মাতৃত্ব-ইচ্ছা এবং ডিম্বানুর স্বাধীনতা বনাম সামাজিক চাপ

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭ ২:৩৪ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


গতকাল থেকে একটা লেখা ফেসবুক  টাইমলাইনে বহুবার শেয়ার হয়েছে, ডাক্তার মেয়েদের ডিম্বানুর হিসাব করে বয়স ত্রিশের আগেই গর্ভবতী হওয়া প্রসঙ্গ। লেখিকা আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় একজন ম্যাডাম, নাম নিচ্ছি না কারণ ব্যক্তিগত তর্কে যেতে চাই না বলেই, ম্যাডাম আমাদের অনেকেরই আদর্শ এবং খুবই ক্যারিয়ার-সফল গাইনোকলজিস্ট। ম্যাডামের মতো অবস্থায় থেকে কেউ যখন বলেন 'মাতৃত্ব-ই মেয়েদের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার', তখন আসলেই ধাক্কা খেতে হয়!

তাহলে কি এসএসসি পাশের পর আর পড়াশুনা না করে বিয়ে করে মা হয়ে এখন বাচ্চাদের স্কুলে নেয়া-আসা করাটাই বিরাট সাফল্য হতো সমাজের চোখে?

মাতৃত্ব চমৎকার জিনিস, গড়পড়তা হিসাব করলে বহু মেয়ের জীবনই বিয়ে করে বাচ্চা নেয়াটা একটা বিরাট স্বপ্ন পূরণের মতো ব্যাপার।
কিন্তু এই ২০১৭ সালে আমার চারপাশে, অসংখ্য, আই রিপিট, অসংখ্য মেয়ে আছেন যারা বিয়ে করা এবং বাচ্চা নেয়াটাকেই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য মনে করেন না।

আমাদের দেশে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করতে করতে ২৫/২৬ বয়স হয়ে যায়, এরপর সরকারী চাকরীতে প্রবেশের বয়স ৩০। এই চারটা বছর খুবই চ্যালেঞ্জিং। এখানে বিয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এক ধরনের জীবন থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, অনেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন এর চিন্তা শুরু করেন, আর চাকরীর লড়াই তো রয়েছেই। এর মধ্যেই যদি দুটো বাচ্চা নিয়ে 'পরিবার কম্পলিট' করার পরামর্শ আসে ডাক্তারের কাছ থেকে তাহলে আসলে মেয়ে-মানুষের মেয়ে-রোবট হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

মেয়েদের ত্রিশের পরে ডিম্বানুর রিজার্ভ কমতে শুরু করে, ডিম্বানুর কোয়ালিটি ফল করে এইটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু চল্লিশের পরে স্পার্মের কোয়ালিটি ফল করে তাই চল্লিশোর্ধদের দ্বিতীয়/তৃতীয়/চতুর্থ বিয়ে কিংবা চল্লিশোর্ধ পুরুষদের যে বাচ্চা নেয়া উচিৎ হবে না -এমন একটা লেখা কিন্তু কেউ কোনো দিন লিখে না!

আমাদের দাদী নানীর ১০-১৫ টা বাচ্চার শেষের দিকের বাচ্চাগুলোকে তো ত্রিশের অনেক পরেই হওয়া, এটা কোনো মিরাকল না! হ্যা, ত্রিশের পরে মাতৃত্বে ঝুঁকি বাড়ে, সে হিসাবে কেউ খাটো হলে আমরা কি বলি, লম্বা হও, লম্বা হও! খাটো হলে প্রেগন্যান্সি হাই রিস্ক হয়।

আন্ডার ওয়েট/ওবেস কাউকে দেখলেই কি আমরা উপদেশ দেই, মোটা/চিকন হও যেন মা হতে পারো?
ন্যারো পেলভিস হাই রিস্ক প্রেগন্যান্সির কজ ছিলো, তো সিজার এসে সেটাকে কজ থেকে কি বাদ দেয়া হয় নি? বাইরের দেশে কি ডিম্বানু রিজার্ভ রাখার প্রসেস অলরেডি স্টার্ট হয় নি? সেটা বাংলাদেশেও হয় তো হয়ে যাবে।
তো?

সমস্যা হলো আমরা সবকিছু জেনারেলাইজড করে ফেলি। মাতৃত্বের সকল দায় ডিম্বানুর উপর চাপিয়ে দিয়ে সেটিকে ক্যারিয়ারের সাথে সাংঘর্ষিক করা খুব অদ্ভুত জেনারালাইজেশন। আমাদের অনেক ডাক্তারদের খুব প্রিয় উপদেশ -বাচ্চা নিয়ে নিন।
ডিসমেনোরিয়া?
-বাচ্চা নিন।
ইরেগুলার পিরিয়ড?
-বাচ্চা নিন।

ডাক্তার হবার জন্যই আমরা জানি, প্রেগন্যান্সি হরমোন লেভেলে অনেক চেঞ্জ আছে তাই এইসব সমস্যার সমাধান অনেকেরই হয়, কিন্তু বাচ্চা হবার পরেও ডিসমেনোরিয়া বা ইরেগুলার পিরিয়ডে ভুক্তভোগী মেয়ের সংখ্যা কিন্তু একদমই কম না, তাই 'বাচ্চা নিয়ে নেন' চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ বলে মনে হয় না!
এর থেকেও বড় কথা, বাচ্চা আদৌ নিতে ইচ্ছুক কিনা সেই ভুক্তভোগী পেশেন্ট, এটা জিজ্ঞাস করার মতো 'স্মার্ট' ডাক্তার কতজন হতে পেরেছি আমরা?

আমার সৌভাগ্য আমার চারপাশে অসংখ্য ডাক্তারের মধ্যে কয়েকজন ডাক্তার আছেন, যাদের কাছে এইরকম পেশেন্ট রেফার করার পর শুনি, ম্যাডাম অনেক যত্ন করে দেখে দিয়েছেন। কিন্তু এক রুমে একসাথে পাঁচজন মহিলা পেশেন্ট ঢুকিয়ে 'সেলোয়ার খুলে বসুন' এই অভিযোগ কিন্তু রোগীরাই করছে! তাহলে কে বাচ্চা চায় আর কে বাচ্চা চায় না সে হিস্ট্রি কে নেবেন?

রোগী/মেয়েটি কত বছর বয়সে নিবেন, কয়টি বাচ্চা নিবেন (দুইটা বাচ্চা নেয়াই যে আদর্শ এটা অনেকে না-ও মনে করতে পারেন), সর্বোপরি আদৌ বাচ্চা নিবেন কি না এই সিদ্ধান্তগুলো আসলে ডাক্তারদের এবং সমাজের কাছ থেকে আসা উচিৎ না। দুইটা মানুষ যদি স্বেচ্ছায় (হ্যা,পরিবারের সিদ্ধান্তেও) বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, বাচ্চার ব্যাপারটি শুধুমাত্র পারস্পরিক সিদ্ধান্তে হওয়া উচিৎ। বয়স ত্রিশ পেরিয়ে যাচ্ছে/বন্ধু বান্ধবদের বাচ্চা হয়েছে/বেকার বসে আছি ইত্যাদি কারণে কেউ যদি বাচ্চা নেয়ার সিদ্ধান্তই নেয়, তবে মাতৃত্ব ব্যাপারটি 'উপভোগ'-এর থেকে 'চাপ' হবার সম্ভাবনা প্রবল।

আমার চারপাশে অনেক পরিবার এবং অনেক মেয়ে আছে, যারা মাতৃত্বকেই প্রধান ক্যারিয়ার মনে করে না।
এদের কেউ পাহাড় জয়ের স্বপ্ন দেখেন, কেউ প্রোগ্রামিং এ সুখ খুঁজে পান, কেউ একটা বিল্ডিং ডিজাইন করে অপার মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকেন, কেউ অনেক অর্থ উপার্জন করে নিজের পরিবারকে স্ট্যাবল করতে চান, কেউ কেউ সদ্যজাত শিশুকে ধর্ষণ করা এই বাংলাদেশে একটা শিশুকে বড় করতে প্রবল অনীহা অনুভব করেন, কেউ কেউ নিজেদের ভালনারেবল পারিবারিক জীবনে একটা শিশুকে জন্ম দিয়ে অযথা জটিলতা বাড়াতে চান না।

ট্রাস্ট মি এরা খুব অপরিচিত নন, আমাদের আশেপাশে এদের সংখ্যা নেহায়েত-ই কম না। আর মা হতে চাইলেও ত্রিশের আগেই নিজেকে মা হবার মতো প্রস্তুত আসলে মনে করেন কতজন মেয়ে?

একজন সুস্থ নারী রোগী যদি ৪৫ বছরে কিংবা ১৮ বছরে মা হবার ইচ্ছা নিয়ে কোনো ডাক্তারের কাছে যান, তাকে তার ঝুঁকিটুকু জানিয়ে দেয়াটাই ডাক্তার হিসেবে আমাদের কর্তব্য, তাকে এই বাচ্চা রাখা/এবোর্ট করার উপদেশ দেয়া কিংবা তার পরিবার পরিকল্পনায় অংশ নেয়াটা ডাক্তার হিসেবে আমাদের কাজ না। ডাক্তার হিসেবে কিংবা সামাজিক মানুষ হিসেবেই অন্যের প্রতি আমাদের মরাল পুলিশিং করা থেকে বিরত থাকা খুব দরকার।

মাতৃত্ব এবং ডিম্বানুর স্বাধীনতা আসলে যার যার হওয়া উচিৎ, সে আমি রোগীই হই কিংবা ডাক্তার হই, অথবা শুধু মানুষ, মেয়েমানুষ হই।


  • ৮০০৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ডা. রুমানা বিনতে রেজা

মেডিকেল অফিসার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা