অপহরণ এবং হুমকির বিবরণ- প্রসঙ্গ: পার্বত্য চট্টগ্রাম

বুধবার, নভেম্বর ২১, ২০১৮ ৩:২৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


১৭ নভেম্বর ২০১৮ দুপুর ১:৩০ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাসৃষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাসৃষ্ট নব্য মুখোশ বাহিনীর ২ সদস্য অামাকে ফোন করে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়। অামি প্রতিবাদ করলে তারা অারো ক্ষেপে যায় এবং আমাকে যেখানে পাবে সেখানে ধর্ষণ এবং প্রাণে মারার হুমকী দেয়।

এই অবস্থায় অামি নিরাপদ বোধ মনে করছি না। তাই অামার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় অাছি। গত মার্চ মাসে আমাকে অপহরণ করা হয়েছিলো। কারা কিভাবে আমাদের অপরহরণ করেছিলো সেই ঘটনাটি আমি আবার সকলের জন্য এখানে তুলে ধরছি।

 

অপহরণের বিবরণ:-

১৮ মার্চ সকালে নব্য মুখোশবাহিনীর সন্ত্রাসীরা হঠাৎ ছাত্রদের মেসঘর লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করে। এরপর সবাই দৌড়ে পালাতে থাকে। তখন অন্যদের মতো আমিও সেখান থেকে পালিয়ে একটা শৌচাগারে আশ্রয় নিই। সন্ত্রাসীরা আমাকে দেখে ফেলে। তারা সেখানে যায় এবং বেড় হয়ে আসতে বলে। আমি আসতে না চাইলে আমাকে গুলি করে মারার ভয় দেখায়। এসময় সেখানে আরেকজন সন্ত্রাসী গিয়ে আমাকে পিছমোড়া করে বেঁধে মারধর করে। পরে ছাত্রদের মেস ঘরে এনে উঠোনের একটা গাছে বেঁধে রাখা হয়। এরপর দয়াসোনা চাকমাকেও সেখানে আনা হয়। পরে দু’জনকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

আমাদেরকে প্রথমে নান্যাচরের ইসলামপুর আর্মি ক্যাম্পের কাছে গুল্যাছড়ি নামক গ্রামে এক জনৈক পাহাড়ির বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে দুইদিন যাবৎ মুখোশবাহিনীর সর্দার তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা আমাদের খুব খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে ও ধর্ষণের হুমকি দেয়। তিনি এসময় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে– ‘আগে তোমাকে মোবাইল ফোন করে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছি, এবার তা বাস্তবায়ন করব’। তারা আমাদেরকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারে এমন আশংকাও আমাদের ছিলো। পরে ২০ মার্চ একটি ইঞ্জিন বোটে করে নান্যাচর উপজেলা থেকে মহালছড়ি উপজেলায় জেএসএস সংস্কারপন্থীদের ঘাঁটি এলাকা হিসেবে পরিচিত মুবাছড়ি নামক এলাকায় ধনপুদি বাজারে সশস্ত্র প্রহরায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে প্রায় দুই দিন দুই রাত পায়ে হেঁটে দিঘীনালা ও লংগদু সীমান্তবর্তী এলাকা মেরুং-এ নিয়ে জায়গা বদল করে কয়েকটি বাড়িতে জিম্মি করে রাখা হয়।

আমরা অকথ্য মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি, প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবো কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। অপহরণ ছিলো পরিকল্পিত, সেনা-নব্য মুখোশবাহিনী ও জেএসএস এমএন লারমা দলের একটি গোষ্ঠী মিলিতভাবে এ ধরনের ঘৃণ্য ন্যাক্কারজনক কাজ করেছে। আন্দোলনের চাপেই তারা আমাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ছেড়ে দেয়ার আগে নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে তারা হাস্যকর নাটক করে, আমাদের দিয়ে ভিডিও রেকর্ডিং করিয়ে তাদের সপক্ষে কথা বলতে বাধ্য করায়। আমাদের সাথে ছবিও তুলেছে। কাছে থেকে আমরা তাদের কাণ্ডকারখানা দেখে এসেছি, তাদের হাঁড়ির খবর জেনেছি। তাদের ব্যাপারে আমাদের যে সন্দেহ ছিলো, অপহৃত হয়ে আমরা তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়েছি। আমরা নাটের গুরু আর খেলারামদের চিনে ফেলেছি, যা পর্যায়ক্রমে উত্থাপিত হবে।

 ১৮ মার্চ সকাল ৯:৩০টার দিকে আমরা কুদুকছড়ি ছাত্রদের মেস থেকে অপহৃত হই। ১৯ এপ্রিল রাত ৮টায় খাগড়াছড়ি সদরের এপিবিএন গেইটের সম্মুখে আমাদের অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেয়া হয়। যখন এ আয়োজন সংঘটিত হচ্ছিলো, তার অল্প কিছু দূরে (আনুমানিক ৫০ গজ) নিরাপত্তা চৌকি থেকে আমর্ড পুলিশের জওয়ান নির্বাক দৃষ্টিতে শুধু দৃশ্য অবলোকন করেছিলো।

মূলত তিনটি শর্ত দিয়ে অভিভাবক ও জামিনদারের হাতে আমাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। কোনো কোনো মিডিয়ায় মুক্তিপণ দেয়ার কথা বলা হলেও, তা সত্য নয়। শর্তসমূহ এই, (১) রাজনীতি করা যাবে না। (২) নব্য মুখোশবাহিনীর সর্দার বর্মার অনুমতি ছাড়া গ্রামের বাইরে যেতে পারবো না। (৩) অপহরণের বিষয়ে কারোর কাছে মুখ খোলা যাবে না। এসব শর্ত ভঙ্গ হলে আমাদের ও অভিভাবকদের কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।

ছেড়ে দেয়ার দু’দিন আগে ১৭ এপ্রিল তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা আমাদের সাথে কথা বলে ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত দেয়। মুক্তির পর আমরা সংগঠনে যুক্ত থাকতে পারবো না, অন্তত জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সাংগঠনিক কাজকর্ম থেকে আমাদের বিরত থাকতে বলেছিলো। সে আমাকে চাকুরী জুটিয়ে দেবে বলেও প্রলোভন দেখায়। এমনও বলে ‘নারী আর কী করবে, বিয়ে করে সংসার করতে হবে’ বলে মন্তব্য করে। তার অনেক কথাবার্তা অসংলগ্ন।

১৮ এপ্রিল সে আবার আমাদের সাথে দেখা করতে আসে। এবার আসে সেজেগুজে নতুন পোশাক পরে, হাতে ছিলো একটা সাদা এনড্রয়েড ফোন। আমাদেরকে তার পাশে বসিয়ে অনেকগুলো ছবি তোলে।

পরদিন ১৯ এপ্রিল রাতে আমাদেরকে অভিভাবকের কাছে হাতে তুলে দেয়। দিনের বেলায় আমাদের অভিভাবকদের সাথে অন্য একটা জায়গায় তারা আলাদাভাবে কথা বলে, যা আমরা জানতাম না। ছাড়া পাওয়ার পর আমরা তাদের “শর্তের” কথা জানতে পারি।

অপহরণকারীরা এমনভাবে সময় মিলিয়ে আমাদের ছেড়ে দেয়, যাতে দিনের বেলা আমরা আমাদের সংগঠনের কারোর সাথে যোগাযোগ করতে না পারি। অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিরা আমাদের নিয়ে যার যার গন্তব্যে রওনা দেন। এলাকায় পৌঁছতে আমাদের রাত হয়ে যায়।


  • ১০০৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মন্টি চাকমা

সাধারণ সম্পাদক, হিল উইমেন্স ফেডারেশন।

ফেসবুকে আমরা