বিষাক্ত বাবা

বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২০ ১:১০ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


মানুষ হিসেবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই'র কথা বলতে গিয়ে  প্রথমেই মনে হয়, আপাতদৃষ্টিতে গতো দুইশত বছরে নারীর কিছু কিছু অর্জন হয়েছে ঠিকই, তারপরও পুরুষতন্ত্রের সর্বগ্রাসী ও কর্তৃত্ববাদী সমাজ নারীকে সব সময়ই পেছনে টেনে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; অনবরত সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে!

প্রত্যেক মা দিবসে, বাবা দিবসে হোমপেজ ভরে ওঠে প্রত্যেকের মা-বাবার সাথে সন্তানের ছবিতে। প্রতিটা ছবির একটা কমন বৈশিষ্ট্য- চোখেমুখে পরিতৃপ্তি। বাবা মায়ের অনেক প্রশংসা! সদ্য পেরিয়ে যাওয়া বাবা দিবসেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অনেকেই তাদের বাবা'দের কথা লিখেছেন, ' পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা' ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি ভাবছি অন্য কথা -সব বাবা'ই ভালো বাবা, কিন্তু সব পুরুষই কি ভালো পুরুষ? ভালো বাবা'রা কি ভালো স্বামী? বা ভালো মানুষ? 

পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু খারাপ বাবা নেই! কিন্তু বাস্তবতা হলো আর সব খারাপের মতোই পৃথিবীতে অনেক বিষাক্ত বাবা আছেন যারা বুঝে বা না বুঝে সন্তানের বিকাশে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ান। সন্তানের বেড়ে উঠার সময়টাতে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলেন!

খুব অবাক হচ্ছেন, আসলেই কি এমনটা ভাবছেন? একটু ভাবুন তবেই পরিষ্কার হবে বিষয়টি, সেই উদাহরণে পরে আসছি তার আগে বলে নিই দু-একটি কথা।

যেকোনো পরিবারে খুব সহজেই একজন বাবা'র পক্ষে সম্ভব সন্তানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হওয়া, তার প্রথম ও প্রধান শিক্ষক হয়ে চরিত্রের ভিত্তি তৈরি করা। কারণ একজন সন্তান তার বেড়ে উঠার সময়টাতে পরিবারের অন্য্য সদস্যদের পাশাপাশি বাবার সান্নিধ্য পায় সবচেয়ে বেশি। বাবার নীতি, আদর্শ, আচরণ সন্তানকে প্রভাবিত করে সবচাইতে বেশি। শিশুরা স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে বাবা,র মতো হবে। সেই বাবাকেই যখন নেতিবাচক আচরণ গুলো করতে দেখে পরিবারের সদস্যসের সাথে বিশেষত মায়ের সাথে সেটা তার মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। শিশুটিও এমন আচরণ কর‍তে প্রভাবিত হয় বা সেসব আচরণ তার মননে থেকে যায়। যা তার মানস গঠনে প্রভাব ফেলে। 

সন্তানের জন্য পরিবারই সর্বোৎকৃষ্ট মানসিক আশ্রয়। এখানেই সন্তান তার প্রথম শিক্ষা পায়।  এই শিক্ষা,  বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে যায় সন্তান। অথচ  বাস্তবতা একজন স্বেচ্ছাচারী পুরুষতান্ত্রিক স্বামী যিনি কিনা 'ভালো বাবা' হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের জন্য সত্যিই ভীষণ বিপদ ডেকে আনতে পারেন!


এ প্রসংগে এখানে একটি পরিবারের কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। ইকবাল রহমান(ছদ্মনাম)। বাবা হিসেবে অসাধারণ!  সন্তান অন্তপ্রাণ! সন্তানের কীসে ভালো হবে সারাক্ষণ সেই ভাবনা। কখনও সন্তানের সাথে কটু কথাতো দূরে থাক জোরে শব্দ করেও কথা বলেন না, পাছে সন্তান কষ্ট পায়। এই ভদ্রলোককে দেখা যায় সন্তানের মুসলমানিতে কাঁদতে! সন্তানের সামান্য জ্বর হলেও তিনি অস্থির হয়ে যান! সমাজেও তিনি সদালাপী, সৎ লোক হিসেবে সবার প্রিয়! অথচ ঘরে স্ত্রী'র সাথে তার ব্যবহার সসম্পুর্ন উল্টো! স্ত্রীকে সন্দেহের চোখেতো দেখেনই, সাথে খারাপ ব্যবহার! সারাক্ষণ পেছনে লেগে থাকেন স্ত্রীর দোষ খুঁজে বেড়ান আর করেন কর্কশ ব্যবহার! ছোটখাটো ব্যপারে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেন না! 


আর তার স্ত্রী মানসন্মানের ভয়ে চুপ থাকেন, নীরবে চোখের পানি ফেলেন। সন্তানেরা বড় হচ্ছে, দেখে বাবার আচরণ! সন্তানের দিকে তাকিয়ে চুপকরে থাকেন ভদ্র মহিলা।

তো এই পরিবারটিতে কী শিক্ষা পাচ্ছে ছেলে সন্তান? সে কিন্তু মায়ের সাথে তার বাবার ব্যবহারটিও শিক্ষা হিসেবে নিচ্ছে! বাবা হিসেবে ভদ্রলোক যতোই নম্র স্বভাবের হোক স্বামী হিসেবে তিনি অসফল। 


যেহেতু সন্তানের উঠতি বয়স তারা খারাপটাই শিখবে আগে বা সেটা তারা এপ্লাই না করলেও ছোটবেলায় দেখা মায়ের প্রতি বাবার এই আচরণ তাদের মননে গেঁথে থাকবে যা পরবর্তী জীবনে তাদের জীবন সঙ্গীরর সাথে এপ্লাই করবে।


আরেকটি পরিবারের কথা বলছি, ভদ্রমহিলার স্বামী মারা গেছেন বছর খানেক আগে ; ভদ্রমহিলা শুরুতে ব্যাপারটি আমলে না নিলেও ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠছেন ছেলের ব্যবহারে! ছেলের এমন পরিবর্তন মেনে নিতে পারছেন না। তার ছেলেটি যে এমন ছিলো তা নয়। খুব শান্ত, মিষ্টি স্বভাবেরই ছিলো। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর এই শান্ত ছেলেটিই ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠছে পুরুষতন্ত্রের ধারক বাহক। তার বাক- ব্যবহার, আচরণের মাধ্যমে তা প্রকাশ পাচ্ছে! অনেক সময়ই মায়ের সাথে কর্তৃত্বের স্বরে কথা বলছে বা মেজাজ খারাপ করে ধমকে উঠছেন মায়ের সাথে।

ভদ্রমহিলা হতাশায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন, অথচ তিনি কি আপ্রান চেষ্টা করেই না ছেলেকে বদরাগী স্বামীর আচরণ থেকে সরিয়ে রাখতেন। ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দিতেন যাতে প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে উঠে। অথচ ছেলে এতোদিন তার ভেতরে সুপ্ত পুরুষতান্ত্রিক আচরণ প্রকাশ না পেলেও বাবা' র মৃত্যুর পর স্বমুর্তিতে আবিভূত হয়েছে! বলার অপেক্ষা রাখেনা, বাবার শিক্ষা দেখে দেখে গ্রহণ করেছে সন্তান!

এতো গেলো মাত্র দুটি পরিবারের কথা। সমাজে এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। একজন খারাপ পুরুষ, ভালো বাবা' হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সন্তানের জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে। এইসব বাবা একটুও ভাবেন না, স্রীর প্রতি তার এই ব্যবহার সন্তানের মনেও পুরুষতন্ত্রের বীজ বপন করে দিচ্ছে, ধীরে ধীরে সেই বীজ থেকে জন্ম নিচ্ছে চারা। শাখা,প্রশাখা বিস্তার ঘটিয়ে একদিন জন্ম নিবে বিশাল ' পুরুষতন্ত্র' নামক বিষবৃক্ষের।

একটি সংসারে স্বামী -স্ত্রীর মতের অমিল হতেই পারে। দুইজন মানুষ কক্ষনো সব বিষয়ে এক মত হতে পারে না, আর এই মতের অমিল নিরসনের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আলোচনা। এভাবেই মানুষ পরিপক্ব হয়, যুক্তি পাল্টা যুক্তি আয়ত্ত করে। কিন্তু এই আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে যখন একজন পুরুষ শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক আচরণের বশবর্তী হয়ে স্ত্রীর উপর চাপিয়ে দেয় নিজের মত এবং নানান বস্তুগত বিষয়, স্ত্রীকে সকলের সামনে হেনস্থা করার প্রয়াস চালায় তখন সন্তানের মনেও মায়ের সম্পর্কে অসন্মানের বীজ বপিত হয় যা একসময় মহীরুহ পরিনত হয়, 'ভালো বাবা' রা কি সেই খবর রাখেন?

এই সন্তানই একসময় মায়ের সাথে বা অন্য নারী, নিজ স্ত্রীর সাথে বাবার কাছ থেকে শিক্ষা পাওয়া আচরণ ই করে। সন্মান করতে শিখে না মেয়ে তথা নারীকে।

লেখাটি শেষ করতে চাই আমার শোনা আরেক ' ভালো বাবা' র কাহিনী দিয়ে। এক বাবা খাবার টেবিলে বসে তার ছোট্ট ছেলেটির সামনে শ্বশুর বাড়ির সকলের নিন্দে গাইতেন, সকলকে ছোট করে মজা পেতেন। ছোট্ট ছেলেটি  তখন অতোটা না বুঝলেও বাবার কথায় খুব মজা পেতো। এই শিশুটি এক সময় বড়ো হয়, রোজগার করে। যথারীতি সেও এখন তার মামু কূলের সকলকে অসন্মানের দৃষ্টিতেই দেখে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেই ভাবে! অসহায় মা দুঃখ করেন আর বলেন, " এমন ছেলেই জন্ম দিলাম"।


  • ৪৯৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নাসরীন রহমান

এক্টিভিস্ট ও লেখক