মহুয়া ভট্টাচার্য

চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী পত্রিকার 'খোলা হাওয়া' পাতায় লেখালেখির শুরু। এবারের বইমেলায় একটি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের নাম - " মহুয়ার গল্প।"

Marital rape: বৈবাহিক ধর্ষণ

 
বিয়ে নামের সামাজিক রীতির উদ্দেশ্য দুটো মানুষ ও দুটো পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা স্থাপন এবং দুটো বিপরীত লিঙ্গের মানুষের একই ছাদের নিচে বসবাসের বৈধ স্বীকৃতিও বটে। তবে আমাদের সমাজে বিয়ের এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিতে মূলত যে সত্যটি আড়াল করে রাখা হয়, তা হলো বেশিরভাগ বৈবাহিক সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য থাকে কন্যা সন্তানটিকে পাত্রস্থ করে সামাজিক দায়মুক্ত হওয়া এবং অপরদিকে পুরুষটির জন্য একটি বৈধ যৌন সঙ্গী খুঁজে দেওয়া। এক্ষেত্রে নারীটির মানসিক কিংবা শারীরিক সক্ষমতার প্রসঙ্গ গৌণ- তা হোক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা শহুরে আত্মনির্ভরশীল নারী, বেশিরভাগই এই বৈষম্যের স্বীকার। এখনো আমাদের সমাজে নারী মানেই একটি জরায়ু এবং এক জোড়া স্তন, পুরুষের শয্যাসঙ্গী এবং তার সংসারের অসীম দায়ের অংশীদার একজন। জন্মলগ্ন থেকেই নারী এই বৈষম্যের স্বীকার। 
 
বিয়ে যতটা না সামাজিক বন্ধন, তার চেয়ে বেশি দায়িত্ব অর্পণ। কন্যাদায়ে নিমজ্জিত পিতার আকন্ঠ সামাজিক অনিশ্চয়তার দায় হস্তান্তর যার সদ্য বলী- চৌদ্দ বছরের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নূর নাহার। গার্মেন্টস কর্মী বাবা মায়ের মেধাবী সন্তান ৩৪ দিন পর্যন্ত স্বামীর শারীরিক অত্যাচার সহ্য করে পিতা মাতাকে  দায়মুক্ত করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো চিরতরে।  টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার ফুলকি পশ্চিমপাড়া গ্রামের প্রবাসী রাজীব খানের সাথে বিয়ে হয় নূর নাহারের। অপ্রাপ্ত বয়সের শারীরিক সম্পর্কের কারণে বিয়ের দিন থেকেই যৌনাঙ্গে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। কিন্তু নূর নাহারের পরিবার এবং তার স্বামীর পরিবার বিষয়টি জেনেও তার চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেয় নি। উপরন্তু, তার এই শারীরিক অবস্থায়ও স্বামী রাজীব খানের পাশবিকতা বন্ধ হয় নি। শেষ পর্যন্ত বিয়ের একমাস পর স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন নূর নাহারের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা আজ কিংবা আগামী এক মাস আমাদের সংবেদনশীল মনে তোলপাড় হবে, তারপর আমরা সবাই ভুলবো।  যেভাবে ভুলেছি অন্যদের। 
 
নুর নাহার বৌবাহিক ধর্ষণের স্বীকার। এই ঘটনার সাথে দুটি বিষয় ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত- এক- নূর নাহারের অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে। এবং দুই- তার স্বামী ও পরিবারের চরম পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব।  নূর নাহারের ক্ষেত্রে তার বয়স, শারীরিক অবস্থা কোনো কিছুই বিবেচনা না করে তার ওপর অমানুষিক যৌন নির্যাতন করা হয়েছে, পরিনামে মৃত্যুবরন করতে হয়েছে তাকে। অবশ্য যে দেশে গণধর্ষণের পর অপরাধী বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াতে পারে, ভিকটিমকে শাসাতে পারে, সেদেশে স্বামীর জোরপূর্বক শারীরিক সংসর্গের বিচারের দাবী অনেকের কাছেই হাস্যকর বটে। এর প্রধান কারণ পুরুষ তার স্ত্রীটিকে একচেটিয়া নিজের সম্পদ মনে করে। আমাদের দেশের আইনের প্রেক্ষিতেও বৈবাহিক ধর্ষণ নামের অপরাধের কোনো বর্ণনা দেওয়া হয় নি। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারাগুলোর কোথাও বৈবাহিক ধর্ষণের কথা বলা হয় নি। বাংলাদেশ সরকারের ২০১০ সালের Domestic violence ( Prevention and protection)  Act - এ Sexual Abuse এর কথা বলা হলেও তার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, উপাদান বর্ণনা করা হয় নি। তাহলে নূর নাহারদের কি হবে? নূর নাহার মরে গিয়ে বেঁচে গেলো এমন পাষন্ড স্বামীর হাত থেকে। কিন্তু যারা ধুঁকে ধুঁকে মরছে, তাদের কি হবে? তারা কার কাছে জানাবে এই কষ্টের কথা? ধর্ষকের সাথে চির সহবাস কতদিন মেনে নিতে পারবে তারা? এই করোনাকালীন সময়েও এপ্রিল মাসে দেশের ২৪ টি সংগঠন ২৭ টি জেলায় মোবাইল ফোনের একটি জরিপ প্রকাশ করে। তাতে শুধু মাত্র এপ্রিল মাসেই বৈবাহিক ধর্ষণের স্বীকার হয় ৮৫ জন নারী।  খুব সহজ হিসাবেই আমরা বুঝে নিতে পারি এই সংখ্যা আরো বহুগুণ বেশি। ধর্ষণকারী হিসেবে আমরা সাধারণত দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরের জোরপূর্বক শারীরিক সংসর্গ বুঝতে শিখেছি। কিন্তু তার বাইরেও যে বৈবাহিক ধর্ষণ নারীরা নিভৃতে মেনে নেয়, তা খোদ ভিকটিম নিজেরই অজানা থাকে কখনো কখনো। 
 
সময় এসেছে এই বিষয়গুলোতে সচেতন হওয়ার। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যা প্রয়োজন তা হোলো কিশোর বয়সেই পরিবার ও বিদ্যালয়ে যৌন শিক্ষা প্রদান। প্রয়োজন  বাল্যবিবাহ রোধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের সংস্কার। সর্বোপরি, যে বিষয়টি সর্বাগ্রে প্রয়োজন, পুরুষতাত্রিক মনোভাবের পরিবর্তন। নারীর প্রতি সহনশীল হোক পৃথিবী। নূর নাহারদের কৈশোরের উচ্ছ্বাস, নির্মল জীবন নিশ্চিত হোক।

281 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।