খাতুনে জান্নাত

কবি, প্রাক্তন শিক্ষক ও প্রশিক্ষক।

নারীর স্বাধীনতা প্রশ্নে

নারীর স্বাধীনতা শব্দ দু’টি বিশেষ মাত্রা প্রকাশ করে। নারীর মন ও জীবন কতটুকু স্বাধীন সত্তা বজায় রেখে জীবন পরিচালিত করে তার বহিঃপ্রকাশ মূর্ত করে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে যে নারী পারিবারিকভাবে সমমর্যাদাহীন, সামাজিকভাবে খন্ডিত, রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্বিতীয় শ্রেণিভূক্ত, ধর্মীয়ভাবে মর্যাদাহানিকর অবস্থান বহন করে সে নারী কিভাবে স্বাধীন হয়!

সামাজিকভাবে বা পারিবেশিকভাবে নারীদের দমন পীড়ন চলে অহরহ। বর্তমান কর্মমুখীনতার কালে নারী ঘরে ও বাইরে নিপীড়িত। বাইরে পুরুষ সহকর্মি বা উচ্চপদস্থদের দ্বারা যৌন হয়রানি ও নানা নিপীড়নের শিকার হতে হয় অথবা এসবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যেতে হয় অথবা আপোষকামীতার মাধ্যমে সম্মান হানিকর অবস্থান তৈরি করে নিগৃহীত হয়।

বাইরের কাজ সেরে তাকে সামাল দিতে হয় প্রতিনিয়ত সন্তান পালন ও গৃহস্থালীর কর্মকান্ড। আমাদের পারিবারিক নিয়ম কানুন এখনো সম্পূর্ণভাবে পুরুষ সন্তানটির দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে আছে। ধর্মীয় নিয়মকানুন তো বদলাবার নয়। সেখানে নারীপুরুষের সমানাধিকার বিষয়ে যেমন অসংখ্য বাক্য আছে তেমনই নারীকে সমানাধিকার না দেয়ার পক্ষে বাক্যও কম নেই। পুরুষকে দ্বিতীয় থেকে চতূর্থ বিয়ে করার অনুমতি দান ও মাতাপিতার সম্পত্তিতে মেয়ে সন্তানটির চেয়ে ছেলে সন্তানটির দ্বিগুণ সম্পদ প্রাপ্তির বাক্য ও অবশ্যই পুরুষ নারীর চেয়ে উপরে অবস্থান কথাগুলো তার সাক্ষ্য বহন করে। তদুপরি নারীকে শস্যক্ষেত্র বানানোর মাধ্যমেও তার মূল্যমান অনুমিত হয়।

রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরুষগণের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে বলা আছে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে। কিন্তু অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা বাতিল হবে এ কথা কোথাও বলা নাই। উভয়ের যৌথ সন্তানাদির অভিভাবক আঠার বছর পর্যন্ত পিতার রয়েছে। বাচ্চাদের ভরণ পোষণ না করা পিতা বা মায়ের সাথে তালাকপ্রান্ত পিতারও সন্তানের অভিভাবকত্ব যায় না বা মাতা এসব সন্তানের অভিভাবকত্ব পায় না। মাকে অভিভাবকত্ব নিতে কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয় এবং অভিভাবকের প্রমাণপত্র আদায় করতে হয়। আর কোর্ট কাচারির কাছ থেকে কোনো কাজ আদায় করা কত কঠিন তা যারা ও পথ মাড়িয়েছেন তারা জানেন।

বাদী যদি নারী হয় তার হয়রানি তো বহুমাত্রিক হবেই। মা-বাবার ঘরে কন্যা সন্তানটি উপরি। যেন অন্যের দায়বদ্ধতা কাঁধে। কন্যার সাথে সম্পর্কটা যেন আবেগি। মেয়ে শশুরবাড়ি যাবে বাপের বাড়ির জন্য কাঁদবে। মার কান্নাও তো কম নয়। অথচ কোনোমতে পাশ করে বেরুলে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে দিতে হয়। যদিও বা কাজ করে মা-বাবার কাছে তা উপরি পাওনা বা না পারতে খাওয়া অথবা এটা দান বা গিফ্ট। শশুরবাড়িতে নারী যেহেতু তার পুরনো জীবন ছেড়ে অন্যের সংসারে উপস্থিত হয় তাকেই মানিয়ে নিতে হয় নতুন পরিবেশের সাথে। তাকেই ছাড় দিতে হয় নিজস্ব রুচি বা অভিরুচি সকল। অন্যের মনে আঘাত দিয়ে বা জোর করে অধিকার পালনে আর যাই হোক শান্তি আসে না। নারী স্বাধীন নয়। নারী স্বাধীন নয় জীবনে ও মননে এ অর্থে যে যখন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত নারীদেরও নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলতে পুরুষের মানে পিতার বা স্বামীর সাহায্য নিতে হয়। পুরুষকে এধরনের কোনো সহযোগিতা নিতে হয় না।

সামাজিকভাবে মানুষ মানুষের উপর নির্ভরশীল এ কথা সত্য। স্বামী স্ত্রী ও একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু নারী যখন নিজস্ব পরিচয় গঠন করতে চায় তখন তাকে পিতার স্বামীর পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে হয়। এটা কোনো লিখিত নিয়ম নয়। তবে অলিখিতভাবে এ নিয়ম চলে আসছে। যা নারীদের পরিচয় বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। আমাদের দেশে কৌশলী নারীরা এক্ষেত্রে স্বামীকে ব্যবহার করে। তারা স্বামীর নামের শেষ অংশ বা বংশীয় অংশ নামের সাথে জুড়ে দেয়। পাশ্চাত্যের অনুকরণে সন্তানদের নামের সাথেও পিতার নামের শেষ অংশও জড়ানো থাকে। আমাদের দেশের সনাতন সম্প্রদায় বা মুসলিম ছাড়া অন্যগোত্রের মেয়েদেরও নিজের পরিচয়কে মানে নামটুকুকেও লুপ্ত করে স্বামীর নামের সাথে তা জড়িয়ে নিঃস্ব করে তোলে নিজেকে। এটা একটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। কথা হলো সন্তান যখন পিতার পরিচয়ে পরিচিত যেখানে মাতার পরিচয় গৌণ। এ সহজ অনুধাবনটা আমাদের শিক্ষিত নারীদের ভাবায় না। বড় বড় নারী কবি সাহিত্যিক, শিল্পী, ব্যবসায়ি, সাংবাদিক এমনকি নারীবাদিরাও নারী নামের সাথে পুরুষের নাম জড়িয়ে নিজেদের অধিকার সমুন্নত করে চলছে। সকলকেই নামের সাথে স্বামীর বা পিতার শেষ অংশ জুড়ে দিতে দেখা যায়। এ বিষয়টা নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করে না। বরং যে যত বড় নারী তার যেন পুরুষকে বেশি জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়। পুরুষকে জড়িয়ে ধরুক সমস্যা নাই। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে আর কত! আর যেখানে অস্তিত্বই থাকে না সেখানে অধিকার আসবে কোথা থেকে। ভিতহীন অধিকার পড়ে থাকে ভিতের নিচেই।

পাশ্চাত্যে এ থেকে বিরত থাকতে বিয়ে প্রথায় যায় না অনেক নারীরা। কিন্তু সন্তান ঠিকই পিতার পরিচয়ে পরিচিত হ’য়ে উঠে। কেনোনা সেখানে জন্ম নিবন্ধিকরণ অফিসগুলোতে সেটা থাকে অনেকটা বাধ্যগত নয়তো সন্তানের জন্মগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বন্ধ হ’য়ে যেতে পারে বেনিফিট। তাই তারা অফিস ও অফিসারকে খুশি রাখে। তবে তাদের অবিবাহিত মা’দের ক্ষেত্রে মা যদি না চায় তবে পিতার নাম ব্যবহার না করলেও চলে। কারণ তাদের সিঙ্গেল মাদার রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত।

ব্রিটিশ নারীরা এই সেদিন ১৯১৮ সালে প্রথম ভোটার হবার অনুমতি পেয়েছিলো; কেননা তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণে বড় ভূমিকা রেখেছিলো। তারা এরপর সমানাধিকার ও নানা সংশোধন ও সংগ্রামের মধ্যে আছে। জাপানের মেয়েরা শেষ নাম বা বংশীয় নাম বাদ দেয়ার আইনী লড়াইয়ে হেরে গিয়েছে। তারা এখনো লড়ছে। অথচ প্রতিষ্ঠিত নারীরা চাইলে এ বৈরী পরিবেশে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করে নিতে পারে। যা তাদের একটু একটু করে আগাতে সাহায্য করবে। বিয়ের মাধ্যমে নিজের পরিবার থেকে উচ্ছেদ না হ’য়ে নিজস্ব একটি আলাদা ঘর গড়ে নিতে পারে। যে ঘর থাকবে স্বামী স্ত্রী দু’জনের। মা বাবার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকান্ডে পুরুষ বা ভাইটির সাথে এক হ’য়ে কাজ করতে পারে। আর সেক্ষেত্রে মা বাবাকেও এ সন্তানটিকে পরিবারের মূল অংশের সাথে সম্পৃক্ত করে নিতে হবে। দেখা যায় অনেক মেয়ে মা বাবার জন্য দায়িত্ব পালন করে ঠিকই কিন্তু তার অবস্থান বদলায় না। উদাহরণস্বরূপ ছেলে সন্তানটির জন্য যদি একটি কামরা খালি রাখা হয় মেয়ে সন্তানটির জন্যও একটি কামরা খালি রাখা যে প্রয়োজন তা ভাবে না অনেক মা বাবাই। মেয়ে নাইওরি সে এ বাড়ির অতিথি। স্রেফ আমাদের মানসিকতা এক রাখলে আমরা আমাদের দু’টি সন্তানকে এক করে দেখতে পারি। আর ধীরে ধীরে সন্তানরা মানসিকভাবে শক্ত হয়। আর মানসিকতার পরিবর্তন না করলে অবস্থানেরও পরিবর্তন হয় না। কেনো আমার মেয়ে আর ছেলে সন্তান আমার সম্পত্তি সমানভাবে পাবে না? এটা তো শুধু মা-বাবার ব্যপার। কিন্তু এক্ষেত্রে বহুজন পবিত্র গ্রন্থ খুলে দেখান। কিন্তু গ্রন্থে তো এ লেখা নাই যে, সন্তানদের সমান অংশ দিলে অপরাধ হবে। পিতাকে পুরুষতন্ত্রের প্রতিভু মানতে না পারলে নারীবাদ ফলপ্রসু হবে না। শিশুকাল পিতার আদর আদরে আহ্লাদে পার হলেও আপনি বড় হওয়ার সাথে সাথেই পিতা পুরুষ সমাজের একজন হয়ে দাঁড়ায়। তার নামের শেষাংশ জড়িত করা মানেও তো নারী এক্ষেত্রেও পুরুষও(যেহেতু পুরুষ সন্তানটি পিতার প্রতিনিধি হয়ে থাকে তাই তার এটা বেশি সমস্যা হয় না।) যদিও কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমের অধিকাংশ পুরুষেরা নাম পরিবর্তন করে)

মেয়েদেরকেই বদলাতে হবে মেয়েদের অবস্থান। আর মন ও মনন-চিন্তন করতে হবে একমুখী। আপনি যখন পিতার পরিচয় বহন করবেন তখন মাকে কি মুছে ফেলছেন না। তেমনই আপনার সন্তানও মুছে ফেলবে মাকে। আর এভাবেই মেয়েরা তাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। আর সমাজে, অফিসে আদালতে সর্বত্রই্ হাস্যকর অবস্থায় বিরাজ করে আর হ’য়ে পড়ে অন্যের হাতের ক্রিড়নক। টার্গেট যদি ঠিক না থাকে তবে হাজার জল ঘোলা করেও কোনো লাভ হবে না।

744 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।