মুসলিম বিবাহে মোহরানা

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ৫, ২০১৯ ৩:১১ AM | বিভাগ : আলোচিত


(১) 
একটা আইনগত প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিই। কোনো জটিল ব্যাখ্যাও আসলে নয়, কেবল আইনটিই বর্ণনা করে দিচ্ছি। দেনমোহর বা ইংরেজিতে আমরা যেটাকে ডাওয়ার (Dower) বলি এইটা কি এবং বিবাহের একটি পক্ষ যদি দেনমোহরের টাকা পরিশোধের আগেই মৃত্যুবরণ করে তাইলে সেটা কিভাবে পরিশোধিত হবে এই সম্পর্কিত আইন। মুসলিম আইনে মোহর বা মেহর বা মোহরানা বলতে যেটা বুঝায় সেটাকে এমনিতে ইংরেজি ডাওয়ার বলি বটে, কিন্তু ইংরেজি ডাওয়ার আর মুসলিম মোহরানার মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। আমি এখানে কেবল মুসলিম আইনের মোহরানার কথাটাই বলি।

মোহরানা বা দেনমোহর বলতে সেই টাকা বা সম্পত্তি বা মূল্যবান জামানতকে বুঝানো হয় যেটা মুসলিম বিবাহে বিবাহের চুক্তির প্রতিদানমূল্য হিসাবে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদান করা হয়। আমাদের এখানে সাধারণত বিবাহের মোহর হিসাবে কেবল নগদ অর্থই দেওয়া হয়, কিন্তু কেউ চাইলে সেটা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পত্তিতেও দিতে পারে। যেমন ধরেন কেউ যদি চায় তাইলে দেনমোহরের অঙ্ক চৌত্রিশ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করতে পারে, আবার কেউ ইচ্ছা করলে চৌত্রিশ লক্ষ টাকার পরিবর্তে ধরেন পঞ্চাশ তোলা ২৪ ক্যারেট স্বর্ণও দিতে পারে বা কেউ এক টুকরো জমি বা সেইরকম যে কোনো কিছু দিতে পারে।

মোহরানার টাকাটার মালিকানা স্ত্রীর এবং একান্তভাবেই স্ত্রীর। এই টাকা স্ত্রী যেভাবে ইচ্ছা খরচ করতে পারে, ইচ্ছা করে বিনিয়োগ করতে পারে, বা ডান করতে পারে বা যা ইচ্ছা রাই করতে পারে। এই টাকাটা স্ত্রী কিভাবে ব্যবহার করবে সেটা নিয়ে কিছু বলার অধিকার কারোই নেই- স্বামীর তো নেইই, স্বামীর পরিবার বা স্ত্রীর পরিবার বা তার পিতা মাতা কারোই কিচ্ছু বলার নাই

(২) 
এই যে মোহরানার টাকাটা, এইটা বিবাহ চুক্তির সাথে সাথেই দিতে হয়- আইনত দুই পক্ষ কবুল বলার সাথে সাথেই টাকাটা স্ত্রীর পাওনা হয়ে যায়। স্বামী যতক্ষণ পর্যন্ত টাকাটা না দিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্যে বিবাহের চুক্তিটি বলবতযোগ্য হয় না। তার মানে স্বামী যখন বাসর ঘরে ঢুকবে, স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে চাইবে তখনও যদি দেনমোহরের পুরো টাকাটা পরিশোধ করা না হয়ে থাকে তাইলে সে স্বামী হিসাবে আইনত তার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে না। এজন্যে আমাদের এখানে ইসলামী আইনের প্র্যাকটিস হচ্ছে যে বিবাহের রাতে স্বামী স্ত্রীর কাছে দেনমোহরের টাকাটা পরে দেওয়ার জন্যে সময় চেয়ে নেয়।

এই যে স্বামীটি দেনমোহরের টাকাটা পরে পরিশোধের জন্যে সময় নিয়ে নিচ্ছে, এতে কি হয়? এতে করে একটা ঋণ সৃষ্টি হয় -স্ত্রীর অনুকূলে স্বামীর ঋণ। মনে করেন দেনমোহরের টাকার পরিমাণ যদি হয় ৩৪ লক্ষ টাকা, তাইলে স্বামীর কাছে স্ত্রীর এই টাকাটা পাওনা হয়ে গেলো এবং এই পাওনা কখনো তামাদি হবে না বা অন্য কোনোভাবে বাতিলও হবে না। স্বামীকে এইটা পরিশোধ করতে হবেই হবে।

এখন ধরেন স্বামীটি মোহরানার টাকা পরিশোধ না করেই মৃত্যুবরন করলো। তখন কি হবে? ইসলামী আইনের বিধান হচ্ছে মৃত ব্যাক্তির ঋণ আগে পরিশোধ করতে হবে তারপর তার সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে। ঋণের মধ্যে সকলের আগে আসবে স্ত্রীর মোহরানার টাকা। ঐ যে ৩৪ লক্ষ টাকার উদাহরণ দিলাম, স্বামীটি যদি ৩৪ লক্ষ টাকাটা পরিশোধ না করেই মরে যায়, তাইলে স্বামীটির সম্পত্তির মধ্যে ৩৪ লক্ষ টাকা অথবা ঐ টাকা নগদে না পাওয়া গেলে তার জমিজমা বা অন্যান্য সম্পদ যাই থাকে সেখান থেকে আগে সেই ৩৪ লক্ষ টাকা আদায় করা হবে তারপর উত্তরাধিকার বা অন্য হিসাব।

(৩) 
মৃত ব্যক্তির ঋণের টাকা দাফনের আগে শোধ করা দরকার। এইজন্যে দেখবেন যে মুসলিমদের মৃত্যুর পর জানাজার সময় বা অন্য যে কোনো সুবিধাজনক সময়ে মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার করা হয় এবং/ অথবা মাফ করে দিতে বলা হয়। স্ত্রীর কাছেও এই দেনমোহরের টাকাটা মাফ চেয়ে নিতে পারে কেউ, স্ত্রী যদি মাফ করে দেয় তো ভাল কথা, না হলে ঋণটা পরিশোধযোগ্যই থেকে যায়। সেটা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে আদায় করা হবে।

একটা সাধারণ ভ্রান্তি আমাদের অনেকের মনে কাজ করে, যে দেনমোহরের টাকাটা সম্ভবত কেবল ডিভোর্স বা বিবাহ বিচ্ছেদের সময়ই দিতে হয়। এইটা ভুল ধারনা। তালাক বা ডিভোর্সের সাথে দেনমোহরের টাকার সেই অর্থে কোনো সম্পর্ক নাই। স্বামী তার স্ত্রীকে ডিভোর্স করলেও দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে, ডিভোর্স না করলেও পরিশোধ করতে হবে। স্ত্রী যদি চূড়ান্ত শিথিল চরিত্রের নারী হয়, তার যদি তেত্রিশটা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক থাকে অথবা তিনি যদি চৌত্রিশজন পরপুরুষের সাথেও প্রেম করেন তবুও দেনমোহরের টাকা দিতে হবে।

আইনটা ভালো কি মন্দ সেটা নিয়ে এখানে আমি কিছু বলছি না। এইটা আমাদের দেশের মুসলিম পারিবারিক আইনের অংশ, এখনো এটা আছে আর যতদিন না এটা পার্লামেন্ট আইন করে পাল্টাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত এইটাই আমাদের দেশের মুসলমানদের জন্যে বলবতযোগ্য আইন।

(৪) 
ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখি। এটা একটা সামজিক কনটেক্সটে সাধারণ আইনগত আলোচনা এবং এখানে দেওয়া আইনের ব্যাখ্যা সাধারণভাবে সঠিক বটে। তবে কোনো ব্যক্তির বা কোনো বিশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে এই আইনের ব্যাখ্যা ঠিক কিভাবে কতোটুকু প্রয়োগ হবে বা আদৌ হবে কিনা সেটা সেই ঘটনাবলী না জেনে বলা সম্ভব না। আপনি যদি এই আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো সমস্যায় আইনগত পরামর্শ চান, তাইলে কোনো উকিল সাহেবের কাছে পেশাগত পরামর্শ নিয়ে নিবেন।


  • ৩৫২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ইমতিয়াজ মাহমুদ

এডভোকেট, মানবাধিকারকর্মী

ফেসবুকে আমরা