অপহরণের এক বছর পরেও হত্যা, ধর্ষণের হুমকি থেকে রেহাই মিলেনি

বুধবার, মার্চ ২০, ২০১৯ ৩:২২ AM | বিভাগ : আলোচিত


অপহরণের এক বছর....... এটি জীবনের এক কালো দিন। অাজ এইদিনে অর্থাৎ ১৮ মার্চ ২০১৮ তে অামাকে অার সহযোদ্ধা দয়াসোনাকে সেনাসৃষ্ট নব্য মুখোশ বাহিনীর সর্দার তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মার) নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একদল সন্ত্রাসী সশস্ত্র অবস্থায় অস্ত্রের মুখে কুদুকছড়ি অাবাসিক এলাকা থেকে অামাদের অপহরণ করে।
 
সেদিন সকাল সোয়া ৯ টা...  অামরা প্রতিদিনের ন্যায় খাবার গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ ব্রাশ ফায়ার, অামি আঁতকে উঠলাম। নির্জন স্থানে পালিয়ে গেলাম। সন্ত্রাসীরা অামায় দেখে ফেলে। প্রথমে সেখান থেকে অাসতে চাইনি। মুখোশ বাহিনীর সদস্য "পলো" নামক ব্যক্তিটি অামার পায়ে এক রাউন্ড গুলি করে ভয় দেখায়। পরে সেখান থেকে অামায় ধরে নিয়ে অাসে।
 
দুই হাতে পিছনে রসি দিয়ে একটা গাছের মধ্যে অামাকে বেঁধে রাখলো। সাথে কয়েকটা চর গালে পুরস্কৃত হলো। অামার সামনে মেসটি অাগুন ধরিয়ে দিল। অাগুন জ্বলছে... অন্যদিকে সহযোদ্ধা ধর্ম দাকে গুলি করে, সে অাহত অবস্থায় শুয়ে রয়েছে।
 
তারপর অামাদের নেওয়া হচ্ছে... প্রত্যেকেরই জীবনে মায়া থাকে তাই অামি বর্মাকে বললাম অামাদের ছেড়ে দিন, কোনো লাভ হয়নি।।
 
দীর্ঘ ৩৩ দিন বন্দী দশা যে কাটিয়েছে সেই একমাত্র বুঝতে পারবে বন্দী জীবন কি! সে অনেক কথা, অনেক দুঃখ, বিশদ অালোচনা... সেভাবে বিবরণ সম্ভব নয়।
 
মোটামুটি বেঁচে থাকার অাশা ছেড়েই দিয়েছি... তখন সবকিছু মানিয়ে নিয়ে দুজনে বলতাম... অার ফেরা হলো না সংগ্রামের পথে।
 
অামাদের অপহরণের সময় ইউপিডিএফ ভুক্ত সকল সহযোদ্ধা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্র-নারী সংগঠন, মানবাধিকার, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, নিপীড়িত পাহাড়ের মানুষ, অামার শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থকসহ যে যেভাবে পারেন অামাদের মুক্তির  জন্য  সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। 
 
তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছ, অামাদের মুক্তির দাবিতে ১৯ টি সংগঠন ঢাকায় একত্রিত হয়ে জোড়ালো প্রতিবাদ করেছে, সংগঠিত হয়েছে। সেটা অামাদের মুক্তির পথটা অারো সহজ করেছে। এজন্য  অামি অাপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
 
অারেকটি ক্ষোভের বিষয়, ঢাকা থেকে অামাদের মুক্তির দাবিতে ছাত্র অার নারী সংগঠন নান্যাচরের প্রোগ্রামে এসে সেনাবাহিনীর নগ্ন হামলা দেখে পাহাড়ে চলমান নিপীড়নের বিষয়টি অারো স্পষ্ট হয়েছেন।
 
ঠিক অামাদের অপহরণের সাথে সেনাবাহিনী প্রতোক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সেটা অামাদের বুঝতে বাকী  ছিলো না।
 
এপ্রিল ১৯ দুজনের বাবা- মা,মুরব্বীদের ডেকে অামাদের তিনটি শর্তে মুক্তি দেয়া হলো।
         ( ক) কোনো রাজনীতি বা সংগঠন করা যাবে না।
          ( খ) গ্রাম থেকে বর্মার অনুমতি ছাড়া কোথাও যাওয়া যাবেনা।
           ( গ) কারা অপহরণ করেছে সে বিষয়ে মুখ খোলা যাবেনা।
 
এই------------
 
বন্ধুরা, মুক্তির পর যার যার বাড়ি ফেরত অাসলাম। বাড়িতে এসে নির্ভয়ে থাকতে পারবো সেটা কপালে জুটেনি। রাত্রে কখনো পানিতে, কখনো জঙ্গলে কাটাতে হয়েছে অামার। 
 
এখনো সেসব মনে পড়লে চোখের জল নামে। একদিন রাত্রে কাল বৈশাখের বৃষ্টিতে সব বিছানা-কাপড় ভিজে গেছে। সেদিন রাত্রিটা নিন্দ্রাহীন ছিলাম, সাথে মা।
 
অপহরণের পর নিয়ম মাফিক থানায় মামলা হয়েছে অথচ অামাদের উদ্ধারের ব্যাপারে দৃশ্যমান কোন ভূমিকা তো ছিলই না এমনকি মুক্তির পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন খোঁজ নেয়া হয় নি। এর দ্বারা কি প্রমাণিত হয়না অপহরণের ঘটনার সাথে রাষ্ট্র জড়িত?
 
এরপর চুরি করে ঢাকায় গেলাম  শুরু হলো বর্মা কর্তৃক বাবা-মা'কে হুমকীর দৃশ্য। ১২ টার মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার হুমকী অাসলো সাথে বিশ্রি ভাষায় গালি-গালাজ। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ছাড়া তো উপায় নাই।
 
বন্ধুরা, অান্দোলন সহজ পথ নয়, এটা মেনে নিতে হয়। তাই সকল বাঁধা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। অামাদের পাহাড়ের অান্দোলন যেমনি ভিন্ন, তেমনি অারো অনেক কঠিন।
 
অাজকের  এই কালো দিনে যারা অামাদের অপহরণের সময় সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
 
অার দুর্দিনের সময় অার এখনো পর্যন্ত অামার বাবা-মা, ভাই-বোন অামার জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করে অাজ পর্যন্ত অামায় সাহস, বুদ্ধি যুগিয়ে যাচ্ছেন, সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের জানাই সংগঠনের পক্ষ থেকে বিপ্লবী লাল সালাম অার অশেষ ধন্যবাদ।
 
পরিশেষে, পাহাড়ের সেনাবাহিনীর সাথে আঁতাত করে যেসব হত্যাকান্ড, অপহরণ, মানুষের প্রতিবাদের কন্ঠকে রোধ করেই যাচ্ছেন- তাদের বলবো অাপনারা এখান থেকে ফিরে অাসুন। অাসুন না অামরা সকলে সংগঠিত হয়ে জনগনের স্বার্থে, জনগনের মুক্তির লক্ষ্যে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্বার অান্দোলন গড়ে তুলি।
 
" প্রত্যক্ষে অামরা পরের তরে"
 
সংগ্রামী শুভেচ্ছা
মন্টি চাকমা
সাধারণ সম্পাদক, হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটি
 
(১৮.০৩.২০১৯ এর মেইল বার্তা থেকে)
 
 

  • ২৯৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নারী নিউজ ডেস্ক

নারী নিউজ ডেস্ক

ফেসবুকে আমরা