কৃষ্ণা দাস

সমাজ সচেতন লেখক।

আমরা কেনো সন্তান জন্ম দেই?

সন্তান জন্ম দেয়ার আগে একটু ভাবুন, আমরা কেনো সন্তান জন্ম দেই? ১০ টা মিনিট হাতে নিয়ে সত্যিই একটু ভাবুন। সন্তান জন্ম দেয়া আহামরি কষ্টের কোনো কাজ না (অবশ্য নারীদের সন্তান জন্মদানের কষ্টের কথা সাইডে রেখেই এ কথা বলছি) পশু, পাখিও সন্তান জন্ম দেয়। আপনি যেহেতু মানুষ এবং আপনি বিশ্বাস করেন যে, আপনি সৃষ্টির সেরা জীব। ঠিক এই কারণেই পৃথিবীতে একটা মুখ আনবার আগে একটু ভাবুন। এই যে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন মানুষ করতে পারবেন তো? শুধুমাত্র বছরে বছরে সন্তান জন্ম দিয়ে নিশ্চয়ই আপনার দায়িত্ব ফুরায় না। বাবা - মা হিসেবে তার ভাল-মন্দ, সুখ-অসুখ, ন্যায়-অন্যায়ও কি আপনার হিসেবে বর্তায় না?

যথাযথ শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, নৈতিক জ্ঞান দিতে পারবেন কিনা? বাইরের অনেক দেশেই সন্তান জন্মাবার পর তার ভরণপোষণের দায়িত্ব সরকার নেয়, এমন কি শিক্ষা, চিকিৎসাও। আপনি আমি ততোটা ভাগ্য করে জন্মায় নাই, যে শুধু জন্ম দিলাম, বাদবাকি দায়ভার সরকারের। আমাদের মতো গরীব দেশে সন্তান জন্ম দেয়ার আগে একটু তার ভবিষ্যতটাও ভেবে দেখা দরকার। সাথে দরকার যথাযথ নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। আমাদের খাওয়া হতে শিক্ষা, শিক্ষা হতে চিকিৎসা, বিনোদন সবটাই ভাবতে হয়।

এখনও আমাদের দেশের বেশি সংখ্যক লোক সন্তান জন্ম দেয়, "মুখ দিয়েছে আল্লায়, খাবারও জুটাবেন আল্লায়" এই ভেবে (শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত একজন মানুষ এমন ভাবলেও ভাবতে পারেন, আপনি কেনো? আপনার বেলায় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি, অন্যকেও সচেতন করে তোলার গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে) খাবার হয়তো আপনি ঠিকই জুটাতে পারবেন কিন্তু এতেই কি সব হয়ে গেলো? সন্তানকে মানুষ তো করতে হবে, নাকি? মনে রাখবেন, বাঘ কিংবা টিকটিকি সে যাই বলুন না কেনো, বাঘের বাচ্চা জন্মেই বাঘ বা টিকটিকির বাচ্চা জন্মেই টিকটিকি। একমাত্র মানুষ হতে সাধনের প্রয়োজন হয়। আর এর গুরুদায়িত্ব বাবা কিংবা মা হিসেবে আপনার-ই।

এখন আসা যাক মূল প্রসঙ্গে, যখন আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সন্তান নিবেন, তখন থেকেই আপনাকে কিছু বিষয়ে সচেতন থেকে এগুতে হবে৷ শুধু টাকা ইনকাম করছেন ২/৪ টা বাচ্চা খাওয়ানো কিংবা ইংলিশ/বাংলা মিডিয়ামে পড়ানো হাতের ময়লা, এটা ভেবেই সন্তান জন্ম দিবেন না প্লিজ। সন্তান জন্ম দেয়ার আগে ভাবুন, আর্দশ বাবা-মা হওয়ার জন্য যে শিক্ষা তা যথাযথ আপনার আছে কিনা?! আপনি সন্তানের জন্ম দিতে মানসিকভাবে যথেষ্ট প্রস্তুত কিনা? শুধু মাত্র আপনার আনন্দ কিংবা ফূর্তির ফসল এই সন্তান যেন না হয়। কিংবা সমাজের মুখে কুলুপ পরানোর জন্য যেন সন্তান জন্মের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত আপনি নিয়ে না বসেন। কারণ একটা সন্তান জন্ম দিয়েই আমরা আমাদের দায়ভার থেকে হাত ঝেড়ে ফেলতে পারি না। মূল দায়িত্ব কিন্তু শুরু হয় জন্মের পর থেকেই। আমরা বাবা - মায়েরা সন্তানকে বড় করে তুলি আদর, যত্ন, ভালবাসা এবং তার সাথে শাসনের সমন্বয় ঘটিয়ে। এই শাসনের ক্ষেত্রে কতটা শাসন করবেন বা ঠিক কখন কোন পরিবেশে শাসন করবেন, এই সম্পর্কে ঠিকঠাক জ্ঞান থাকা জরুরি। আমরা কেউই জন্মেই মা কিংবা বাবা না। আমরা আমাদের বাবা- মায়েদের দেখে কিংবা বড়দের আচার আচরণ দেখে শিখি যে বাবা/মায়ের দায়িত্বের ধরণ বা ভূমিকা কেমন হয়। সমস্যা তৈরি হয় এখান থেকেই। কারণ সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ, পরিস্থিতি, সমস্যা, চাহিদা, সম্ভাবনা সব কিছুই দিন পাল্টানোর সাথে সাথে পাল্টায় আর এই পাল্টে যাওয়া সময়ের সাথে সমন্বয় রেখেই আমাদের সন্তানদের মানুষ করতে হবে, সামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিক জ্ঞানের শিক্ষাটাও দিতে হবে। আমরা বাবা-মায়ের আগেরদিনের সংষ্কার আগলে আধুনিকতাকে আড়াল করতে চাই। যাহা সত্য তাহা সত্যই, আড়াল করে হয়তো কিছুদিন, কিছুসময় রাখা যায় কিন্তু হাওয়া বদল চিরতরে লুকানো সম্ভব না। যুগের এই হাওয়া সঙ্গে নিয়ে, সংগতি রেখেই এগিয়ে চলতে হবে। সন্তান প্রথমত পরিবার থেকে এরপর আশেপাশের পরিবেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখে। এক্ষেত্রে আমাদের (বাবা-মায়ের) যা করনীয়-

👉 সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো মিশুন। এখনকার সন্তানদের যদি দুই যুগ আগের পদ্ধতি অবলম্বন করে শাসন করার চেষ্টা করেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হওয়ার আশংকা থাকে। অথচ বন্ধুর মতো মিশলে আপনার দেয়া বিধি নিষেধগুলো খুব সহজ ভাবে মানবে।

👉 সন্তানের ভাল কাজের প্রশংসা করতে ভুলবেন না, এতে সে উৎসাহী হয়ে উঠবে। তবে অতিমাত্রা যেন না হয় সেদিকটাও খেয়াল রাখবেন।

👉 যেসব নিয়মকানুন সন্তানকে শেখাবেন তা নিজেও মেনে চলার চেষ্টা করবেন। অন্যথায় নিয়ম ঠিক কোনটা মানা উচিত তা নিয়ে বিভ্রান্ত হবে।

👉 সন্তানের কোনো কাজ পছন্দ না হলে তা নিয়ে বকাঝকা না করে আগে ভাবুন, এ কাজে কোনো ক্ষতির বা অন্যের কাছে তা কতটা অস্বস্তিকর। যদি তা ক্ষতি বা অস্বস্তির কারণ হয় তাহলে তাকে সেটা বুঝিয়ে বলুন। প্রতিবারই সময়ের সাথে হাঁটবেন কিন্তু তা কখনই যেন জোড়াতালি দেয়া দ্বন্ধের ধন্দের সাথে সমন্বয় না করে।

👉 সন্তানকে কখনই বাইরের লোকের সামনে বকাঝকা দিবেন না। ভুল করলে ধৈর্য নিয়ে ধীরে সুস্থে তাকে বুঝাবেন।

👉 অযথা সন্দেহ করবেন না, প্রয়োজনে খোলাখুলি কথা বলুন।

👉 রেগে গিয়ে কখনই সন্তানের গায়ে হাত তুলবেন না। প্রয়োজনে আলাদা ভাবে কথা বলুন।

👉 সন্তানের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনুন। শুনলেই যে মানতে হবে এমন কিছু না। এই শোনার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববে, সে জায়গাটা তৈরি করুন।

👉 আত্নবিশ্বাসী হতে শেখান, নিজের কাজ নিজে করতে দিন। কি কি করতে হবে একবার, দু’বার শিখিয়ে দিন, পরবর্তীতে ও ঠিক জানবে কিভাবে করতে হবে। এরপরও ভুল হলে সাহায্য করুন তবে নির্ভরশীল করে তুলবেন না।

👉 নিজের কথা এবং কাজ এক রাখুন। মনে রাখবেন সন্তানরা প্রতিনিয়ত আমাদের ফলো করে, আমাদের কথা বলা হতে শুরু করে অন্যের সাথে আমাদের আচার-ব্যবহার সবটাই খেয়াল করে। কাজেই আপনি যখন বাবা/মা, তখন প্রাসঙ্গিক ভাবেই অনেক দায়িত্ব এসে যায়।

👉 প্রতিযোগিতার এই সময়ে সন্তানকে প্রতিযোগী করে তুলবেন অবশ্যই তবে প্রত্যাশাকে আকাশচুম্বী করে তুলবেন না। মনে রাখবেন বিজয়ীর চেয়ে কোনো অংশেই অংশগ্রহণকারীর সামর্থ কম থাকে না। হয়তো দিন টা ওর ছিলো না, এটা ভেবে পরবর্তী প্রচেষ্টায় লেগে পরুন।

👉 ঘরের পরিবেশটা এমন রাখুন যাতে ও ছোট বড় সবাইকে সম্মান করতে শিখে।

👉 যৌনতা নিয়ে প্রশ্নের সরাসরি খোলামেলা উত্তর দিন, একান্ত দেয়ার মতো না হলে বলুন, তুমি আরেকটু বড় হও, তখন তোমার সাথে এই নিয়ে আলাপ করবো। তাহলে ওর মধ্যে আর অযথা কৌতুহল কাজ করবে না।

👉 নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সম্মান করতে শেখান। নারী কিংবা পুরুষ আলাদা জগতের কোনো প্রাণী নয়। কাজেই এদের সমানভাবে ভালবাসতে এবং সম্মান করতে শেখান। সর্বপরি মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখান। মানবিক করে গড়ে তুলুন, এটা এমন একটা গুণ যা অর্জন করতে হয়।

আবার বলবো, এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই পারিবারিক পরিবেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনি মুখে বলছেন নারী-পুরুষ সমান অথচ আদতে আপনি ঘরের বউ কিংবা ঝিকে সম্মান না দিয়ে কথা বলছেন, ফরমায়েশ খাটাচ্ছেন, তাহলে তো ব্যাপারটা দ্বিরাচারীতা হয়ে গেলো। এই দ্বিরাচারীতা বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বড়দের জন্যই অনেকটা বিভ্রান্তির ব্যাপার আর ছোটদের জন্য তো ভয়াবহ বিরক্তিকর। এ সময় ঠিক, বেঠিকের চাপে পড়ে বেচারা বেসামল অবস্থার শিকার হয়।

এই ধরনের পয়েন্ট ধরে ধরে অনেকটা হয়তো এগুনো সম্ভব কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কার্যকারণে। ছোট থেকেই বাচ্চাদের মধ্যে ভাল/মন্দ, উচিত/অনুচিতের পাঠটা সঠিকভাবে পড়ালে, বড় হয়ে গেলে আর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির স্বীকার হতে হবে না৷ সন্তানের ভুলে আমরা বারবার সন্তানদের চালচলনের, ফোন, ইন্টারনেট আসক্তি কিংবা অনেকসময় বন্ধু বান্ধবদের দোষারোপ করে থাকি৷ অপ্রত্যাশিত এই আচরণ অনেক হয়েছে, একবার নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবুন, সন্তানের বখে যাওয়া বা খারাপ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কি আপনার কোনো হাত নেই? একবার ভাবুন যথেষ্ট সময় কি ওকে দিয়েছেন? ও কোথায় যায়, কি করে, তা নিয়ে কি আপনার সঠিক ধারণা আছে? আপনার আচরণ কি সন্তানের প্রতি যথাযথ? নাকি মান্ধাতার আমল আগলে ধরে আধুনিকতাকে তুলোধুনো করছেন? কোনো কিছুই আদতে সম্ভব না, যতদিন না আপনার আচরণ, মানসিকতা যথাযথ আধুনিক আর ইতিবাচক হবে।

620 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।