লেখক তসলিমা নাসরিনকে আমার লেখা প্রথম চিঠি

বৃহস্পতিবার, মে ১৭, ২০১৮ ১০:৪৭ PM | বিভাগ : ওলো সই


মেয়েমা,

এক বছর নয়, দশ বছর নয়, শত বছর নয়,

আমি চাই যতো বছর তুমি থাকো,  ততো বছর যেন আমি থাকি তোমার সাথে।

আগস্ট ২, ২০১৫। সকালে পায়েল আমাকে অপমান করেছিলো, বলেছিলো আমার কোনো যোগ্যতা নেই ওর সাথে কথা বলার। পিছিয়ে পড়া, সবার পিছনে থাকা মানুষদের মধ্যে আমি একজন। আমি কষ্ট পেয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে এমন কথা শুনে সহ্য করতে পারি নি। কাওকে কিছু বলেছিলাম না। সারাদিন ভীষণ কষ্ট পেয়ে সেদিন তোমাকে মেসেজ করেছিলাম। আমার শরীর, মন থেকে শুধু কষ্ট ঠিকরে বেরোচ্ছিলো সেদিন। তোমাকে দিদি বলে ডাকতাম তখন, আপনি ডাকতাম। কষ্ট পেয়ে সেদিন আমি তোমাকে ফেসবুকে মেসেজ করে বলেছিলাম, "আমি ভালো নেই দিদি। আপনার কি? আপনি তো আর কথা বলবেন না। কেউ নেই আমার।" হঠাৎ দেখি রাত দশটার সময় তুমি আমাকে ফলো করছো। তারপর ১১:৩০ পি.এম এ আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে। আমি চমকে উঠেছিলাম। কি করবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না তখন। সাথে সাথে আমি অ্যাকসেপ্ট করি। অনেকে তোমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টের স্ক্রিনশট করে সেটা পোস্ট করে, অনেক কিছু লেখে। আমি কিছুই করি নি সেসব। আমার মাথাতে আসে নি। আসতো কিভাবে? আমি তো যেন স্বপ্ন দেখছিলাম সেদিন। সব কষ্টগুলো কোথায় হারিয়ে গেছিলো, কিছু বুঝতে পারি নি আর।

আমি যখন খুব খারাপ একটা মানুষে পরিণত হচ্ছিলাম, খারাপ হয়ে গেছিলাম! তখন নিজেকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করছিলাম। পারছিলাম না নিজেকে সামলাতে। আই এস আই তে রিসার্চের সুযোগ পেয়ে আমি তখন থেকে নিজের মনকে যেন চেপে ধরেছিলাম, আর কোনো অন্যায় করবো না ভেবে। একের পর এক “আমার মেয়েবেলা, ব্রম্মপুত্রের পাড়ে, নারীর কোনো দেশ নেই, আমি ভালো নেই - তুমি ভালো থেকো আমার প্রিয় দেশ” আমার জীবন পাল্টাতে শুরু করে। একটা আদর্শ, আদর্শের বেড়াজাল আমাকে ঘিরে ধরে। বেড়ার ওপারে খারাপ, এপারে ভালো। এই আদর্শ আমাকে বেড়ার ওপারে যেন খারাপকে স্পর্শ করতে দেবে না। আমাকে সমাজের মূল্যবোধ শেখাতে শুরু করে।

লজ্জা পড়েছিলাম ২০০৮ সালে। পড়েছিলাম কিছু জানার জন্য, কিন্তু বয়স কম থাকায় বিশেষ কিছু শিখতে পারি নি। কিন্তু আমি শিখেছি, যখন মন থেকে শিখতে চেয়েছি, যখন আমার শেখার প্রয়োজন ছিলো, আমি শিখেছি। এরপর যখন “সেইসব অন্ধকার” পড়লাম, আমি যেন পুরোপুরি মিশে গেলাম তোমার আদর্শের সাথে। প্রতিটা মুহূর্তে আমি অনুভব করতে শুরু করি তোমাকে। প্রতিটা মুহূর্তে আমি ভেবেছি, “যদি আমি তোমার সাথে থাকতে পারতাম সেইসময়!” তুমি আমাকে সবসময় মনের জোর দিয়েছো, কথা বলে আমার উৎসাহ বাড়িয়েছো। আজ যত খারাপ, যত প্রলোভন আছে, সব যদি আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, আমি বেছে নেবো আমার আদর্শের পথকেই। সেই আদর্শ যা আমি তোমার থেকে প্রতি মুহূর্তে শিখেছি, শিখছি।

আজ সমাজ এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, বর্তমান প্রজন্ম মূল্যবোধ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নয়, তোমাকে গালাগালি দেয়, তোমাকে খুন করার কথা ভাবে, তোমাকে ধর্ষণ করার কথা ভাবে, ওরা আসলে তোমার আদর্শকে কখনো বোঝার চেষ্টা করে নি। করে নি কারণ, এই আদর্শকে বোঝার আগেই ধর্মের গোঁড়ামি ওদের ঘিরে ধরেছে সমস্ত চেতনা জুড়ে। ওরা সেই গোঁড়ামিতে এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে খুন, ধর্ষণ করার মতো অমানুষিক চিন্তাগুলো ওদের কাছে জলভাত হয়ে গেছে। তোমার আদর্শ খুন করতে শেখায় না, তোমার আদর্শ ধর্ষণ করতে শেখায় না। তোমার আদর্শ শেখায় মুক্ত চেতনা, ভালোবাসা। তোমার আদর্শ শেখায় যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে, মানুষ খুনের জন্য অস্ত্র ওঠাতে নয়।

যতো সময় গেছে, আমি আমার মন থেকে তোমার আরও কাছে চলে গেছি। যেন চুম্বকের তীব্র আকর্ষণে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে গেছি। আদর্শের নেশায় ছুটে গেছি। দিদি থেকে একদিন তোমাকে মেয়েমা বলে ডাকি, আপনি থেকে তুমি ডাকতে শুরু করি। আমি যেন একাত্ম হতে শুরু করি তোমার সাথে। তুমি কখনোই আমাকে দূরে ঠেলে দাও নি, তোমার মনের কাছে পৌঁছতে আমাকে কোনো বাধা দাও নি। অবাধে আমি তোমার কাছে যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা পৌঁছেছি, বিনা দ্বিধায়। মেয়েমা ডাকার পিছনে আমার যে অনুভূতিটা ছিলো তোমাকে নিয়ে, সেটা আমার লেখা “গেরন” কবিতার  সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে উপলব্ধি করে এসেছিলো। তাই তোমাকে মেয়েমা ডাকি। অনেক প্রেমে, অনেক ভালোবাসায়, কখনো তোমাকে আমারই মধ্যে অনুভব করেছি তুমি হয়ে, আবার কখনো আমার আমি হয়ে তোমাকে লিখেছি আমার অনুভূতিগুলো। সেই লেখাগুলোই তুলে ধরলাম তোমাকে উৎসর্গ করে লেখা আমার কবিতাগুলোর মধ্যে দিয়ে। এটাই তোমার প্রতি আমার স্নেহ, ভালোবাসা, আবদার, প্রেম, সম্মান এবং আরও অনেক না জানা অনুভূতি। তোমাকে ভাষার আগুনে উজ্বল করার মতো সামর্থ্য আমার নেই। তবু চেষ্টা করলাম একটু মনের মতো করে, একটু নিজের মতো করে। তোমার ভালোবাসা, স্নেহ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলাম। একটা আবদার শুধু, তুমি খুশি হলে আমার জন্য অন্তত দুটো লাইন কোথাও লিখে দিও। এমন কিছু কথা যা এই পৃথিবীতে আর কেউ কখনো কাউকে বলে নি, বলবে না। তোমার বলা বা লেখা সেই কথাটাই হবে আমার মানুষ জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। ভালোবাসি তোমাকে মেয়েমা।

                                                                       সুস্থ, সুন্দর বেঁচে থাকো সকল হৃদয়ে-

                                                                       সৌম্য


  • ১৫৭৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সৌম্যজিৎ দত্ত

লেখক, ব্লগার, আইএসআই তে লেকচারার এবং গবেষণারত ছাত্র।

ফেসবুকে আমরা