নারীর অধিকারের কথা বলতে থাকতে হবে

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৯ ১২:৪৪ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


প্রতি বছরের সমস্যা। প্রতি বছর স্কুলে ভর্তি করানোর সময়। সারনেম নেই কেনো, বাবার নামের ইনিশিয়াল নেই কেনো, ধর্ম কেনো লেখা যাবে না, গার্জিয়ানের নেমের জায়গায় মায়ের নাম কেনো? পাঁচশো প্রশ্ন। সঙ্গে যোগ হয় ছেলের সহপাঠীদের মায়েদের ব্যাঁকা কথা।

-আমাদের তো বাবা নামও পালটে দেয় শ্বশুরবাড়িতে। ওরকমই নিয়ম।
-ছেলে বাবার নাম না নিলে তো অনাথ বলবে। হামারে তরফ অ্যায়সা নহি হোতা। 
-তোমরা বাঙালিরা খুব লড়াকু হও বাপু। এসব ছোট ছোট জিনিস নিয়ে কে লড়বে?

বড় কী জিনিস নিয়ে লড়ে এরা, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে৷ আজ কী রান্না হবে? কী পোষাক পরবে? ক’দিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকবে? ছেলে কোন বোর্ডে পড়বে? সেগুলোও তো বাড়ির পুরুষরা বা শাশুড়িই ঠিক করেন এদের বাড়িতে। তবে বড় কী নিয়ে লড়ে এরা? বাড়িতে বা বাইরে? জানা নেই আমার। এক শিক্ষিত চাকুরিরতা মহিলা আমায় বলেছেন, শ্বশুরবাড়ির সারনেম না নিলে তাদের "পার্কস" ও নিয়ো না। পার্কস কী জিজ্ঞেস করায় বললেন, তাদের সম্পত্তি ইত্যাদি৷ মেয়েরাও বাপের সম্পত্তিতে সমানাধিকার পায়, সেক্ষেত্রে মেয়ের বাড়ির সম্পত্তি স্বামী ভোগ করলে কি স্বামী নিজের সারনেম পাল্টাবে বলায় মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলেন।

সো অল ইউ গার্লস অ্যান্ড গার্লস, হিয়ার আর সাম ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টস ফর ইউ এগেইন। ঝালিয়ে নেওয়া আর কী!

.

মেয়েদের স্বামীর সারনেম বা ইনিশিয়াল নিতে হবে এমন কোনো আইন নেই দেশে। কোনো ব্যাঙ্ক, ইউআইডি অথরিটি, পোস্ট অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, কেউ কখনো এর জন্য জোর করতে পারেন না। শ্বশুরবাড়ির লোক তো মোটেই না। কেউ নিজের ইচ্ছেয় পাল্টাতে চাইলে অবশ্যই পালটাতে পারেন। মনে রাখবেন, আগের লাইনে "নিজের ইচ্ছে" হলো সবচেয়ে জরুরি শব্দবন্ধ। 

.

সারনেম না বদলানোর সাথে প্রপার্টি ইনহেরিটেন্সের কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যাংক, পিএফ বা এলআইসিতে নমিনেশনেরও না। বারো বছর ধরে আমি এবং আমার হাজব্যান্ড, যে যার নিজের নামে একে অন্যের সব জায়গায় নমি নি। 

.

বাচ্চার বার্থ সার্টিফিকেটে বাচ্চার পদবী দেওয়া জরুরি না। ধর্মও না এবং সেখানে মায়ের নামের জায়গায় তার আসল নাম লেখা যায়। সেখানেও পদবী বদলানোর দরকার নেই৷ 

.

মেটারনিটি লিভ অ্যাভেইল করার জন্য বা সন্তান জন্মের সময় হসপিটালে, কোথাও বাবার নাম বাধ্যতামূলক না। কোনো অফিস বা হাসপাতাল মাকে তা জানানোর জন্য জোর করতে পারে না। 

.

ভারতে গার্জিয়ানশিপ ল, সব ধর্মেই, অত্যন্ত একপেশে। বাচ্চার প্রাইমারি গার্জিয়ান বাবাকেই ধরা হয় মান্ধাতার আমলের এই আইনে। কিন্তু ন্যাচারাল জয়েন্ট গার্জিয়ানশিপ বাবা মা দুজনেরই থাকে। সিঙ্গেল পেরেন্টদের ক্ষেত্রে কোর্ট যা রায় দেবে তাই হবে, কিন্তু সিংগেল পেরেন্ট না হলে বাবার সম্মতি থাকলে মা প্রাইমারি গার্জিয়ান হতেই পারেন। 

.

মেয়েরা বিয়েতে যা উপহার পায়, দু’তরফ থেকেই, তা মেয়ের স্ত্রীধন এবং তাতে একমাত্র তারই অধিকার। তা কোনোমতেই "পার্কস" নয়। আইনত স্ত্রীধনের ওপর কারোর অধিকার নেই, স্বামীরও না। এমনকি তা বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে দেওয়া গয়না বা সম্পত্তি হলেও। 

.

ম্যারিটাল হোমে থাকাও মেয়েদের জন্য পার্কস না। অধিকার। সে শ্বশুরবাড়িতে অতিথি নয়, বহিরাগতও না এবং মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকাকালীন হয় বাইরে নয়তো ঘরে শ্রম দেয়। বসে খায় না। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই তারও সে বাড়িতে সম্পূর্ণ অধিকার আছে। থাকতে দিয়ে কেউ দয়া করেছে এমন তো মোটেই না। 

.

বাচ্চার কোনো ডকুমেন্টে, বাবার নাম বাধ্যতামূলক না। স্কুলে, কলেজে ভর্তির জন্য বাধ্যতামূলক না। কোনো আইডি বানানোর জন্য, ব্যাংকে একাউন্ট খোলার জন্য না। কোথাও, কখনো না। বাবার নাম কোথাও না জানিয়ে একটা সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। 

.

ধর্ম জানানোও বাধ্যতামূলক না। বহু জায়গায় এখনো জোর করে জানানোর জন্য। তাদের বলুন যে আদমশুমারীতে সরকার আইনিভাবে ঘোষণা করেছেন যে, নাগরিকের ধর্ম না জানানোর অধিকার আছে। সব জায়গায় করতে পারবেন কিনা জানি না। কিন্তু বলুন অন্তত। বলতে থাকতে হবে। তাহলে হয়তো একদিন না বলেই ধর্মের জায়গায় "নিল" বা "নান" লিখতে পারবে ছেলেপুলেরা প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে।

বলতে থাকাই একমাত্র উপায়। এদেশে বেশিরভাগ লোকই মেয়েদের মুখ বন্ধ দেখতেই ভালোবাসেন। তাদের কথা ভেবে নিজেরা মুখ বন্ধ করে ফেললে কোনদিনই কথা বলা হবে না। নিজের হকের কথা বলুন। বলতেই থাকুন। হ্যাপি টকিং ব্যাক, ইউ গুড উইমেন!

  


  • ২২৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

দেবশ্রী মিত্র

টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার

ফেসবুকে আমরা