একটি অনুচ্চারিত মৃত্যু

মঙ্গলবার, মে ১৪, ২০১৯ ৪:২৮ AM | বিভাগ : সাহিত্য


আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথের মতো আরো এক কবি শব্দের মায়াময় রহস্যজাল বুনে পৃথিবীর তাবৎ বসন্ত দিন থেকে অকস্মাৎ ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ। নভেম্বরের এক কনকনে শীতে, কুয়াশার উত্তরীয় জড়িয়ে নিয়ে বুকে, ডুবে গেছে মেহেকানন্দার জলে। তারা দু'জনেই হিমশীতল লন্ডনের বাতাসে মিশিয়ে দিয়েছে তাঁদের শেষ নিঃশ্বাস।

তাঁর শব্দেরা কল্পনার সেই মেহেকানন্দার কথা বলে, অমোঘ অমসৃণ মৃত্যুর কথা বলে, মৃতের মাতৃমঙ্গল গেয়ে ওঠে। এইখানে তিনি রহস্যের কুয়াশায় ঢেকে ঢেকে যান। আমি তাঁকে দেখি সেলুলয়েডের ফিতেয় হেঁটে যাওয়া নির্জন উপকুলে কুয়াশা জড়ানো ছায়া ছায়া এক মানবীর মতো। আলো আর আঁধারির খেলায় সে সমুদ্রের গহীন থেকে কবিতায় নাড়া দিয়ে যায়। ঝিনুকের খোলায় বসে সে ময়ূরকণ্ঠী ডেকে যায়। ডেকে যায় আর সব কবিদের। আমাদের মগ্ন চৈতন্যে দিয়ে যায় শিস। কবি মুনিরা চৌধুরী আমাদের চেতনায় করাঘাত করে।

২০১৮’র নভেম্বরের শেষ ভাগে একটি মৃত্যু আমাদেরকে স্তব্ধ করে দেয়। কিছুদিনের জন্যে একটা ঘোর অমানিশার ভেতরে হেঁটে বেড়াই আমরা। হাজার প্রশ্ন মনে ভিড় করে আসে। তাকে চিনি না তবু তার হিমশীতল করস্পর্শ টের পাই। সে এসে আলতো নিশ্বাস ফেলে কানের কাছে আবার মিলিয়ে যায় দূরে বহুদুরে। তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে সিলভিয়া প্লাথের বিবর্ন মুখ, নতুন করে আবার কবি সিলভিয়া প্লাথের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় সে।


লন্ডনে এক পরমা সুন্দরী বাঙালী কবি আত্মহত্যা করেছেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন গাড়ি নিয়ে। সমুদ্রের ধারে তাঁকে পাওয়া গেছে প্রাণহীন, যখন সে ছেড়ে গেছে জীবনের সবকিছু। আবার শোনা যায় এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়েছে তার! ফেসবুকে ভাইরাল হয় তাঁর মৃত্যু সংবাদ। কারো ওয়ালে তার ছবি দেখে মনে পড়ে যায়। বন্ধু কবি ফেরদৌস নাহারের ওয়ালে দেখেছি তাঁকে। খুব যত্নে তাঁর কবিতা পোস্ট করেছিলো ফেরদৌস নাহার। সম্ভবত ‘পছন্দের কবিতা’ শিরোনামে একজন একজন কবির কবিতা প্রকাশ করেন কবি ফেরদৌস নাহার। সেবারে সে বেছে নিয়েছিল কবি মুনিরা চৌধূরীকে। কবিতা কী ছিলো তা আর আজ আর মনে নেই কিন্তু খুব ভালো লেগেছিলো কবিতাটি সেকথা মনে আছে।

খুব গুছিয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন মুনিরা। ইতোমধ্যেই বেরিয়েছিল তার তিন, চার খানি বই। মৃতের মাতৃমঙ্গল, নয় দরজার বাতাস, মেহেকানন্দা কাব্য। ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘কাম ক্লোজ টু মাই আই পেন্সিল।’

তার ইংরেজী কবিতা আমার সংগ্রহে নেই তবে বাংলা কবিতা থেকে দু’একটা উদ্ধৃত করতে চাই-

‘আমি জেগে থাকি

কাটা- হাতখানা অন্য- হাতে নিয়ে সারারাত জাগি

অনন্ত ভোরের দিকে হাতের গহীনে জ্বলে ওঠে হাতের চিতা

হাড়-গলা গরম ঘন হয়ে এলে কেবল শীত শীত লাগে...ঘুম লাগে

এইসব মুনিরা ঘুমের ঘোরে কোথাও কোনো জানালা নেই; সই নয় দরজার বাতাস।।’

 

কবিরা জেগে থাকেন। ঘুমের ভেতরেও। কবি মুনিরা চৌধূরী তার নিজের ভাষ্যমতেই এই সর্বব্যাপী ঘুমের ভেতরেই জেগে আছেন। কবিতাকে ভালবেসে নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই অনুপম ধারাটিকে।

এই কবিতায় সর্বব্যপী ঘুমের কথা তিনি বলেছেন এভাবে-----

'চোখজোড়া যেনো ঘুমের মধ্যে গলে যায়……

উঁচু উঁচু বিশাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে নৌকা চালাই

নৌকায় আমার মৃত ঠাকুরমা আর মহা শূন্যের একটি পিংকি বিড়াল

চোখহীন ঘুমের সর্বত্র শুধু ঘুম

কপালের দু’পাশে সাগরের ঢেউয়ের মতই নাড়ি টিপটিপ করে

মনে হয় দুই খন্ড ভাবনার সমুদ্র এরপর কি হল?

না, এর আগে কি হয়েছিল? অনশ্য আগে-পরে বলে কিছু নেই

যাত্রা সব সময়ই বর্তমানের

নৌকা, মৃত ঠাকুরমা আর পিংকি বিড়াল সবকিছুই বর্তমান মুহূর্তের অস্তত্বশীল

সবকিছুই স্থিরীকৃত

স্থির আবার চলমান

ঘুমের বিপুল ননীর মধ্যে সবকিছু দোলে…

মুখে চোখ নেই। চোখে তারা নেই

আছে কেবল সর্বব্যাপী ঘুম

দুই চোখের পাতা জুড়ে ঘুমের প্রপাত।'

 

মুনিরার জন্ম ৬ জানুয়ারী, ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাস্তারশায়ারে। ওয়েলসের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা যেহেতু বাংলাদেশের বাইরে তাই বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে জানবার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় একসময় তিনি দীর্ঘ দিনের জন্যে দেশে গিয়ে বসবাস করেন। শেখেন ভাষা ও সাহিত্য। বাংলা কবিতা ও গদ্য রচনার কলাকৌশল। এ বিষয়ে নিজেকে করে তোলেন পারদর্শী। প্রস্তুত করেন আগামীর একজন নিয়মিত সাহিত্যসেবী হিসেবে।

দেশ থেকে লন্ডনে ফিরে গিয়ে কাব্য চর্চার পাশাপাশি লন্ডনের কার্ডিফে বাংলাভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন বাংলা একাডেমি ইন্টারন্যাশনাল। অনিবার্য ভাবে তিনি জড়িত ছিলেন এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে। তিনি সগৌরবে লন্ডনের কার্ডিফে এক্টুকরো বাংলাদেশ নিয়ে আসেন। সেখানকার বাঙালী ছেলেমেয়েরা নিজেদের দেশের গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন। দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বিশ্ব মানবতার কথা বলেন। পৃথিবীর নানান দেশের মানুষের সামনে প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশকে। কবি মুনিরা চৌধূরী ছিলেন সেই সকল সফল কর্মকান্ডের উদ্যোক্তা। হাতে হাত ধরে সবাইকে নিয়ে কাজ করে গেছেন নিরলস।

ইংল্যান্ডে জন্ম, বেড়ে ওঠা সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েও তিনি বাংলাকেই ভালোবেসেছিলেন। বাংলা ভাষাকেই মাধ্যম করেছিলেন তার কাব্য চর্চার জন্যে। ইংরেজীতেও লেখালিখি করেছেন একসময় এবং তার কাব্যগ্রন্থ ‘ক্লোজ টূ মাই আই পেন্সিল' একটি অনবদ্য রচনাও বটে।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তার প্রভূত স্বপ্ন ছিলো যে স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের সাথী হিসেবে পেয়েছিলেন বন্ধু কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুকে। মঞ্জু একজন কবি। দুজনার আদর্শ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রটি এক হওয়ায় এই বন্ধুত্ব একটি সুগভীর বন্ধন তৈরি করেছিল। মুনিরা ও মঞ্জু দুজনেরই ছিল আলাদা আলাদা পারিবারিক জীবন। ছিল সন্তান সংসার স্বামী বা স্ত্রী। পৃথিবীর প্রথাগত সম্পর্কের আওতায় আসেনি ওদের সম্পর্ক। সমাজ সংসারে তাই ওদের সম্পর্ক ছিল অনুচ্চারিত। আত্মীয়, স্বজন, বন্ধু বান্ধব কারো কাছেই এই সম্পর্ক গ্রহনযোগ্য হয়নি। কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু যখন দুরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তখন মুনিরা লিখলেন ‘অন্য কোনো সঙ্গ বা অনুষঙ্গে নয় আমরা এক সঙ্গেই মারা যাবো…

পরদিন মারা গেলেন মঞ্জু। মুনিরা লিখেছিলেন সেই অদম্য একাত্বতার কথা- কে ডাকছে আমায়, তুমি না ঈশ্বর! এর কয়েক ঘন্টা পরেই মৃত্যু হয় মুনিরার।

কিভাবে মুনিরার মৃত্যু হলো, কেনো হলো, এ নিয়ে প্রচুর সংশয় আছে। কুয়াশাঘেরা এক রহস্যের জাল বিছানো রয়েছে আমাদের চোখে। মুনিরা চৌধূরীর লেখায়, কবিতায় বা ফেসবুক স্ট্যাটাসে বোঝা যায় মঞ্জুর মৃত্যু তাকে অনিবার্যভাবে আত্মহননের পথে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় কেনো তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর সকল স্মৃতি উধাও করা হলো। সোসাল মিডিয়া থেকে তার সকল চিহ্ন মুছে দেয়া হলো! কোথায় কীভাবে তার মৃত্যু হলো! কোথায় তার ফিউনারাল হলো! কোথায় তাকে সমাধিস্ত করা হলো! শোনা যায় মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে সে ফোন করেছিলো বাচ্চাদেরকে গ্রোসারী দোকান থেকে। তাদের কিছু লাগবে কিনা জানতে চেয়েছিলো। তাহলে কখন সে গেলো সমুদ্রপারে! আবেগের আবরনে ঢাকা পড়ে গেলো কি তার মৃত্যু রহস্য? অনার কিলিং এর মতো আমাদের সমাজের, ধর্মের, মানুষের মিথ্যে মানমর্যাদার ভয়ে কেউ ওকে হত্যা করেনি তো! মনে হাজারো প্রশ্ন আসে ভিড় করে। মুনিরা কেবল ভালোবেসেছিলো। কোনো অপরাধ করেনি। তবে কেনো এই রহস্য !

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় সেই কতোনা সুদূরের এক কালো রাত্রির কথা। ১৮৮৪ সালের ১৯শে এপ্রিল। কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে একটি অপমৃত্যুর কথা। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর কথা। শোনা যায় ওপিয়াম কন্ঠে ঢেলে আত্মঘাতী হয়েছিলেন তিনি। যে রাতে তিনি চলে যান সেই রাত শেষ না হতেই তার শেষকৃত্তের সাথে সাথে তার সকল স্মৃতি বিনাশ করা হয়। সবাইকে বলে দেয়া হয় এই আত্মহত্যার কথা যেনো কেউ জানতে না পারে! নির্মম নিষ্ঠুর ভাবে সকল অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়া হয় কাদম্বরীর। ইতিহাসের একটি অন্যতম অধ্যায়কে মুছে দেয়া হয় চিরতরে। কেনো! সেকি কেবল রবির সাথে তার হৃদয়ের সম্পর্কের কারণে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাদম্বরীকে মনে রেখেছিলেন চিরদিন তার কবিতায়, গানে, স্মরণে কিন্তু তাঁর মৃত্যু নিয়ে মুখ খোলেননি কোনোদিন!

কেনো যেনো মনে হয় ঠিক তেমনি ভাবেই মুনিরার জীবনাবসানের সাথে সাথে তাকে মুছে ফেলা হলো। কিন্তু কেনো! কেনো মুনিরার কাছের বন্ধুরাও উচ্চারণ করেনি ওর নাম জানতে ইচ্ছে হয়। অথচ যখন ভাবি এই এতো বড় পৃথিবীতে মেয়েটি কি সাংঘাতিক ভাবে একা হয়ে গিয়েছিলো! সে যে ভালোবেসেছিলো কাউকে, কেবল সেই অপরাধে সংসার, সমাজ, স্বামী, সন্তান, আত্মীয়, পরিজন, বন্ধু বান্ধব, বিবেক সকল কিছুর দংশনে নীলকন্ঠী পাখির পালক হয়ে বেঁচে ছিলো! কেউ কি তার পাশে ছিলো কোথাও, এই ভাঙনের শোক এই মৃত্যু শোক, এই দিকদিগন্তব্যাপী হাহাকারে কেবল মানুষ হয়ে তার হাতটি ধরে! ছিলো না। কেউ থাকে না। আমরা মানুষ বলে অহংকার করি বটে কিন্তু আমাদের এই অহম মিথ্যে।

মননে মেধায় ও আধুনিক শিক্ষায় সমুজ্জ্বল মুনিরা ছিলেন মূলত একজন কবি। কবিতার ভেতরে তার শব্দেরা নড়েচড়ে ওঠে মৃতের শরীর বেয়ে। শীতের শেষে মৃত বৃক্ষের বাঁকলে যেমন জীবনের উন্মেষ তেমনি তার কবিতার উন্মেষ মরা পৃথিবীর আলোয় আলোয়। কবি মুনিরা চৌধুরীর কাব্য ও তার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মূল্যায়ন হোক। যে সম্মান্টুকু তার পাওনা তা যেনো সে পায়। তার অবিনাশী আত্মার শান্তি হোক।

কবি মুনিরা চৌধুরীর মৃত্যু এক কুয়াশা ঢাকা পৃথিবীর আবরন উন্মোচন করে গেছে যেখানে আমাদের প্রগতিশীলতার অহমিকায় ভরা মুখে লুকিয়ে থাকা সব দীনতা গুলো নির্লজ্জ ভাবে উদ্ভাসিত।

 

মুনিরার গুটিকতক কবিতা

খি-পল্লি
এবার সত্যি সত্যি বিদ্যুৎ চমকায়
খাঁচা থেকে পাখিগুলো বেরিয়ে আসে
বিদ্যুতের ছিদ্রে পাখিগুলো ঘুমিয়ে পড়ে আবার জেগে ওঠে।

ক্রমে পালক ঝরছে, পাতা ঝরছে, শিশির ঝরছে…
কতিপয় মানুষ পাখিদের শরীরে প্লাস্টিকের পালক লাগিয়ে দিয়ে যায়

পৃথিবীতে আবার ঝড় আসে
আর প্রতিটি ঝড়ের শেষে ভোর বেলা দেখি
ধর্ম বিদ্যালয়ের আলখাল্লা পরা সেই ছাত্রদের মতো
পাখিগুলো আমার উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ভবানীপুরের কবিতা
রক্তের ভেতর একটা নদী থেকে আরও একটা নদী

বিস্মৃতির ভবানীপুরে বৃষ্টি দিচ্ছে…
বৃষ্টি দিচ্ছে
বৃষ্টি দিচ্ছে
চোখ-ফাটা বৃষ্টির কান্না কোলে নিয়ে বসে আছি

আমার সিতানের বালিশের টুকরোগুলো এলোমেলো
ঘুম আসে…
ঘুম দাঁড়াতে পারে না কোথাও
ঘুম দৌড়াতে পারে না কোথাও
ঘুম বসতে পারে না কোথাও
ঘুম ঘুমুতে পারে না কোথাও

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে এলোমেলো আয়নার মুখ…

দিনান্তে
এ-যে কবিতা এক, চম্পাবতী নদীতীরে কেশর উড়িয়ে দেওয়া
বোবার না-বলা কথাগুলো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসা, তারপর
পাখিদের ঠোঁটে তুলে দেওয়া…
হায়!

শব্দ বদল হতে হতে পাখির সঙ্গে পাখা বদল করে কবিতা…

নদীতীরে বটগাছের গর্তে কাঁচা-পাকা সময় বেড়ে উঠছে ধীরে
দুলছে শীর্ণ তরুলতা, সাপের বাচ্চা

দিনান্তে পাখি উড়ে যায়
নদীতীরে পড়ে থাকে মানুষের পালক।

নাইওরি
বৃষ্টির সাথে কোনো এক নাইওরি এসেছিল মেঘে-ঢাকা গ্রামের ঐ পাড় থেকে
ভেজাচুলের বন্ধন খুলে বসেছিল
আমার বারান্দায়…
উপরের দিকে তাকিয়ে বললো
সিন্ধু মা, আকাশের গর্তগুলো ঝরে পরছে কেন, খসে পড়ছে কেন নরম নাভীগুলো
আমি তবে কোথায় গিয়ে থাকবো!

তারপর সে নিমিষে নাই হয়ে যায়
দিন যায়
বছর যায়
নাইওরি আর আসে না…
আর আমার বুকের বারান্দায়
চিরদিনের জন্য লেগে থাকে নাইওরির গন্ধ, মৃত্যুর মতো…

নয় দরজার নদী
১.
তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল নয় বছর আগে
এই নয় বছরে নয়-দরজার-নদী তৈরি করেছি
তুমি কি একবার সময় করে আসবে
জলের জানালাগুলো লাগিয়ে দিয়ে যাবে!

২.
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ছিপছিপে এক মাতামুহুরী নদী
নদী পেরিয়ে যাচ্ছে সময়
হাতের নীলবর্ণ রেখায় এ-কার ছায়া দেখা যায়!

ছাদের উপর বৃষ্টির গুঞ্জন থামছে না কিছুতেই
তানপুরার হৃৎপিণ্ডে আঙুল ফেটে গেলে বুঝতে পারি না
এ-কান্না উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের নাকি মাতামুহুরীর

ঘরের জানালা কিছুতেই বন্ধ হয় না
আমাদের জানালায় আটকে রয়েছে নদীর দরজা।

৩.
চাঁদের শরীর থেকে বের হচ্ছে ধূয়া ও শিশির
দুই হাজার বছর আগেকার রাত ছাই হবে দুই হাজার সতের সালে

দু’চোখের অন্ধ ছায়া উড়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
পাখিরা নৌকা চালায় বাতাসের নদে

নিঃশ্বাস ফেটে যাচ্ছে ধীরে
গাছের
মানুষের…
ফাটা-নিঃশ্বাসে তুমি কি একবারও আত্নহত্যা করতে আসবে না!

৪.
বিষ পান করছি নাকি বিষের নিঃশ্বাস নিচ্ছি
পান করছি পরমায়ু
প্রজাপতির ডানা লাগিয়ে দিয়েছি
ধীরে চলো
ধীরে চলো
নিমাই সন্ন্যাসীর গ্রাম যে বহু দূর

ঐ দূরত্বে
নিভে যাচ্ছে অতলান্ত এক আত্মার ছায়া…

৫.
কে যেন আমার কন্ঠস্বর থেকে
নিদ্রাতুর কিছু শব্দ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় নিধুয়া পাথারে
অতঃপর কাচের করাত দিয়ে শব্দগুলো কুচি কুচি করে ভাসিয়ে দেয়
আড়িয়াল খাঁ’র বুকে

ভাসে গলাকাটা নদী
ভাসে নারী
ভাসে গলাকাটা নক্ষত্র

শকুনের ডানায় চিৎকার ভাসে জল ও স্থলভূমে…
মৃত্যুর গন্ধ চৌদিকে

দূরে যাই
দূরে যাই
পৃথিবীর কোনো এক রান্নাঘরে আলু-পটল কাটতে ভুলে যাই
আমি আমাকে কেটে ফেলতে ভুল করি না
ওহ পাখি, পরমাত্মা…


  • ২৬১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

লুতফুন নাহার লতা

অভিনেত্রী ও লেখক

ফেসবুকে আমরা