মুশফিকা লাইজু

নারীবাদী লেখক।

বেশ্যা বৃত্তান্ত

(’বেশ্যা’  শব্দ‌টিকে আ‌মি বিলুপ্ত হ‌তে দি‌তে চাই না, এই  শব্দ‌কে ব্যবহার ক‌রে পুরুষত‌া‌ন্ত্রিক সমা‌জের মু‌খে, নারী নির্যাতক রা‌ষ্ট্রের বু‌কে থুথু ছিটা‌তে চাই।) 

বাংলাদেশের আর দশটা শ্যাওলা পড়া ছ্যাতাপড়া মফস্বল শহরের মতো আমার শহরেও একটি অ‌তি প্রা‌চীন পতিতালয় আছে, য‌দিও তখন আমরা এটাকে বেশ্যাপাড়া ব‌লেই জানতাম। প‌তিতা নামক এই পলিশ শব্দ‌টি আ‌রো বড় হ‌য়ে জে‌নে‌ছি। আ‌রো আ‌রো অ‌নেক প‌রে যৌনকর্মী শব্দ‌টি বলা আয়ত্ব ক‌রে‌ছি।

যাই হোক খুব ছেলেবেলা থেকেই জানি যে, ওখানে বেশ্যা নামের কিছু নারী বসবাস করে। তা‌দের সবাই ঘৃণা ক‌রে, ঘৃণা করা উ‌চিত, ঘৃণাই তা‌দের প্রাপ্য। শহ‌রের পুরা‌ন হাসপাতা‌লের সাম‌নের ঐ সরু রাস্তা‌ দি‌য়ে আ‌মি প্রায়ই যাতায়াত করতাম। কলেজে পড়াকালীন সময়ে ওই পথে অনেক যাতায়াত করেছি। আমার এক বন্ধুর বাড়ি ছিলো ঠিক ওই পতিতালয়ের উল্টো দিকে। আরো কয়েকজন বন্ধুর বাসা ছিলো এই রাস্তাতে। আমি যখন প্রায়শই তাদের বাড়িতে যেতাম।

আমার মনের মধ্যে একটি জিনিস উঁকি মারতো, বেশ্যা আসলে কি? বেশ্যারা আসলে কি করে? য‌দিও প‌রোক্ষ একটা নি‌ষেধ ছিলো যে, ঐ রাস্তায় দি‌য়ে চলা‌ফেরা না করাই ভালো। আমার চোখে তারা ঠিক অন্যদের মতনই। ঠিক যেমন আমার মা-খালা, প্রতিবেশী ‌কিংবা শিক্ষক। মানে আমার দেখা অন্যান্য নারীরা যেমন হয়। আমি ভেবেই পেতাম না। কেনো তবে তারা এতো ঘৃণিত এই সমা‌জে? কেনই বা তাদের জুতো পায় দিতে দেওয়া হয় না। কেনই বা তারা রাস্তা দিয়ে হাঁটলে অন্যরা, অন্য পাশ দিয়ে চলে যায়। তাদেরকে দেখার জন্য এবং তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার প্রচুর কৌতুহল ছিলো। সুযোগও খুঁজেছি। সেই সু‌যোগ পে‌য়েও গেলাম এক‌দিন।

সি‌নেমা দেখার নেশা আমা‌দের যোগসুত্র ঘ‌টি‌য়ে দিলো। ক‌লে‌জে প্রথম ব‌র্ষে পড়ার সম‌য়ে থে‌কে ক‌য়েকজন বেশ্যা‌কে আ‌মি চিনতাম, যেমন- কোহিনূর, পুস্প, রেনু, জো‌লেখা আ‌রো ক‌য়েকজন। এর ম‌ধ্যে কোহিনূর স্বল্পকা‌লীন সম‌য়ে আমা‌দের বাসায় গৃহকর্মী হি‌সে‌বে কর্মরত ছিলো। এতো মসৃন কা‌লো ঝকঝ‌কে সাদা দাঁতস‌মেত সুন্দরী আ‌মি এর আ‌গে দে‌খি‌নি। কালো কোহিনূর না‌মেই সে খ‌দ্দের‌দের কা‌ছে সম‌ধিক প‌রি‌চিত ছিলো। আমা‌দের বাসা থে‌কে চ‌লে যাওয়ার প‌রে বি‌ভিন্ন বাসায় ঘু‌রে ঘু‌রে কল‌সি ভ‌রে খাবার পা‌নি সরবারহ্ কর‌তো। এবং রা‌ত্রি‌বেলায় সে যৌনতা বি‌ক্রি কর‌তো; কিংবা বলা যায়, বি‌ক্রি কর‌তে বাধ্য হতো। বাধ্য এজন্য বল‌ছি, যতদূর ম‌নে প‌ড়ে কোহিনূ‌রের বাবা ছিলো না। ছিলো সৎ মা, ছিলো না আশ্রয়, ছিলো না কোনো স্বজন, ছিলো না বেঁচে থাকার মতো কোনো অ‌র্থের সংকুলান। যেটা ছিলো তা হলো, আকষর্ণীয় শরীর। ‌ছিলো কিছু প্র‌য়োজনও।

ক‌লে‌জে যাওয়ার সময়, এক‌দিন প‌থে তার সা‌থে দেখা হয়ে‌ছিলো। প্রায় সমবয়সী হ‌ওয়া‌তে তার সা‌থে আমার একটু সখ্যতাও ছিলো। দেখলাম তার কপা‌লের ঠিক মধ্যখা‌নে এক‌টি পোড়া ক্ষত, দগদগ কর‌ছে ঠিক টি‌পের মতো। আ‌মি জিজ্ঞাসা করা‌তে বল‌লো, কোনো এক তালুকদার তার কপা‌লে জ্বলন্ত সিগা‌রেট চে‌পে ধ‌রে‌ছিলো। আ‌মি আত‌ঙ্কিত হ‌য়ে জান‌তে চাইলাম, কেনো? সে বল‌লো, ঐ লোক তা‌কে ভাড়া ক‌রে‌ছিলো; তার সা‌থে খারাপ কাজ করার সময় ঐ লোকই তা‌কে সি‌গে‌রে‌টের ছ্যাকা দি‌য়েছে। কোহিনূর ঐ ক্ষত‌তে বোরিক পাউডার লা‌গি‌য়ে‌ছে মাত্র। ‌কিন্তু ক্ষতটা তত‌দি‌নে ঘা‌য়ে প‌রিণত হ‌য়ে‌ছে। আ‌মার কি‌শোরী মন দূঃ‌খে ভারাক্রান্ত হ‌য়ে গেলো। আ‌মি আবা‌রো তা‌কে আমা‌দের বাসায় কাজ কর‌তে বললাম। সে জানা‌লো, এখন আর তা সম্ভব নয়। কারণ সে কো‌র্টে যে‌য়ে বেশ্যাপাড়ায় নাম লি‌খি‌য়ে‌ছে। সে‌দি‌নের সেই কা‌লো কোহিনূ‌রের বিষাদঘন মু‌খোচ্ছবি আর দীর্ঘশ্বাস  আজও আমার স্মৃ‌তি‌কে হত‌বিহ্বল ক‌রে দেয়। সে আ‌রো জানা‌লো, পাড়া থে‌কে তারা সচারাচার বের হয় না। সে‌দিন আমা‌দেরই এলাকায় কিছু খ‌দ্দে‌রের কা‌ছে পাওনা টাকা তুল‌তে এ‌সে‌ছিলো। যা‌দের নাম সে ব‌লে‌ছিলো, তা‌দের প্র‌ত্য‌ককে আ‌মি চি‌নি বা চিনতাম। একই পাড়ায়ই তো থা‌কি। সেই কা‌লো অন্ধকার কোহিনূ‌রের মা‌ধ্য‌ে‌মেই আমার আ‌রো কয়েকজন বেশ্যার সা‌থে আলাপ হ‌য়ে‌ছিলো। বেশীরভাগ সম‌য়ে "লাইটহাউস" সি‌নেমা হ‌লেই আমা‌দের প‌রিচয় হ‌য়ে‌ছে। প‌রিচ‌য়ের সু‌ত্রে আলাপ হ‌য়ে‌ছিলো। আজ আর বল‌তে দ্বিধা নেই, সেই সম্পর্ক‌কে এক ধর‌নের বন্ধুত্বই বলা চ‌লে। আ‌মি সি‌নেমা পাগল, সি‌নেমা দেখা আমার নেশা হ‌য়ে দা‌ড়িঁ‌য়ে‌ছিলো। কোহিনূ‌রেরও হয়‌তো তাই। তাছাড়া ও‌দের বি‌নোদ‌নের আর কোনো পথ‌ তো খোলা ছিলো না। সি‌নেমা হ‌লে মে‌য়ে‌দের জন্য নির্ধারিত বাথরু‌মের সাম‌নেই আড়াআ‌ড়ি বেঞ্চ পে‌তে বেশ্যা‌দের বসার ব্যবস্থা ছিলো। আমি প্রায়ই ঐ বাথরু‌মের সামনে দাঁড়ি‌য়ে কোহিনূর এবং আ‌রো বেশ্যা‌দের সা‌থে দীর্ঘক্ষণ গল্প করতাম। কোহিনূর আমা‌কে তার অন্যান্য বেশ্যা সহকর্মী বান্ধবী‌দের সা‌থে আপা ব‌লে প‌রিচয় ক‌রি‌য়ে দি‌তে গর্ব‌বোধ কর‌তো। তারাও আমার মতো ভদ্রঘ‌রের মে‌য়ের সা‌থে আলাপ ক‌রে আন‌ন্দিত হতো। তা‌দের সক‌লের নাম আজ আর ম‌নে নেই- ভু‌লে গে‌ছি।

তো তা‌দের জীব‌নের নানা গ‌ল্পের সা‌থে সা‌থে, ঐ শহ‌রের কারা কারা ও‌দের খ‌দ্দের, তা‌দের নামও জে‌নে গি‌য়ে‌ছিলাম। আমার শহ‌রের সেই সকল খ‌দ্দের বা প‌তিত ভদ্রমহোদয়গণ প্রায় সক‌লেই আমার প‌রি‌চিত। সামান্য ক‌য়েকজনকে চিনতাম না, ত‌বে তা‌দের নাম জানতাম। জীবনে যেমন অনেক পতিতা দেখেছি। অনেক প‌তিত লম্পট, খদ্দেরও দেখেছি। আমার শহরে দেখেছি। নামকরা, দামী, ধনী খ‌দ্দের অনেককেই চিনতাম। কাকা, মামা, খালু, ভাই বলেই ডাকতাম তা‌দের। আমাদের সমাজে, পরিবারেই তারা মিশে থাকতো; আছে। কিন্তু কখনও তাদের কাউকে ঘৃণা করতে দেখিনি। তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অন্যদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দি‌তে দে‌খে‌ছি। তাদেরকে সমাজে দাওয়াত করা হতো। মসজিদে নামাজ পড়তো। জানাজায় শরিক হতো। এমন‌ কি জনপ্রতিনিধি হি‌সে‌বে নিবূাচন ক‌রে নির্বাচিতও হতো। কাউ‌কে কখনো তাদের ঘৃণা করতে দেখিনি। আজও চলার পথে কর্মক্ষেত্রে কত পতিতের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। কাজের প্রয়োজনে কাজ করি। পাশাপাশি ব‌সি, সমাজ-রা‌ষ্ট্রের উন্নয়নের পরিকল্পনা করি। চা-কফি খাই। সামাজিক সম্পর্ক রাখি। সত্যিকার অর্থে ঘৃণা কি করি? করি না তো! যখন একটি মেয়েকে পতিতা বলে সম্বোধন করা হয়, ঘৃণা করা হয়, তখনো ‌কি প্রতিবাদ করি? ক‌রি না তো! য‌দি তাই হ‌তো ত‌বে প‌রিম‌ণিকে প‌তিতা আখ্যা দেয়ার প্র‌শ্নে কি আপামর জনগণ ক্রোধে ফেঁটে পড়তো না?

একজন চি‌হ্নিত যৌনতা ক্রেতা, নারী‌দেহ বি‌ক্রির দালাল, উচ্চবিত্ত খ‌দ্দের, কত অনায়া‌সেই যে কোনো নারী‌কে প‌তিতা বা বেশ্যা ব‌লে আখ্যা‌য়িত ক‌রে!

আ‌মি ভে‌বে পাই না এটা কি পুরুষতা‌ন্ত্রিক সমা‌জের আষ্ফালন না‌কি আতর-গোলাপমাখা সভ্যতার অসভ্য অন্ধকার!

1006 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।