নারীবাদ কোনো থিম পার্টি না

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৯, ২০১৮ ৮:০০ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


আমাদের দেশের মানুষ মানসিক ভাবে সামন্তবাদী, এবং তারা দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত, একদল শোষক এবং একদল শোষিত। এখন এটা দুই’শ বছরের বৃটিশ শাসন বলেন, কিংবা তারও হাজার বছর আগে থেকে চলে আসা বিভিন্ন সময়ের রাজা বাদশাহ, সুলতানী, মোঘল, জমিদারি এইসবের আমল বলেন, বাঙালির জ্বিনের ভিতরে সামন্তবাদ, শোষিত হওয়া, মর্যাদাহীন ভাবে বেঁচে থাকা, কিলা মেরে বসে আছে। (যেটা দেয়ালে পিঠ ঠ্যাকলেই পরে বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো সুরে পরিবর্তিত হয়) তাই যারা উচ্চাসনে, সিংহাসনে থাকেন, তিনি “সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে” এটা বললে, তাদের মজা লাগে, তারা হাসে, তালি দেয় এবং বলেন ঠিক ঠিক, ইহা ঠিক। বাঙালির প্রিয় চামচামীবাদ, তৈলমর্দনবাদ, এগুলো কে দূর করতে কেউ কথা বলুক কিংবা নাই বলুক, বাঙালির চলমান এলার্জি “নারীবাদ” নিয়ে গালিগালাজ করতে এবং ছ্যাঃ ছ্যাঃ করতে বাঙালি সমাজ এগিয়ে। তাদের কথা একটাই “নারীবাদীদের এতো চুলকায় ক্যান”?

নারীবাদীদের এতো চুলকায় কেনো এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে, আমাদের জানতে হবে নারীবাদ কি। নারীবাদ মানে পুরুষ বিদ্বেষ না, কিংবা পুরুষ বিরোধিতা না। নারীবাদ মানে নারী এবং পুরুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, এবং রাষ্ট্রীয়ক্ষেত্রে সমান অধিকার , সমান স্বীকৃতি এবং সমান মর্যাদা পাওয়ার লক্ষ্য।

এখন নারী পুরুষকে সমান করা মানে যারা বোঝেন, নারী পুরুষ একই রকম ভাবে খালি গায়ে ঘুরবে, কিংবা দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করবে, কিংবা নারী তখনই সমান হয় যখন সে বিড়ি খায়, মদ খায়, গাঁজা খায়, একাধিক পুরুষের সাথে শোয়, কিংবা প্যান্ট শার্ট পরে, এবং নারীবাদী তাদেরকেই বলে, যারা হাতা কাটা ব্লাউজের সাথে তাঁতের শাড়ি পরে কপালে বড় লাল টিপ লাগিয়ে থ্যাবড়া করে কাজল দেয়, তারা এই লেখা পড়বেন না। তারা ইউটিউবে যান, ওখানে নানান কনভোকেশনের ভাষণ আছে গিয়ে দেখেন, আর হাসেন। আপনি আপনার জায়গা অনুযায়ী থাকবেন, মেরে আঙ্গিনায়, তুমহারা ক্যায়া কাম হ্যাঁয়? নারীবাদের কোনো ড্রেস কোড নাই, নারীবাদ কোনো থিম পার্টি না।

যাই হোক। এখন আসি নারীবাদীদের এতো চুলকায় ক্যান এই প্রসঙ্গে। নারীবাদ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার তথা জেন্ডার বৈষম্যের পতন চায়। প্রাকৃতিক ভাবে নারী এবং পুরুষ হওয়ার জন্য সমাজ যখন আপনাকে নানান কর্মকান্ডে বিভক্ত করে দিয়ে বলে এই এই বৈশিষ্ট্য থাকলে আপনি পুরুষ এবং এই এই বৈশিষ্ট্য থাকলে আপনি নারী অর্থাৎ সমাজ আপনার কাজ, পোশাক, অবস্থান, অধিকার, মর্যাদা নির্ধারণ করে দেয় তখন সেই সামাজিক পার্থক্য কে জেন্ডার বলে। 

যেমন ছোট থেকে আপনাকে শেখানো হয় এই গোলাপি রঙ নারীর জন্য, সাজগোজ নারীর জন্য, রান্না করা নারীর কাজ, বাচ্চা পালা নারীর কাজ, সংসারের দেখভাল করা নারীর কাজ। আর সংসার চালানো, বউ পালা, গম্ভীর মুখে থাকা, স্ত্রী সন্তান কে শারিরীক মানসিক অত্যাচার করা এবং সকল বিনোদন, ফূর্তি, এইসব পুরুষের কাজ। এই যে নারী এবং পুরুষ হওয়ার জন্য সমাজ নির্ধারিত সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সামাজিক পার্থক্য এই, একেই বলে জেন্ডার বৈষম্য। এর বিরুদ্ধেই যে আওয়াজ এবং আন্দোলন যোগ করা হয়, তাই নারীবাদ।

যে সমাজ ব্যাবস্থায় নারী হওয়ার জন্য, যে মানুষটিকে পুরুষের পরে, কিংবা পুরুষের অধীনস্ত ধরা হয়, নারী হওয়ার জন্য যে মানুষ কে শারিরীক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় , নারী হওয়ার জন্য তার ব্যাক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত কে অপমান করা হয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে হয় তাকে বঞ্চনার শিকার হতে হয়, নইলে তার অধিকার কে ভিক্ষা দেয়ার মতো করে কিছু সুবিধা আকারে পেশ করা হয়, সেই সমাজে নারীবাদীদের চুলকানি বেশী হয়। সেই সমাজে যদি তাদের চুলকানি না জাগে তবে ধরে নিতে হবে, তাদের আদর্শে মরিচা ধরে গেছে। 

নারী, এবং তাদের রূপ, তাদের দেহ সৌষ্ঠব, তাদের আচার আচরণ, তাদের চলন বলন, জীবন-যাপন, তথা নারীর সকল কিছুকেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থা মনে করে এর মালিক এবং একচ্ছত্র অধিপতি হচ্ছে পুরুষরা। এবং তাই নারী কে তুচ্ছ করে, খাটো করে, তার ব্যক্তিগত সব কিছু নিয়ে ঠাট্টা করাটা তাদের কাছে ব্যাপার না। এই সমাজের কাছে ব্যাপার না। আর তাই এই নিয়ে প্রতিবাদ করলেও তাদের মনে হয়, নারীবাদীদের এত চুলকায় ক্যান?

মর্যাদা না পাওয়া এবং মর্যাদা দিতে না জানা বাঙালি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ জানে না কিসে তার অপমান আর কিসে তার সম্মান, কিংবা কিসে তার সমাবর্তন।


  • ৩৫৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা