নারীনিগ্রহ ও নোবেল

রবিবার, অক্টোবর ৭, ২০১৮ ৬:০৩ PM | বিভাগ : আলোচিত


তোলপাড় চলছে এ প্রান্তে ও প্রান্তে।কাভানা কিস্‌সায় টালমাটাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ট্রাম্প। তারই মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদপ্রার্থী ব্রেট ক্যাভানার বিরুদ্ধে উঠেছে নারী যৌননিগ্রহের অভিযোগ।মার্কিন সেনেটের ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য পাশে দাঁড়িয়েছেন কাভানার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন যে শিক্ষিকা অভিযোগকারিণী ক্যালিফোর্নিয়ার সেই ক্রিস্টিন ব্লেসি ফোর্ডের। তিনি সেনেটের বিচারবিভাগীয় কমিটির মুখোমুখি হয়ে ফাঁস করে দিয়েছেন কাভানার অতীত কুকীর্তির।  সংবাদপত্রে অবশ্য খবর বেরিয়েছে, হোয়াইট হাউজের কারসাজিতে সম্ভাব্য সব সাক্ষীর কথা না শুনেই মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এফবিআই) যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে সেই প্রতিবেদনে কাভানাগের অপরাধ প্রমাণিত হয় নি। ফলে, পার পেয়ে যাচ্ছেন কাভানাগ।

ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি আমলে না নিয়ে ট্রাম্প কাভানাগকেই বিচারপতি নিয়োগ দিচ্ছেন।

নারীনিগ্রহের দুই হোতা ট্রাম্প আর কাভানাগ শেয়ানে শেয়ানে যেভাবে গাঁটছড়া বেঁধে এগিয়ে চলেছেন সেখানে আমরা যারা নারীনিগ্রহের বিরুদ্ধে মনখারাপ হবারই কথা। কিন্তু এর মাঝেই সুবাতাস কিছুটা হলেও বইয়ে দিয়েছে নোবেল পুরস্কার কমিটি শান্তিতে দু’জন নারীবান্ধব মানুষকে পুরস্কৃত করে। এ প্রসঙ্গে যাবার আগে আরেকটা কথা বলে নিই। প্রসঙ্গটা শরীরকেন্দ্রিক রাজনীতির। হ্যাঁ, শরীরেরও একটা রাজনীতি আছে। কীভাবে? তাহলে এ প্রসঙ্গে যৎকিঞ্চিত আলোকপাত করি।        

প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোই একবার বলেছিলেন- নারী হোক কিংবা পুরুষ- শরীরই সর্বস্ব। মানুষের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় মানুষকে। নারীর বেলায় কথাটা যে কতটা নির্মম হয়ে ওঠে, নারীধর্ষণের ইতিহাস লক্ষ্য করলেই সেটা বিলক্ষণ বোঝা যায়। নারীর যৌনতাকে আঘাত করো তাহলেই পদানত হবে সে, পদানত হবে যে জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি সেই জাতি বা জাতিগোষ্ঠী। যুদ্ধের সময় নারী ও শিশুরাই থাকে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। এখনও, মানবাধিকার নিয়ে আমরা যখন সোচ্চার, তখনও ঠিক এমনটাই ঘটে চলেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, নানা দেশে। কাভানাগের কেলেঙ্কারিটা তাই শুধু মার্কিনীদের নয়, সারা বিশ্বের মানুষকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তবু সুবাতাস বহে। আমরা এই পৃথিবীতে কিছুটা হলেও নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকি। এবার সেই মূল প্রসঙ্গে যাই। 

দুই মহাদেশের দুই অসম বয়সী পুরুষ ও নারী। একজন ৬৩ বছর বয়সি ডেনিস মুগাওয়েগে, অন্যজন ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ২৪ বছরের নাদিয়া মুরাদ। এই দু’জনই এবার পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার।

না, কোনো যুদ্ধটুদ্ধ থামানোর কাজ করেন না তাঁরা। কিন্তু এঁরা যা করছেন সেটা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দু’জনই মানবযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত জর্জরিত নারীদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। ডেনিস পশ্চাৎপদ আফ্রিকার কঙ্গোর শল্য চিকিৎসক। নাদিয়া সাধারণ নারী-সমাজকর্মী। তাঁরা দু’জনই ধর্ষিত নারীদের শারীরিক ও মানসিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। ডেনিস ধর্ষণের পর যে যৌনক্ষত (ফেস্টুলা) হয় তা সারিয়ে তোলেন। এজন্যে তিনি নিজের দেশেই বছরের পর বছর লড়াই করে যাচ্ছেন। প্রায় দুই দশক ধরে এই কাজটি করছেন ডেনিস। কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার চেয়েও জনপ্রিয় তিনি।

ডেনিসের এই লড়াইয়ের শুরু ১৯৯৯ সালে। একবার কঙ্গোর বুকাভুর একটা হাসপাতালে কাজ করছেন। হঠাৎ এক মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো। সমানে কাতরাচ্ছেন তিনি। শুধু বললেন, ‘আমায় ধর্ষণ করা হয়েছে। অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। কিছু একটা করুন।’ ডেনিস পরীক্ষা করে দেখেন, শুধু ধর্ষণ নয়। মহিলার যৌনাঙ্গের ভিতরে গুলি চালিয়েছে কেউ। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে ভেতরটা, উরুর একটা অংশও। সেই শুরু। তার পর গত দুই দশক ধরে ৮৫ হাজারেরও বেশি ধর্ষিতার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করেছেন ডেনিস। নিগৃহীতারা সকলেই কয়েক দশক ধরে চলা কঙ্গোর গৃহযুদ্ধের শিকার। ডেনিস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরটাও পান হাসপাতালে কাজ করতে করতেই। সবে দিনের দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারটায় হাত দিয়েছেন তিনি। খবরে ঘোষিত হলো তাঁর নাম!

ইরাকের ইয়াজিদ বংশোদ্ভুত নারী নাদিয়ার ঘটনাটা একটু অন্য রকমের। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের। চার বছর আগের কথা। উত্তর ইরাকের কোজো গ্রামে হামলা চালিয়েছিলো আইএস। উত্তর ইরাকের অনেক গ্রামের মতো এই গ্রামেও বাস করতেন মূলত ইয়াজ়িদি সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা গ্রামের পুরুষদের মেরে নারী ও শিশুদের বন্দি করে নিয়ে যায়। বালিকা থেকে বয়স্ক মহিলা, সবাইকে বানানো হয় যৌনদাসী।

উনিশ বছর বয়সি নাদিয়াও ছিলেন সেই যৌনদাসীদের দলে। বন্দিদশার প্রথম দিকে এক বার পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ধরা পড়ার পরে শুরু হয় গণধর্ষণ। এক সাক্ষাৎকারে নাদিয়া বলেছেন, ‘‘শুধু ধর্ষণ নয়, সিগারেটের ছেঁকা দেওয়া, যৌনাঙ্গে অস্ত্র ঢুকিয়ে দেওয়া, অত্যাচারের তালিকাটা ছিলো বিশ্রী রকমের লম্বা। অনেকেই সহ্য করতে পারতো না। আমারই গ্রামের একটা মেয়ে তো আত্মহত্যা করলো।’’

তিন মাস পরে ফের পালানোর সুযোগ পান নাদিয়া। আশ্রয় নেন উত্তর ইরাকের দুহোক শরণার্থী শিবিরে। সেখানে থাকাকালে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় বেলজিয়ামের একটা সংবাদপত্রে। সেই থেকে পশ্চিমি দুনিয়া চেনে নাদিয়াকে। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত নির্বাচিত হন তিনি। এর কিছু দিন পরেই চলে আসেন জার্মানিতে। সেখান থেকেই ইয়াজ়িদি মহিলাদের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই দু’জন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর অনেকেই “ওহ্, এর জন্যে আবার নোবেল পুরস্কার” বলে নাক সিটকিয়েছেন। কিন্তু নোবেল কমিটি ঠিকই বলেছে, ‘‘যৌন নিগ্রহকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই দু’জন তার বিরুদ্ধেই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এর থেকে বড় শান্তির বার্তা আর কী-ই বা হতে পারে!’’ ২০১৬ সালে জাতিসংঘে দেয়া এক বক্তৃতায় ডেনিস বলেছিলেন, ‘‘যুদ্ধে রাসায়নিক, জৈবিক ও পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে। আমার দাবি, এবার ধর্ষণকে যুদ্ধের হাতিয়ার করাও নিষিদ্ধ হোক।’’ ডেনিসের সেই আহ্বানেই হয়তো সাড়া ও স্বীকৃতি দিলো নোবেল কমিটি। সেই সঙ্গে এও আবার স্বীকৃতি পেলো যে, ধর্ষণই হচ্ছে সবচেয়ে বড় নারীনিগ্রহ, যার দ্বারা একজন নারীর শারীরিক ও মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। শান্তিতে তাই নোবেল পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি কোনো ভুল করে নি। কুর্নিশ নোবেল কমিটিকে।

পাদটীকা

ছোটগল্পের মতো আমার লেখাটা শেষ করতে গিয়েও শেষ হইলো না।  ক’দিন আগে আমাদের একটা প্রথম ‘প্রধান’ দৈনিক পত্রিকায় একজন আইনের অধ্যাপক একটা কলাম লিখেছেন কাভানাগের নারীনিগ্রহ আর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে। লেখাটা পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ছিলো যিনি লেখাটা লিখেছেন, তার বিরুদ্ধেও তো লিখিতভাবে নারীকেন্দ্রিক নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ করেছিলেন প্রখ্যাত লেখক কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমাদের বড় বড় বোলচালের মধ্যেও তাহলে বোলতা থাকে! শুধু আমজনতা টের পায় না কখন কোথায় কোন উদ্দেশ্যে সে হুল ফোটায়।


  • ৪৯৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মাসুদুজ্জামান

মাসুদুজ্জামান প্রধানত কবি। তবে সমালোচনামূলক প্রবন্ধ ও গবেষণাতেও অনিঃশেষ আগ্রহ তার। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ছোটকাগজে নারীবাদ, সাহিত্যতত্ত্ব, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনার সূত্রে প্রাবন্ধিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। উল্লেখযোগ্য বই : নারী যৌনতা রাজনীতি (২০১৪), পুরুষতন্ত্র ও যৌনরাজনীতি (২০১৮), নির্বাচিত কবিতা (২০১৭), কাফকার প্রেম (২০১৩), জেন্ডার বিশ্বকোষ (দুই খণ্ডে সেলিনা হোসেনের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা)। পেশাগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। মাঝে কয়েক বছর তাইওয়ানের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অনলাইন সাহিত্য-সংস্কৃতির পত্রিকা ‘তীরন্দাজ’-এর সম্পাদক।

ফেসবুকে আমরা