গল্পটা নিজের ব্যর্থতার এবং নিদারুনভাবে মর্মপীড়াদায়কও

শুক্রবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৮ ১২:৫৮ PM | বিভাগ : আলোচিত


অনেকদিন ধরে নিজের ব্যর্থতার এই গল্পটা বলতে চেষ্টা করেছি। লিখতে গেলেই আড়ষ্ট হয়ে যাই। মানুষ নিজের বীরত্বের কাহিনী যতো সহজে বলতে পারে, কাপুরুষতার গল্প ঠিক সেভাবে পারে না। আমার গল্পটা নিজের ব্যর্থতার, এবং নিদারুনভাবে মর্মপীড়াদায়কও।

১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসের এইরকম একটি দিনে আমার এক আত্মীয় বোনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে ভর্তি হতে হয়েছিলো এপেনডিক্সের তীব্র ব্যথার কারণে। ঐ রাতে ওয়ার্ডের ডাক্তাররা তাকে চেকআপ করে পরদিন অপারেশনের তারিখ দেয়। ওয়ার্ডের নম্বর মনে নেই। গেটে ঢ়ুকার পর সোজা গিয়ে বামে ছোট রকম একটা ওয়ার্ড, ২০টির মতো বেড ছিলো। মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, সাথে তার রুমমেট ছিলো।

চেকআপ করার সময়ে সে টের পায় তলপেট থেকে একটি হাত সর সর করে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, এবং মুহূর্তের দ্রুততায় ঐ হাতটি জামার ভেতর দিয়ে তার বুক স্পর্শ করে। মেয়েরা অনাকাংখিত স্পর্শ সঠিকভাবে ধরতে পারে। তীব্র ব্যথার কারণে কিংবা চেকআপের অংশও হতে পারে ভেবে সে কিছু বলতে পারে নি, তার রুমমেটকেও কিছু জানায় নি।

পরদিন দুপুরে অপারেশন শেষে তাকে পোষ্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হয়। দু'ঘন্টার মতো পার হলে সেখানে এপ্রোন পরা এক লোক ঢুকে চেকআপের নাম করে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে মলেস্ট করে। দুইহাতে স্যালাইনের সূঁচ এবং পেটে ব্যান্ডেজের কারণে সে কোন বাধা দিতে পারে নি, কিন্তু পশুটিকে ঠিকঠিক চিনতে পারে। এ ছিল আগের রাতে গায়ে হাত দেয়া সেই ইন্টার্ন ডাক্তার।

তারপর ওয়ার্ডে ফিরলে ঘটনাটি সে তার রুমমেটকে জানায় কিন্তু রুমমেট বলে, এটা নিয়ে এখনই বাড়াবাড়ি করলে হয়তো চিকিৎসা না নিয়েই হলে ফিরতে হতে পারে। ঐদিন সন্ধ্যায় সে তৃতীয়বারের মতো মলেষ্টের শিকার হয় ঐ একই ইন্টার্ন ডাক্তারের হাতে।

আত্মীয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ঐদিন রাত ন'টার আমি তাকে দেখতে যাই। আমাকে দেখেই মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে কী কান্না! ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে পরপর তিন দফায় পশুটির হাতে লাঞ্ছিত হবার ঘটনা জানায়। শুনে আমি থ' হয়ে পড়ি। কি করবো বুঝতে না পেরে ওয়ার্ডের এক নার্সের কাছে ডাক্তারের নাম জিজ্ঞেস করি। সেই নার্সটি ডাক্তারের নাম না বলে 'কোনজন কোনজন' 'কতজন আসে আর যায়' ইত্যাদি বলে এড়িয়ে যায়। এক আয়া ছিল তার সাথে আলাপ করতে গেলে বলে ডাক্তারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে বা করতে গেলে সব ডাক্তার একজোট হয়ে রোগিকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেবে।

আত্মীয় মেয়েটির রুমমেট ছিল আরো এককাঠি হারামি কিংবা ভীতু। সে চাচ্ছিলো ঘটনাটা ধামাচাপা দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হলে ফিরতে। আমি মেয়েটির চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না। সেদিন এক বোনের কাছে নিজের অক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে মাথা নীচু করে আমি ফেরত এসেছিলাম।

তারপর বহুদিন কেটে গেছে, সেই মর্মন্তুদ ব্যর্থতা ও গ্লানির কাহিনী আমি ভুলতে পারি নি। সেই কান্নাভেজা মুখের কথা মনে হলে পুরুষ জাতের প্রতি ঘেন্না হতো, ইন্টার্ন ডাক্তার দেখলেই রেপিষ্ট মনে হতো। কোথাও ডাক্তারদের বিপক্ষে কিছু হলেই ডাক্তার সমাজের একজোট হওয়া, ডাক্তারদের নিয়ে কেউ কিছু বললে অনলাইন ডাক্তার সেলেব্রেটিদের বিশহাত লম্বা ভারাক্রান্ত ষ্ট্যাটাস পয়দা করা দেখলে আজও সেই ঘটনার কথা মনে পড়ে।

এই গতকালকেও ব্যাপারটা নিয়ে ফেসবুকের একজন মহিলা ডাক্তার আপার সাথে কথা বলতে চাইছিলাম, তিনি সব শোনার আগেই বলে দিলেন, 'ঐটা হয়তো চেকআপের অংশ ছিলো আপনার বোনের বুঝতে সমস্যা হয়েছে'। কেন ভাই ডাক্তাররা কি আমাদের মতো হাত-পা, বিচিওয়ালা পুরুষ না? তারা কি মহামানব যে তাদের মধ্যে কোন মলেস্টার বা রেপিষ্ট থাকতে পারবে না? হাতে নাতে ধরা পড়ার পর এরাই তো বলবে, আহা রেপিস্টের কোন প্রফেশন হয় নাকি!


  • ৪৫১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

কুঙ্গ থাঙ

আদিবাসী বিষয়ক লেখক ও গবেষক

ফেসবুকে আমরা