এই হত্যার দায় আমার-আপনার-সবার

বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২০ ১২:৩৮ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


গৃহবধূ নির্যাতন এবং এর পরবর্তী ধাপ হত্যা, নতুন কিছু না। সেই আদ্যিকালের সমাজ, সময়, যখন মানুষ বিজ্ঞান কিংবা বিকাশের সংস্পর্শে আসে নাই তখন যেমন গৃহনির্যাতন হতো, আজ এখন অবধি তা হয়েই চলেছে। হ্যাঁ, তখন আর এখনকার মধ্যে তফাৎটা হচ্ছে তখন নির্যাতন হতো, পুরুষ নারীদের গৃহপালিত জন্তু জানোয়ার ভেবেই নির্যাতনটা করতো, আর অবোধ প্রাণীরুপে নারীটি স্বামী আর শ্বশুর বাড়ীর নির্যাতনকে তার পরম পাওয়া ভেবে নীরবে সহ্যও করতো। এখনকার নির্যাতনটা বেশি না মাত্র একচুল ভিন্ন, এখানে অবোধ প্রানীটি দু'কলম কালির অক্ষর চিনতে সক্ষম। সে এখন খোলা আকাশে উড়তে চায়, প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে চায়, এক বুক স্বপ্ন বুনে বাঁচতে চায়।

আমরা সুমাইয়া হত্যাকান্ডে সবাই সরব, সবাই প্রতিবাদ করছি, সবাই এর বিচার চাচ্ছি। নিউজে দেখলাম স্বামী আর শ্বশুর এখনো অব্দি পলাতক, যে কোনো অবস্থায় তাদের গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ তথা প্রশাসন বদ্ধপরিকর, আমরাও এর সাথে একাত্মতায় সামিল হচ্ছি৷ একটা সময় এরা ধরা পরবে। কিন্তু এরপর? এরপর ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না? কেইস ফাইল হয়ে তা আদালতের দোর-গোঁড়ায় ঘুরপাক খাবে, বছরের পর বছর তা ঝুলে থাকবে, একটা সময় আমাদের চেতনা বোধ অন্য কোনো সুমাইয়াকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে জাগ্রত হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে সক্ষমও হই, এই তো! এরপর? থেমে যাবে গৃহবধূ নির্যাতন? আর কোনো সুমাইয়া তার স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোক দ্বারা নির্যাতিত হবে না? আর কোনো হত্যা হবে না? একেবার ফিল্মি কায়দায় হ্যাপি এন্ডিং?

একবার ভাবুন, আসলে কি এই খুনে/হত্যায় স্বামী বা শ্বশুর বাড়ীর লোকজন আদতে দায়ী?  আমার কিন্তু তা মনে হয় না, আমি মনে করি এর জন্য সুমাইয়ার মা-বাবা তথা পরিবার, সমাজ এবং অতি অবশ্যই রাষ্ট্র ব্যবস্থা দায়ী। এখন আর ঘুনে ধরা সমাজ নেই, ঘুনে ঘুনে ফাঁপা হয়ে যে কোনো সময় শুধু ভাঙ্গার অপেক্ষা মাত্র।

বলছি, মা-বাবা এবং পরিবার কি করে দায়ী সে কথা। সুমাইয়ার পরিবারের কি দরকার ছিলো মেয়েকে পড়াশুনা করানোর? মেয়েকে তো বিয়ে দিতেই হবে, বিয়ের পর সেই চুলা আর হাঁড়ি নিয়ে দিন-রাত কাটানো, এর জন্য পড়ালেখা শেখানোর তো কোনো প্রয়োজন ছিলো না। আপনারাই তো পড়ালেখা করতে বলে বলে, মেয়েটিকে স্বপ্ন দেখার দরজা-জানলা খুলতে বলেছেন। আজ স্বপ্ন দেখার দায়ে একটা প্রাণ অকালে ঝড়ে পড়লো! মেয়েকে যদি স্বাবলম্বীই করতে চেয়েছেন, তো আরেকটু অপেক্ষা করতেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে উঠার সিঁড়ি তো টপকাচ্ছিলোই, আরেকটা ধাপ উঠতে দিতেন। একটু অপেক্ষা করলে হয়তো আজ আক্ষেপ করতে হতো না। মেয়েটি বিয়ের এক বছরের মধ্যেই অনেকবার তার প্রতি শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের কথা নিশ্চয়ই পরিবারকে জানিয়েছে। সুমাইয়ার মায়ের দেয়া সাক্ষাৎকারে বক্তব্যটি যথেষ্ট পরিষ্কার। কী করেছে পরিবার? বেকার ছেলে ও ছেলের পরিবারকে টেনেছে, বিনিময়ে কী দিয়েছে? মর্গে পরে থাকা সুমাইয়ার নিথর দেহ!

কী এমন চাওয়া ছিলো সুমাইয়ার! চেয়েছিলো তো নিজের পায়ে দাঁড়াতে। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থেকে পাশও করেছে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে। এই চাওয়াটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো! সুমাইয়ার হত্যা আবার আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, "তুমি মেয়ে, তোমার স্বপ্ন দেখতে বারণ"।

পাশাপাশি এর জন্য আমাদের সমাজ দায়ী। প্রথমত কুড়িতেই বুড়ি, আমাদের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ এখনো তা মানে (কেনো 'মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ' বলেছি আজ আর তার আলোচনায় যাবো না। একটু সজাগ দৃষ্টি ফেললেই তা উপলব্ধি করতে পারবেন।) ফলে কুড়িতে বিয়ে দেয়ার পর এদের প্রধান ঝান্ডা হচ্ছে,  "মেয়ে মানুষ একটু আধটু মানিয়ে চলতে হয়, তাই বলে শ্বশুর বাড়ি ছাড়া কিছুতেই চলবে না।" বাবা-মা অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্তেও তার ভালোবাসার রাজকন্যাদের ওই নরকে পচতে দেন, সমাজ যে না হয় বড্ড বেশি রক্ত চক্ষু দিয়ে শাসায়। 

রাষ্ট্র ব্যবস্থাও এই জন্যই দায়ী, কারণ এই নির্যাতনগুলোর কখনো যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফলে যে যার মতো নির্যাতন করেই চলেছে। রাষ্ট্র যদি কঠোরভাবে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হতো, তবে কিছুটা হলেও জনমনে ভীতি কাজ করতো। 

এর সাথে আরেকটা কথা না বললেই নয়,  এই সবগুলো কারণের সাথে সবচেয়ে বেশি দায়ী যে কারণ তা হলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তথা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। যতোই নারী অধিকার নিয়ে কাগজে-কলমে কাজ হোক না কেনো। মনে মনে আমরা এখনো কঠোর মৌলবাদ পোষণ করি, বিশেষ নারী অধিকারের ক্ষেত্রে। যতদিন এই মানসিকতার পরিবর্তন করা সম্ভব না হচ্ছে, ততোদিন পর্যন্ত নির্যাতন চলতেই থাকবে। ততোদিন পর্যন্ত একটা সমাজ অন্ধকারে থাকবে আর রাস্ট্রের মেরুদণ্ডও ভাঙা থাকবে। কারণ রাষ্ট্রের অর্ধেক যেখানে নারী আর তার বেশিরভাগেরই অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হয়, সেখানে ওই রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডকে তো আর সোজা বলা চলে না। 

মূলত অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীতা না আসা পর্যন্ত নারীদের মুক্তি কখনও সম্ভব না। এ কথা নারীরা না মানলেও পুরুষতন্ত্র প্রচণ্ডভাবেই মানে। আর মানে বলেই পদে পদে নারীকে পদদলিত করা হয়। কখনও সমাজের নামে, কখনও পরিবারের নামে। শুধুমাত্র নারীদের শিক্ষার আলোয় মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। আজকের সচেতন বাবা মায়েরা তার ছেলে সন্তানের মতোই মেয়ে সন্তানকেও পড়ালেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন, তা সত্যিই খুব আশার কথা। পাশাপাশি বাবা-মায়েদের আরেকটু সচেতনতা দেখাতে অনুরোধ করছি। ওদের নিজের পায়ে অর্থাৎ স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করতে বাধ্য করবেন না। 

সুমাইয়া, নির্যাতন সহ্য করে ওই সংসারটা আঁকড়ে ছিলো, হয়তো পরিবারের মানসম্মান রক্ষার্থে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, কেনো বেড়িয়ে আসলো না? বলাটা সোজা, বের হয়ে আসার পর এই আমি-আপনিই সবার আগে প্রশ্নবিদ্ধ করবো সুমাইয়া আর ওর পরিবারকে।

এখন সময় এসেছে, নারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি নারী নির্যাতনের কেইসগুলো সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় নিশ্চয়তার বিধান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যাতে আর কোনো সুমাইয়াকে এভাবে প্রাণ দিতে না হয়। মনে রাখবেন এই হত্যার দায় আপনার-আমার-সবার। সচেষ্ট না হলে আপনার রাজকন্যাও যে কোনোদিন হত্যার শিকার হবে না, তা হলফ করে বলা মুশকিল!


  • ৩৮০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কৃষ্ণা দাস

সমাজ সচেতন লেখক।