রোহিঙ্গা তরুণীর আত্মকথন

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ ৮:৪২ AM | বিভাগ : ওলো সই


ছোটবেলা থেকেই আর্মির গরম চোখ দেখে দেখে বড় হয়েছি, আমাদেরই ভাইরা নাম লিখিয়েছিলো আরকানদের স্বাধীনতার যুদ্ধে। ২৫আগষ্টে ওরা বার্মার সেনাবাহিনীর উপর হামলা করলো, সেনাবাহিনী আমাদের উপর ক্ষেপে গেলো। পোড়ালো আমাদের ঘরবাড়ি, জমি। ভাড়াটে খুনিরা আমাদের মারলো, কোপালো। আচ্ছা ভাই বলেন তো? আরো কতবছর এরকম ভয়ে ভয়ে থাকার পর আমরা আর্মির প্রহসনের বিরুদ্ধে দাড়াতে পারবো? ওই যুদ্ধে হিন্দুরাও আছে।

 

 

কে কে জানি বলে,আমাদের ভাইরা নাকি মুসলিম দেশ করার জঙ্গি। শুনেছি, বাঙালি মুক্তিসেনাদেরকেও ১৯৭১ এ ভারতের দালাল,'র' এর লোক বলা হতো। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদেরও দালাল বলা হতো?

উৎকন্ঠা, খিদের জ্বালা আর সব সম্পত্তি ফেলে চলে এলাম এপাড়ের বাংলাদেশে। জীবন মোড় নেয়, জীবনের অবস্থা বদলায়। কাগজের তলে, মাটির উপরে শুয়ে কল্পনায় স্বানন্দে বাবার দিনের পর দিন বিঘা বিঘা জমির ধান কাটার ছবি দেখছি চোখে, ভাইদের ছেলে,বউরা মিলে একত্রে খেতে বসেছি বর্তনে, স্বপ্নে দেখছি বাজারে বড় ভাইয়ের দোকানে ভাত নিয়ে যাচ্ছি। অথচ আজ আমি কোথায়?

নীল আকাশ মাথার খুব কাছে। ১৬সদস্যের পরিবারের মুখে ভাত নেই ৩দিন ধরে। আমাদের ওখানকার ২ লক্ষ পরিমান মুদ্রা নিয়ে বেরিয়েছিলাম, মাঝনদীতে এসে দালাল ২ হাজার টাকায় সব টাকা নিয়ে নিলো, সেদিনই টাকা বেঁচে ভাত খেলাম শেষবার।

আমাদের নিয়ে নাকি সারা পৃথিবীতে তোলপাড় চলছে, ক্ষণে ক্ষণে টিভিগুলোতে লাইভ চালাচ্ছে সাংবাদিকরা। টিভিতে দেখালে বুঝি ভাত পাওয়া যায়? আমরা ভালো নেই, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন, ক্ষুধা পেটেই ভাষণ শুনতে গেছিলাম, ওখানে নাকি ভাত পাওয়া যাবে। আচ্ছা ভাত পেতে বুঝি এদেশে ভাষন শুনতে হয়?

আমি, আর বাবা গিয়েছিলাম সেখানে, আমাদের নাকি তালিকা করা হচ্ছে শুনলাম, তালিকা না করলে নাকি সাহায্য পাবোনা। লাইনে দাড়িয়ে নাম তুলেছি। আচ্ছা আমরা কবে খাবার পাবো? আচ্ছা আবার কি ভাষণ শুনতে হবে? খাবারের জন্য কি টাকা দিতে হবে? টাকা না দিলে কি ভাতের অভাব মারা যেতে হবে? কত টাকা দিতে হবে একমুঠো ভাত বাবদ? ২লক্ষ?!!

নিজের দেশ থেকে তাড়া খেয়েছি, আরেক দেশের উপর বোঝা হয়েছি পুরো পরিবার, আমাদের জমিতে কাজ করতো ৫০ জন, খিদে মেটাতে এখানে কাজ যেকোন খুঁজছে বাবা, ভায়েরা যুদ্ধে। পরিবারের জন্য কিছু করতে চাই আমিও। রহিম নাকি এখানকার বড় নেতা, কাজের কথা বলেছিলাম, ও বললো, এখানে নাকি শুলে টাকা পাওয়া যায়। আচ্ছা, রহিমের মা বোন,বউ সবাই কি শুয়ে টাকা আয় করে? এটাও বুঝি শারীরিক পরিশ্রমে আয় করা টাকা হয়? আচ্ছা টাকার জন্য শোয়া কি ধর্মে পাপ? না খেয়ে থাকলে কি কোরান হাদিসের পাপ হয়? খাবারের জন্য শরীর বেঁচলেও কি শরীরের পাপ হয়?

প্রকৃতির ডাক সাড়ার জায়গা নেই এখানে, পেচ্ছাব করতে হয় খোলা আকাশের তলে, রাত ছাড়া হাগা মুতা করিনা, রহিম এদিকে ঘুরঘুর করে,শরীর দেখানোয় আমার সরম। রাতেও রহিম আসে, আচ্ছা রহিম কি তার মা, বোন বউয়ের উদোম শরীর এভাবে দেখে? এদেশের মানুষেরা কি তাদের আত্মীয় স্বজনের উদোম শরীর দেখে? মানবতার সহায়তাকারীরা তোমরা কি উদোম শরীর দেখতে পছন্দ করো?

রোহিঙ্গা মেয়ে আমি, আমি অসহায় হয়েছি, আমি অসহায় হয়েছি একদল মানুষের তান্ডবের কাছে। আমি খিদের জ্বালায় মরছি, আমি শরীর বেচছি, আমি উদোম হয়ে প্রকৃতির ডাক সারছি, মানবতাবাদীদের সামনে, মানবতাবাদীদের কাছে, শান্তির দেবির জন্যে।


  • ২৮৫৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

এম আরিফুল ইসলাম

সাধারন সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা জেলা সংসদ

ফেসবুকে আমরা