে পারি! এমন কোনো অ্যান্টিডট এখনও পর্যন্ত আমাদের অজানা। আমরা শুধু প্রাথমিক চেষ্টা করতে পারি আমাদের সর্বস্ব দিয়ে। চেষ্টা করতে পারি দূষিত অক্সিজেন যাতে রোগীর শরীরে আর প্রবেশ করতে না পারে। তবে চিকিৎসা শুরুর আগে যদি দূষিত অক্সিজেন প্রশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণের মাত্রা অনেকটা বেশি হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে আমরা অসহায়। কারণ ততক্ষণে মাল্টি অরগ্যান ফেইলিওর শুরু হয়ে গেছে। যা বন্যার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। আমরা এই মুহূর্তে যেটা করতে পারি, আপাতত যতটা পারা যায়, মানুষকে এমন একটা পরিবেশে আনা যেখানে কেবল বিশুদ্ধ অক্সিজেন সে নিতে পারে। কিন্তু এতো অক্সিজেনের সাপ্লাই দেওয়াও সম্ভব না। এর বাইরে আমাদের হাতে আর কিছুই নেই। 

কিরণ সমস্তটা বুঝতে পারে। সে বুঝতে পারে এটা এক বায়ো নিউক্লিয়ার ওয়ারের মতো কিছু একটা ঘটানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বাতাসে অতিরিক্ত পরিমাণে ফেন্টানিল হাইড্র ক্লোরাইডের যৌগ মিশিয়েই এই নাশকতা ঘটানো হয়েছে। যে জন্যই আকাশে এই কালো আস্তরণ। যে জন্য সবুজ গাছপালাও শুকিয়ে গেছে। 

কিরণের মাথায় দ্রুত খেলে যায়, “বায়ো নিউক্লিয়ার ওয়ারের নাশকতা, তারমানে এটা মানুষই করেছে। অতএব এই সমস্যা সমাধানের পথও খুঁজে বের করা যাবে। তাকে এখন আর থেমে গেলে চলবে না। যা করার, দ্রুত করতে হবে। এখন বিরহ করার সময় নয়। মানুষকে বাঁচাতে গেলে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবটা করতে হবে।” 

সে দ্রুত বন্যার মৃতদেহকে ময়নাতদন্তে পাঠিয়ে মালতির কাছে যায়। মালতিকে সে শক্ত হতে বলে সবটা খুলে ও বুঝিয়ে বলে। মালতি এখন এসব বোঝার অবস্থায় নেই, তবু কিরণ বলে, “এমত অবস্থায় তারা সকলেই বিপদের মুখে, মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে। মানুষকে বাঁচাতে গেলে যা করার এখনই করতে হবে। আর কোনো বন্যাকে এভাবে প্রাণ হারাতে দেওয়া যাবে না। তুমি শক্ত হও মালতি। এবার নিজেকে সামলাও। তুমি এখন থেকে আমার বাড়িতে থাকো। সবসময় থাকো। আমাকে হয়তো এখন কিছুটা সময় বাইরে থাকতে হবে। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে। নাহলে অসহায় হয়ে সবাইকে মরতে হবে।”

চলবে...


  • ১৫২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা