নারীবাদীদের প্রতি এক সাইকোপ্যাথ পুরুষের চরম ঘৃণা

শুক্রবার, ডিসেম্বর ৭, ২০১৮ ১২:৪৬ PM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


ডিসেম্বর ৬, ১৯৮৯
মন্ট্রিয়ল, ক্যানাডা।

বিকেল চারটার পরে ইকোল পলিটেকনিকে পোঁছালো মার্ক লেপিন। পঁচিশ বছর বয়সী এক যুবক সে। তার হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। ইকোল পলিটেকনিক এটা ইউনিভার্সিটি অব মন্টিয়লের ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের অধীন। দোতলায় রেজিস্ট্রারের অফিসে নিঃশব্দে বসে থাকে সে। অফিসের একজন কর্মচারী যখন তাকে জিজ্ঞেস করে কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারে, মার্ক লেপিন কোনো কথা না বলে অফিস থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। সেখান থেকে বের হয়ে বিল্ডিং এর অন্য প্রান্তের দিকে চলে যায় সে ধীর পায়ে। ওই পাশে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর একটা ক্লাস হবার কথা ছিলো। সেই ক্লাস রুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে মার্ক লেপিন।

প্রায় ষাট জনের মতো ছাত্র-ছাত্রী ছিলো ক্লাসে। এদের উদ্দেশ্যে একটা সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেয় সে। সেই ভাষণ ছিলো নারীবাদীদের বিপক্ষে। ছাত্র-ছাত্রীদের কেউ কেউ আধো কৌতূহলে তার কথা শোনে। কেউ তাকে উপেক্ষা করে যায়। এই পর্যায়ে গিয়ে মার্ক লেপিন সবাইকে সব কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। ছেলেদের এবং মেয়েদের আলাদা হয়ে রুমের দুইপাশে দাঁড়াতে বলে সে। পাগলের প্রলাপ ভেবে কেউ গা করে নি তখনো।

হাতে রাখা প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে ছোট আকারের একটা রাইফেল এবং হান্টিং নাইফ বের করে মার্ক লেপিন। সে যে মশকরা করছে না সেটা বোঝানোর জন্য ছাদের দিকে প্রথম গুলি ছোড়ে সে। দুই সপ্তাহ আগে এক দোকান থেকে শিকারে যাবে এই ব্যাখ্যা শুনিয়ে রাইফেলটা আর ছুরিটা কিনেছে সে। তাকে রাইফেল বের করে গুলি করতে দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে ছাত্র-ছাত্রীরা। নিমেষের মধ্যে হাসি খুশি একটা ক্লাসরুম ভরে যায় ভয়ার্ত আর্তনাদে।

ষাট জনের মধ্যে মেয়ে ছিলো মাত্র নয়জন। লেপিন এদের আলাদা করে ফেলে।

“কী কারণে আমি এখানে এসেছি, জানো তোমরা?”

“না।” ভয়ার্ত গলায় একজন বলে।

“আমি নারীবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।”

“দেখো, আমরা মেয়ে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি। কিন্তু, এর মানে এই না আমরা নারীবাদী। রাস্তায় গিয়ে মিছিল করে পুরুষদের বিরুদ্ধে শ্লোগান ধরবো।” নাটালি নামের একটা মেয়ে বলে।

“তোমরা সবাই নারী। তোমরা ইঞ্জিনিয়ার হবা। তোমরা সবাই নারীবাদী। আমি নারীবাদীদের ঘৃণা করি।” এই কথা বলে প্রবল ঘৃণায় মার্ক লেপিন নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে মেয়েদের উদ্দেশ্যে। নয়জন মেয়ের মধ্যে ছয়জনই সাথে সাথে মারা যায়। বাকি তিনজন গুরুতরভাবে আহত হয়। এদের মধ্যে নাটালি একজন।

মার্কের নৃশংসতা তখনও শেষ হয় নি। এই রুম থেকে আরেক রুমে যায় সে। সেখানেও আরেকজন ছাত্রীকে গুলি করে হত্যা করে সে। রুম থেকে রুমে গিয়ে গিয়ে মেয়েদের খুন করার মিশন চলতে থাকে লেপিনের। বিভিন্ন রুমের দরজা আটকে দিয়েও ভিতরে লুকিয়ে থাকা মেয়েরা রক্ষা পায় নি। দরজায় লাগানো কাঁচের ভিতর দিয়ে গুলি করেও সে হত্যা করে মেয়েদের। চৌদ্দজন মেয়েকে খুন করার পরে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করে সে।

লেপিনের জ্যাকেটের ভিতর পকেটে একটা সুইসাইড নোট ছিলো। এই চিঠিটা পুলিশ প্রকাশ করে নি। কিন্তু নানাভাবে এর বিষয়বস্তু বের হয়ে এসেছে পত্রিকায়। এই চিঠিতে কুইবেকের ঊনিশজন নারীবাদীর তালিকা ছিলো। এদেরকে হত্যা করার বাসনা ব্যক্ত করেছিলো লেপিন তার সুইসাইড নোটে।

এই সুইসাইড নোট এবং লেপিনের বেছে বেছে মেয়েদের হত্যা করা থেকে পরিষ্কার যে এই হত্যাকাণ্ড লিঙ্গভিত্তিক ছিলো। চৌদ্দজন মেয়ে সেদিন লেপিনের হাতে মারা গিয়েছিলো শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে। অপার সম্ভাবনাময় একগুচ্ছ কলি পুষ্প হয়ে ফোটার আগেই অকালে ঝরে গিয়েছিলো এক সাইকোপ্যাথ পুরুষের চরম ঘৃণার তোড়ে।

ক্যানাডাতে এই দিনটাকে ন্যাশনাল ডে অব রিমেমব্রান্স এন্ড একশন অন ভায়োলেন্স এগেইন্সট উইমেন নামে পালন করা হয়।

পৃথিবীর কোনো প্রান্তে, কোনো দেশে, কোনো পরিবারে কিংবা কোনো খানেই শুধুমাত্র নারী লিঙ্গ নিয়ে জন্ম নেবার অপরাধে কোনো মানুষ যেনো কখনো আক্রান্ত না হয়, সেই কামনা রইলো।


  • ৩৩২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ফরিদ আহমেদ

লেখক, অনুবাদক, দেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দীর্ঘ সময় মুক্তমনা ব্লগের মডারেশনের সাথে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের অনুবাদ করেছেন। বর্তমানে ক্যানাডা রেভেন্যু এজেন্সিতে কর্মরত অবস্থায় আছেন। টরন্টোতে বসবাস করেন।

ফেসবুকে আমরা