কত লিখবো #metoo? নিপীড়ন তো থেমে নেই

মঙ্গলবার, নভেম্বর ৬, ২০১৮ ৬:০১ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


নারীর জন্ম নেওয়ার পর থেকেই তার যা যা সহ্য করতে হয় তা অন্য কারো করতে হয় না। সুতরাং নারী যখন ##me too মি টু লিখে স্ট্যাটাস দেয়, নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা বলে তখন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারী ও পুরুষ উভয়ই নাক ছিটকায়। নারীকেই অপরাধী করার জন্য লেগে যায়। এক নারীর কথা আজ বলবো, নাম প্রকাশ করার কখনও সময় হলে করবো- তবে এখন নাম প্রকাশ না করেই তার জীবনের ঘটে যাওয়ার ঘটনার কিছু তুলে ধরবো। 

১. মেয়েটির পরিবার ছিল মারফতী পরিবার। তাদের বাড়িতে পীর আসতো। পীরের সাথে অনেক শিষ্যও আসতো। পীরের সেবায় লেগে থাকতো বাড়ির সকল সদস্যরা। মেয়েটির বয়স তখন ৮-৯ বছর। মেয়েটি নাদুস-নুদুস থাকার কারণে খুব অল্প বয়সেই মাংস ফেটে স্তনের সাইজ বেড়ে উঠছিল। একটা স্যান্ডো গেঞ্জির সাথে, হাফপ্যান্ট পড়তো। এক রাতে পীরের মাঝখানে তার ছোট ভাইকে ঘুমুতে দিয়ে পাশে মেয়েটিকে ঘুমাতে দেয় পরিবারের অন্য সদস্যরা। গভীর রাতে পীর তার ছোট ভাইটিকে টপকে মেয়েটির স্তনে, নিতম্বে, যৌনাঙ্গে হাত বোলায়। মেয়েটি সজাগ পেয়ে ‘মা, মা, মা’ বলে ডাকতে থাকে। তখন সবাই ঘুমে। মেয়েটি আবারও ঘুমিয়ে পড়ে। পীর বলে ‘ তোর কি হয়েছে, ঘুমা...’। এটি মেয়েটি তখন বুঝতো না যে- যৌনানুভূতি নিচ্ছে পীর। 

২. মেয়েটির বয়স যখন ১০-১১, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যে শিক্ষক স্কুলের অন্য মেয়েদের সাথে প্রায় একই আচরণ করতো। শিক্ষকটি মেয়েটিকে ‘ঝুটিওয়ালা’ বলে ডাকতো, মেয়েটি দুইপাশে দুইটা ঝুটি বেধে রাখতো। ঝুটিওয়ালা বলে কাছে টেনে নিয়ে বগল বরাবর হাত দিয়ে চাপ দিতো। মেয়েটির স্তন তখন অনেকটা প্রস্ফুটিত। মেয়েটি বুঝে তার গায়ে হাত দিচ্ছে শিক্ষক। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। 

৩. মেয়েটির বয়স যখন ১১’এর ঘরে তখন তার গ্রামের কাকা বুকে লোম স্পর্শ করিয়ে নিত, মেয়েটি না বুঝেই তার কাকার বুকের লোমে স্পর্শনানুভূতি দিত। মেয়েটির কাকা এই সুযোগে তার গায়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করতো। মেয়েটি কিছু বলেনি। 

৪. মেয়েটির বয়স যখন ১২ এর ঘরে তখন বান্ধবীরা সবাই মিলে নদীতে যায়। তাদের সাথে তার পড়শি এক দাদাও যায়। অন্য সকল বান্ধবীরা সাঁতার জানলেও মেয়েটি জানে না। তার দাদা সাঁতার শিখাবে বলে নদীর মাঝখানে নিয়ে যায়। মেয়েটিকে তার দাদা বলে ‘আমাকে তোর বুকে (স্তনে) হাত দিতে না দিলে, তোর যৌনাঙ্গে স্পর্শ করতে না দিলে- তোরে নদীর মাঝখানে ছেড়ে দিবো। মেয়েটি অসহায়। কাঁদছিল সেদিন। তখন সে বুঝে এটা অন্যায়। এটা অপবিত্র কাজ। মেয়েটি বলে দিবো, আমাকে ছেড়ে দেন। পরে দিবো। মেয়েটি সেদিন তার দাদি আর মাকে সব বলেছিল। মা আর দাদি কাউকে না বলে মেয়েটিকে সাবধান করেছিল। ব্যাটাদের সাথে মিশবি না বলে হুঁশিয়ার করেছিল। মেয়েটি আজ পর্যন্ত তার সেই নিপীড়ক দাদাকে দেখলে অন্য পথে হাঁটে, ঘৃণা করে, থুথু ফেলে। মেয়েটি আজ অনেক বড়। নারীবাদ বুঝে, নারীমুক্তি বুঝে, নারী নিপীড়ন বুঝে, পুরুষতন্ত্র বুঝে, কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ সব বুঝে। মেয়েটি এই সব কারণেই পরিবার ছেড়ে ‘নারীদের মুক্তি’র জন্য রাজনীতিতে নেমেছিল। মেয়েটি আজ পর্যন্তও সে কথাগুলো ভুলতে পারেনি। 

৫. মেয়েটির যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন তার ভেতরে যৌনকাক্সক্ষা জন্ম নিয়েছে, তার অনুভূতি হয়। তার সাথে তখনও কারো কোনো প্রেমমূলক সম্পর্ক নেই। তবে মেয়েটি বেশ বন্ধুবৎসল। ছোট সময় থেকেই। মেয়েটির সাথে পড়তো তার পড়শি ফুফাতো ভাই। একদিন দুজনে কোচিংয়ে একসাথে যাবে বলে ছেলেটির রুমে যায়, ছেলেটি বলে ‘দাঁড়া একটু দাঁড়া- বলে পিছন থেকে তার স্তন দুটো ঝাপটে ধরে।....’ মেয়েটি ছিটকে যায়। তুই এটা করতে পারলি বলে বের হয়ে যায়? এই কথা ছেলেটি খুব গর্ব করে তার বন্ধুদের বলেছিল। মেয়েটি আজ পর্যন্ত ওই ছেলেটিকে দেখলে তাকায় না, ঘৃণা করে, পারলে ওর পুরুষাঙ্গ ফাটিয়ে দিতে চায়। মেয়েটি ঠিক সেদিনই বুঝেছিল তার শরীরের অঙ্গ নিয়ে এই সমাজের পুরুষরা খেলতে পারে, তার স্তন, তার নিতম্ব, তার যৌনাঙ্গ পুরুষদের জন্য!!! এরপর থেকে আরও কত শতবার মেয়েটি যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছে তা মেয়েটি বলবে কেমনে? এত বলতে গেলে তার আর কিছু ভাবার সময় থাকে? মেয়েটি এখনও বন্ধুবৎসল। কিন্তু এখনকার বন্ধুরা তাকে ভয় পায়, তাকে নিয়ে বিছানায় যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও মুখ ফুটে প্রকাশ করে না। 

মেয়েটিকে তিন বছর আগে এক রাজনৈতিক নেতা বলেছিল, ‘তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়, তুমি খুব স্টেটকাট। তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারলে, সম্পর্ক করতে পারলে (বিছানায় যেতে পারলে) ভালো লাগতো- কিন্তু তুমি তো আবার এসবে রাজি না। আমার মানসম্মান নিয়া টানাটানি করবে...’। মেয়েটি সেদিন গর্ব করে বলেছিল, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি অন্য নারীদের সাথে যে কাজটি করেন, আমার সাথে করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও ভয়ে আছেন। মেয়েটি সে রাজনৈতিক ব্যক্তিটির সাথে এখনও কথা বলে, কিন্তু ঘৃণা করে। 

কত লিখবো এরপর থেমে নেই। মেয়েটি রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে, নিউ মার্কেটে গিয়ে, বাসে উঠতে গিয়ে, মেলায় গিয়ে, অফিসে গিয়ে কোথায় হয়নি- যৌন নির্যাতনের শিকার? মেয়েটি খুব কঠিন সময় পার করেছে জীবনে। তার জীবনে একসময় কেউ ছিল না। না তার রাজনৈতিক বন্ধুবান্ধব, না তার পরিবার। কিন্তু লড়াই করে বেঁচে আছে। মেয়েটি ঠিক ওইসময় এক বন্ধুর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়ায়। সে বন্ধুটি মেয়েটিকে শারীরিকভাবে চায়, কিন্তু মেয়েটি রাজি না হওয়াতে- সেই বন্ধুটি রাস্তা আটকিয়ে তাকে নির্যাতন করার চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েটি তখন অনেক স্ট্রং ছিল, প্রতিবাদ করেছে- এখনও করে। মেয়েটির জীবনে প্রথম চাকরির পর দ্বিতীয় চাকরিতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মেয়েটির মালিক ষাট্টোর্ধ্ব ছিল। মেয়েটি একদিন বিদ্যুৎ নেই বলে মাথাটা কম্পিউটারের টেবিলে লাগিয়ে ঝিমুচ্ছিল। তার মালিক হঠাৎ করে এসে ঘাড়ে সুড়সুড়ি দেয়, তার গলায় হাত দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করে। মেয়েটি হাতটি ধরে চাপ দিয়ে- থামেন! এরপর বিদ্যুৎ আসার পর মেয়েটি এ নিয়ে দু’ঘণ্টা মিটিং করে। তার মালিকটি মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী ছিল, বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিল- সেই জায়গায় মেয়েটি আড়াইবছর চাকরি করেছিল। কিন্তু এরপর আর এই সাহস করেনি বুড়োটি। মেয়েটি তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মেয়েটি একসময় ‘পুরুষ’ শব্দটি শুনলেই ঘৃণা করতো, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পড়ি।


  • ২৬৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

লাবণী মণ্ডল

নারীবাদী লেখিকা।

ফেসবুকে আমরা