মোনাজ হক

সম্পাদক আজকের বাংলা ডট কম

মুক্তিযুদ্ধের খেরোখাতা - মুক্তিযোদ্ধার কোটা

অস্ত্র হাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যখন যোগ দেই আমার তখন ২০ বছর বয়স। যুদ্ধ যখন শেষ হলো তখন আবার কলেজে ফিরে গেলাম, বিএসসি'র শেষ বর্ষের যে পরীক্ষাটা ১৯৭১ এর মার্চে হবার কথা ছিলো তা শেষ করলাম ১৯৭২ এর মার্চ/এপ্রিলে। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টাটিস্টিক বিভাগে এমএসসি তে ভর্তি হলাম বটে, কিন্তু পড়াশোনায় আর মন স্থির করতে পারছিলাম না।

৭২/৭৩ সালেও বাংলাদেশ সরকারের কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিলো না মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কিভাবে কর্মসংস্থান করবে। আজকের যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা % সিস্টেমের কথা বলা হচ্ছে তা অনেক পরে সংযোজন করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে যুদ্ধ ফেরত বিপুলসংখ্যক তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের জন্য ১৯৭২ এর শুরুতে “জাতীয় রক্ষীবাহিনী” নামে আর্মড পুলিশ এ্যাক্ট সংশোধন করে এই আধা সামরিক বাহিনীটি গঠিত হয়।

শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধ ফেরত বেকার তরুনদের কর্মসংস্থানের জন্যই মিলিশিয়া ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠিত হয় নি, এর অন্যতম কারণটি ছিলো ৭১ এ পরাজিত পাকিস্তানিরা এবং ৭২ এর শুরুতে সকল ভারতীয় সৈন্য ফিরে যাওয়ার পর স্বাধীন দেশটিতে একটা বাহিনী শূন্যতার সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ শেষে অনেকেই অস্ত্র জমা না দেয়ায় একটা বিপদজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়। জমা না দেয়া বিপুল সংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠীর কাছে থেকে গিয়েছিলো। উদ্ধার করার জন্য অপেক্ষাকৃত ভারী অস্ত্রে সজ্জিত আধাসামরিক মিলিশিয়া বাহিনী দরকার ছিলো। তাই রক্ষীবাহিনী। বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধা রক্ষীবাহিনীতে ঢুকেছে, এক বন্ধু আমাকেও পরামর্শ দিলো, 'গ্রাজুয়েশন যখন করেছিস, আর মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা ট্রেনিং আছে রক্ষীবাহিনীর অফিসার র‍্যাংকে এপ্লাই করে দে, প্রচুর লোক দরকার'।

বাড়িতে বড়ভাইয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে গেলাম, তিনি পুরো যুদ্ধকালীন সময় জেনারেল ওসমানীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ছিলেন এবং যুদ্ধ শেষে জয়দেবপুর বাংলাদেশ ওর্ডিন্যান্স ফাক্টরির ডাইরেক্টর হিসেবে কাজ করছিলেন তখন। আমার পড়াশোনায় মন না বসা আর রক্ষীবাহিনীর কথা শুনে দারুন ক্ষেপে গেলেন। বললেন, দেশে পড়াশোনায় মন না বসলে বিদেশে গিয়ে লেখাপড়া কর, শুনলাম সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক ছেলেমেয়েরা বৃত্তি নিয়ে যাচ্ছে, সেরকম একটা জোগাড় করতে পারিস না? আসলে আমার মনের কথাটাই বড়ভাই বলেছিলেন সেদিন।

সেসময় যদিও আমি ছাত্র ইউনিয়ন আর ন্যাপ কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, ছাত্র ইউনিয়ন এর বগুড়া শহর কমিটির সভাপতি (১৯৭২-৭৩) ছিলাম কিন্তু কখনো নিজের জন্যে সোভিয়েত স্কলারশিপ এর কথা চিন্তাও করি নি। অনেকের জন্য সুপারিশপত্র ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠিয়েছি। ছাত্র হিসেবেও নেহায়েত খারাপ ছিলাম না। বিএসসিতে অঙ্কে লেটেরমার্ক নিয়ে প্রথম শ্রেণি। ভাবলাম সোভিয়েত ইউনিয়ন কেনো, পশ্চিম ইউরোপে যাবো, আবার ইংল্যান্ড ও নয়। শুরু হলো খোঁজাখুজি, সেসময় ইউরোপে আসা এতটা সোজা ছিলো না, পশ্চিম ইউরোপে স্কলারশিপ পাওয়াটাও দারুন টাফ ব্যপার। তবুও প্রায় ৬ মাস চিঠি লেখালেখি করে (তখন কম্পিউটার ইমেইল এর যুগ ছিলোনা) ইউরোপের দু'টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সেপটেন্স লেটার পেলাম, যার একটি বার্লিন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি, কি যে আনন্দ, তা আজও ভুলি নি, সংগে সংগে পাসপোর্ট করতে গেলাম, পাসপোর্ট অধিদপ্তর বল্লো "নো অবজেকশন সার্টিফিকেট" লাগবে শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে। সেসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সরকারি আমলারা এতটা করাপ্টেড ছিলো না, যা এখন হয়েছে। সেসময় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন প্রফেসার ইউসুফ আলি, দিনাজপুরের মানুষ। সোজা তাঁর বাসায় গিয়ে বললাম বিস্তারিত, যুদ্ধ করেছি দেশের জন্যে, আপনারাতো আমাদের কোনো ব্যবস্থা করলেন না নিজের চেষ্টায় ইউরোপে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছি, এখন আপনার "নো অবজেকশন সার্টিফিকেট" দরকার। উনি দরখাস্তে সই করে দিলেন। আমি পাসপোর্ট পেলাম যথারীতি সরকারি ফি জমা দিয়েই একটিও বাড়তি টাকা লাগে নি, সাত দিনের মধ্যেই জার্মান ভিসাও পেয়ে গেলাম।

এরই মাঝে শুরু হয়ে গেছে দেশে দুর্ভিক্ষ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবার শুরু করলো ষড়যন্ত্র, একদিকে ১৯৭৩ সালে অনাবৃষ্টি তারপর হঠাৎ বন্যায় ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য নষ্ট অন্যদিকে বাংলাদেশ ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেশ কিউবায় মাত্র ৪০ লাখ চটের বস্তা রপ্তানী করায় সেবার পিএল ৪৮০ চুক্তির আওতায় যে খাদ্যশস্য পাঠাবার কথা ছিলো যুক্তরাষ্ট্র তা বাতিল করে দেওয়ায় বাংলাদেশে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, আমরা ছাত্ররা আবার সংঘবদ্ধ হলাম, শুরু করলাম রেড ক্রসের সাথে যুক্ত হয়ে ত্রাণ কর্মসুচি। একসময় আর সহ্য করতে পারি নি হাজার হাজার মানুষের মৃত লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে। ভেবেছি এখনি চলে গেলে, হয়তো আমার খাবারটা আর একজন খেয়ে বেঁচে থাকবে। তারপর অনেক ভেবেছি, দু’বছর আগে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, এবার কি ত্রাণ সেবা করে কাটাবো? অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেশছাড়ার, তাই দুর্ভিক্ষের মাত্রা যখন আস্তে আস্তে কমতে শুরু করলো তখন সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে লেখাপড়ার জন্যে জার্মানিতে চলে গেলাম, সেই থেকে ইউরোপের বাসিন্দা। এই হলো সংক্ষিপ্ত এক বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধার কোটা % পাওয়ার ইতিহাস।

আর সেই বাংলাদেশে শুরু হয়েছে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের কোটা পক্ষে-বিপক্ষের আন্দোলন, কার জন্যে? নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নয়, মুক্তিযোদ্ধারা বিলুপ্তির পথে, যে ক'জন বেঁচে আছে তাদের বয়স ৬৫'র বেশি তাদের কোটা % এর দরকার নেই, তারা ইতিহাসের স্বাক্ষী। এখন সেজেছে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবছর মন্ত্রী মোজাম্মেল হক শত শত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার লিস্ট প্রকাশ করে, পরে কি হয় কেউ জানে না, তারাই এখনো সরকারী আমলা হয়ে মিথ্যা বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় ব্যস্ত, আবার এরাই কোটা সংরক্ষণের জন্যে হাতুড়ি নিয়ে ঘোরে। আর একদল চাপাতি নিয়ে মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, শিক্ষকদেরকে হত্যা করে। সরকার বসে বসে তামাশা দেখে। এই বাংলাদেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি, ভাবতে ঘেন্না লাগে।

বাংলাদেশে যে সরকারি চাকুরীর কোটার কথা বলা হচ্ছে তা ১৯৭২/৭৩/৭৪ সালে ছিলো না। এমনকি মুক্তি যোদ্ধাদের জন্যেও সেই রক্ষীবাহিনী ছাড়া আর কোনো জায়গাও ছিলো না। আর রক্ষীবাহিনীর ইতিহাস তো সকলেই জানেন, সে ব্যপারে আর আলাপ না করি।

1279 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।