কন্যাটি আমার! কন্যাটি আর কারো নয়

সোমবার, জানুয়ারী ২৯, ২০১৮ ১১:২৪ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


দীপার মা বাবা এখন বুক চাপড়ে কাঁদছে। ছোট একটা মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলো। আমাদের সমাজে কন্যার বয়স কুড়ি পেরোলেই কন্যার বাপ মা কন্যাকে বিয়ে দেয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। কত সুন্দর আশা বুকে নিয়ে কন্যাকে সাজিয়ে গুছিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বাপ মায়ের আদরের কন্যাটি আর আদরের থাকে না, তাকে হয়ে উঠতে হয় 'অনুগত চরিত্রের অধিকারী'। কারো পরিবারে কন্যাটি প্রত্যক্ষভাবে বাধ্য হয় 'অনুগত' হতে, কারো পরিবারে পরোক্ষভাবে 'অনুগত' হতে হয়। আমাদের সমাজে অনুগত চরিত্রের বউদের খুব প্রশংসা হয়।

এটাই নিয়ম, কন্যাগুলোকে এই ধারণা দিয়েই বড় করে তোলা হয়। বাবার বাড়িতে যত আবদার, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে কোনো আবদার চলবে না। শ্বশুরবাড়িতে যে যত বেশী অনুগত, সেই বউয়ের তত সুনাম। ফলে অনুগত বউ খুব কষ্টে না পড়লে তার অনুগত জীবনের করুণ কাহিনী বাবা মাকে শোনাতে যায় না। ফলে সমাজে সংসারে ভারসাম্য টিকে থাকে।

তারপরেও কিছু কিছু পরিবারে অনুগত হয়েও পার পাওয়া যায় না। অনেক পরিবারে 'অনুগত চরিত্রের বউগুলো ভীষণ নির্যাতনের শিকার হয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পারলে হয়তো কন্যা বাবা মায়ের কাছে কেঁদে নালিশ জানায়।

আমাদের সমাজে বিবাহিতা কন্যার পাশে দাঁড়ানোর নিয়ম নেই, নিয়ম হচ্ছে বিবাহিতা কন্যাকে হাসিমুখে 'অনুগত জীবন যাপন' করে যেতে হয়। তাই বাবা মা তাদের এককালের আদরের কন্যাটিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার 'টর্চার ক্যাম্পে' ফেরত পাঠায়।

দীপার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছে। মাত্র দেড় বছর আগে বিয়ে হয়েছে মেয়েটির, শিক্ষিত যুবকের সাথে। বিয়ের পর থেকে মেয়েটি শ্বশুরবাড়িতে প্রচন্ডভাবে নির্যাতিত হয়েছে। নির্যাতন সইতে না পেরে বাবার কাছে এসেছে, সমাজের রীতি অনুযায়ী বাবা মা আদরের কন্যাকে 'অনুগত জীবনে' ফেরত পাঠিয়েছে।

নির্যাতন করার মধ্যে নিশ্চয়ই আনন্দ আছে, তাই নির্যাতনকারী সব সময় নির্যাতন করে। নির্যাতিত সব সময় নির্যাতিত হয়। দীপার স্বামী, শ্বশুর শাশুড়ি নির্যাতনকারীর দলে, তারা বার বার মেয়েটিকে নির্যাতন করেছে।
দীপা ছিলো নির্যাতিতার দলে, সব কিছুর সীমা আছে, নির্যাতন সইবারও সীমা আছে। মেয়েটি নির্যাতন সইতে পারে নি। তার মৃত্যু হয়েছে। কিভাবে মৃত্যু হলো, সেটাই রহস্য। স্বামী শ্বশুরের অত্যাচারে মৃত্যু হয়েছে নাকি

চরম যন্ত্রণা সইতে না পেরে দীপা আত্মহত্যা করেছে? দীপার স্বামীর বাড়ি থেকে বলা হয়েছে, দীপা আত্মহত্যা করেছে। দীপার বাবা মা বুক চাপড়ে বলছে, দীপাকে ওর স্বামী শ্বশুর মেরে ফেলেছে। দীপার মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করার প্রয়োজন আছে, তাইনা?

কন্যার বাবা মায়েদের এখন সজাগ হওয়ার প্রয়োজন আছে, তাই না? কি হয়, বিবাহিত কন্যাকে নির্যাতনের মুখে ঠেলে না পাঠিয়ে নিজের ভাতের থালা থেকে এক মুঠো ভাত খেতে দিলে? কন্যা কি খুব বেশী খাবে? কন্যা খেলে কি বাবা মায়ের ভাতের ভান্ডার ফুরিয়ে যাবে? অত্যাচারী স্বামী শ্বশুরের ঘর থেকে মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনলে কি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে? মারামারি কাটাকাটি করে সংসার করার চেয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করলে সমাজের কি ক্ষতি?

আমি তিন কন্যার মা, তিন পুত্রের মা যতখানি কষ্ট সয়ে তিন পুত্রকে জন্ম দেন, একই কষ্ট সয়ে আমি তিন কন্যাকে জন্ম দিয়েছি। পুত্রের মা যতখানি স্নেহ মমতা দিয়ে পুত্রকে বড় করে তোলে, আমিও আমার কন্যাদের ততখানি স্নেহ মমতা দিয়ে বড় করেছি। পুত্রের মা যেমন পুত্রকে সংসারী দেখতে চায়, আমিও কন্যাকে সংসারী দেখতে চাই। পুত্রের মা চায় তার পুত্র হবে সংসারের প্রভু, আমি চাই আমার কন্যা হবে তার স্বামীর যোগ্য সঙ্গী। কেউ প্রভু নয়, কেউ অনুগত নয়। কন্যাকে বিয়ে দেবো, মনে আশা থাকবে কন্যা শ্বশুরবাড়িতে নিজেও সুখে থাকবে, সবাইকে সুখে রাখবে।

আমার কন্যা যদি একবার আমার কাছে এসে কাঁদে, যদি টের পাই কন্যাকে অনুগত হয়ে চলতে হবে, আমি সমাজের দিকে না তাকিয়ে কন্যার চোখের জলের দিকে তাকাবো। চোখের জলের পরিমান দেখেই সিদ্ধান্ত নিবো, কন্যাকে অনুগত জীবন যাপনে ফেরত পাঠাবো না, কন্যাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে যতখানি সম্ভব তার চেয়েও বেশী সাহায্য করব। কারণ, কন্যাটি আমার! কন্যাটি আর কারো নয়


  • ৩৩৮৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা