সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

আগে নিজেকে তৈরি করো - পরে রূপচর্চা

সাহিত্য সমাজের দর্পণ। কেবল সাহিত্য নয়, বিজ্ঞাপনও সমাজের দর্পণ। অমুক সাবান, তমুক পাউডার, অমুক ক্রিম মেখে যেভাবে সুন্দরীদের মেলানিন গায়েব হয়ে যাচ্ছে লেয়ারের পর লেয়ার, আর তা দেখে এত্তো প্রেম আসছে, এত্তো প্রেম আসছে, এত্তো প্রেম আসছে যে প্রেম জমে এক্কেবারে ক্ষির! তা দেখে কালো মেয়েটা বুঝছে, তাকে কেউ পছন্দ করবে না, তাই তার নিজের প্রতিও প্রেম আসছে না। শুরু হয় ঘষামাজা। কালো চায় ফর্সা হতে, ফর্সা চায় আরও ফর্সা হতে। পুরুষ তো সেই চোখে দেখেই, মেয়েরাও বিউটি পোডাক্ট হাতড়াতে হাতড়াতে নিজেকে একটা বিউটি পোডাক্ট হিসেবেই গড়ে তোলে।

পেপারে পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপন দেখলে চোখ কপালে উঠে যায়। ফর্সা সুন্দরী পাত্রী চাই। সুশ্রী ঘরোয়া পাত্রী চাই। ফর্সা, স্লিম পাত্রী চাই। ফর্সা প্রকৃত সুন্দরী পাত্রী চাই, প্রকৃত সুন্দরী ছাড়া যোগাযোগ নিষ্প্রয়োজন। ঠ্যালা বুঝুন! প্রকৃত সুন্দরী কাকে বলে আইডেন্টিফাই করুন! আজকাল আবার দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত সুন্দরী ঘরোয়া পাত্রী চাই। অর্থাৎ মেয়েরা শিক্ষিত হলেও ঘরোয়া হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর ফর্সা স্লিম সুন্দরী হওয়া তো একরকম বাধ্যতামূলক যেনো!

পাত্রপক্ষের মানসিকতা দেখে রাগ হচ্ছে না? আমারও হচ্ছে। তাহলে কি কন্যাপক্ষটি অন্য কিছু ভাবছে বলছেন? একদমই না। পাত্রীপক্ষের বিজ্ঞাপন লক্ষ্য করবেন, একই ভাষা, একই ভাব। ফর্সা সুন্দরী পাত্রীর জন্য উপযুক্ত পাত্র চাই .....। অথবা, সুশ্রী উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা পাত্রীর জন্য.. ….। কালো শব্দটাকে বসানো যাবে না যেনো কিছুতেই!

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব দেখা যায়, মেয়েদের নিজের কোনো বাড়ি নেই গোছের মায়াকান্না। তা, মেয়ে, তুমি কালো রংকে ঘেন্না করে মেলানিন তুলতে গিয়ে গায়ের চামড়া ছুলে সময় কাটিয়ে দেবে, গালে ব্রণের গর্ত ভরাতে ব্যস্ত থাকবে, চোখের তলার কালি মুছতে পড়াশোনা নষ্ট করে ফেলবে, তাহলে তোমাকে একখান নিজের বাড়ি কি কেউ গিফট করবে? কোনও বিকল্প রাস্তা নেই, রোজগার করো, স্বাবলম্বী হও। 'বাপের বাড়ি এই গায়েতে শ্বশুর বাড়ি ওই, তবে তোমার বাড়ি কই গো নারী, তোমার বাড়ি কই?' এই গানটিকে ডিলিট করো।

সৌন্দর্য চর্চা অপরাধ নয়, বরং তা স্বাভাবিক, সহজাত। সিংহের কেশর, ময়ূরের পেখম প্রকৃতির বিউটি পোডাক্টের উদাহরণ। মেয়ে, তোমারও রূপচর্চা, বিয়ে সব হবে। আগে নিজেকে তৈরি করো। অপশনাল বলে কিছু নেই এখানে, এটা বাধ্যতামূলক। বিয়ে কখনও স্বাবলম্বনের বিকল্প হতে পারে না। আগে রোজগার করতে শেখো তারপর বিয়ে ---- মা, এই কথাটি আপনি ছেলেকে যেমন বলেন, ঠিক ততটাই সততায় মেয়েকেও বলুন। মেয়েকে একটা বিউটি পোডাক্ট হিসেবে গড়ে তুলবেন না প্লিজ!

এর পরেও কথা আছে, রোজগেরে মেয়েরা কি তবে নিজেকে বিউটি পোডাক্টের বাইরে অন্য কিছু ভাবে? ভাবতে শেখে? বিজ্ঞাপন কী বলছে, দেখুন ------- ফর্সা সুশ্রী অধ্যাপিকা পাত্রীর জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত পাত্র চাই, ফর্সা সুন্দরী স্কুল শিক্ষিকা পাত্রীর জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত সুপাত্র কাম্য। অর্থাৎ, শিক্ষিকা, অধ্যাপিকারাও নিজেকে বিউটি পোডাক্টের বাইরে কিছু ভাবতে পারছেন না। উল্টো দিকে পাত্রের বর্ণনাতে কেবল বয়স আর উচ্চতা ছাড়া আর কোনও বিউটির উল্লেখ করার প্রয়োজন হচ্ছে না বললেই চলে, এ চাহিদা পাত্রীপক্ষেরও নেই। পাত্রের নামের আগে শুধু 'সুপ্রতিষ্ঠিত' এবং 'সু' লাগালেই শুভস্য শ্রীঘ্রম, চার হাত এক হয়ে যাচ্ছে। পাত্রের মতো পাত্রীর আগেও আমরা শুধু এই দুটো বিশেষণই চাই।

605 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।