ন্যায় বিচার নিশ্চিত করুন: নারীটির প্রতি সম্মানজনক আচরণ করুন

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৯ ১২:২৫ PM | বিভাগ : আলোচিত


(১) 

চট্টগ্রামে যে ডাক্তারটি মারা গেলো- আত্মহত্যাই বলছে সবাই, আসলেই আত্মহত্যা কিনা সেও তো নিশ্চিত নয় -তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মেয়েটির নাম মিতু। আজ সকালে প্রেস কনফারেন্স করে নাকি পুলিশ জানাবে কেনো গ্রেফতার করা হয়েছে, কি কারণ, কি অভিযোগ ইত্যাদি। এই নারীটি তার স্বামীকে হত্যা করেছে এমন অভিযোগ কেউ করছেন না। মিতু তার স্বামীকে আত্মহত্যার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেছে বা প্ররোচনা দিয়েছে এরকম একটা অভিযোগ সম্ভবত করবে তার বিরুদ্ধে। করুক।

অভিযোগ করলেই তো আর কাউকে অপরাধী বলা যায় না। অভিযোগ করুক, তদন্ত হবে, বিচার হবে, স্বাক্ষী সাবুদ হবে, তারপর।

ডাক্তার সাহেব আত্মহত্যা করেছেন, আত্মহত্যাই ধরে নিই যদি, সে তো মরেই গেছে। আত্মহত্যাকে আমি কোনো কাজের কাজ মনে করি না। সেই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে একজন মানুষ কি অবস্থায় কি কারণে আত্মহত্যা করে সেটা আসলে অন্য কারো পক্ষেই পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব না। এটাও জেনে রাখবেন যে আত্মহত্যা বা নিজের ইচ্ছায় নিজের জীবনের সমাপ্তি ঘটানো একজন মানুষের অধিকার কিনা এটাও ভেবে দেখা দরকার। এর পক্ষে শক্ত যুক্তি আছে।

এই ডাক্তার সাহেবকে তো আর এইসব যুক্তি তর্ক স্পর্শ করবে না আরকি। আমাদের কাছে, বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির নিকটজনদের কাছে এটা তো একটা বিরাট ক্ষতি -জীবনের কি বিপুল অপচয়! যদি কেউ আসলেই ঐ বেচারাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করে তাইলে তারও সাজা হওয়া উচিৎ। আর কে তাকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে বা বাধ্য করতে পারে সেই সন্দেহের তালিকায় তার স্ত্রী তো আছেই- কিন্তু সেই তালিকায় ওর পরিবারের অন্য সদস্যরা বা বন্ধুরাও থাকতে পারে। আমরা বাইরে থেকে জানি না এমন আরও কেউ থাকতে পারে, সেটাও দেখা দরকার।

(২) 

আমি চিন্তিত এই মেয়েটিকে নিয়ে। মিতু। এই বেচারা ইতিমধ্যে যথেষ্ট সামাজিক হেনস্তার শিকার হয়েছে। ওর উপর যে স্টিগমা আরোপ করা হয়েছে সেটা খুবই ভয়াবহ। এটা থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। সারা জীবন তাকে এইটা বহন করে বেড়াতে হবে সম্ভবত। একটা ভিডিও দেখে মনে হলো মেয়েটাকে মারধোরও করা হয়েছে। ভিডিওতে দেখাচ্ছে যে কেউ একজন মেয়েটিকে প্রশ্ন করছে, মেয়েটি পড়ে আছে ফ্লোরে, ভীত সন্ত্রস্ত, মাঝে মাঝেই আঁতকে উঠছে।

এখন মেয়েটিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। নানারকম অভিযোগে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতেই পারে। ভয়ের কথা হচ্ছে যে একজন নারী যখন গ্রেফতার হয়ে হাজতে থাকে তখন তার উপর যে শারীরিক মানসিক পীড়ন চলতে থাকে সেটা ভয়াবহ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটা সকল সহনশীলতা সভ্যতার মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। আপনাদের কি মনে আছে এরশাদ যখন বিদিশার বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেছিলো তখন আমাদের পুলিশ বিদিশার সাথে কিরকম আচরণ করেছিলো?

এইটাই আমার আশঙ্কা। মেয়েটাকে অসম্মান করা হবে কিনা! তাকে নির্যাতন করা হবে কিনা! এই মুহূর্তে সারা দেশের জনমত তো মেয়েটার বিপক্ষে। মানুষের চোখে তো সে এখন পুরা বাংলা সিনেমার ভ্যাম্প। ওকে যদি একটা কনস্টেবল দুইটা গালি দেয় বা একটা লাথি মারে তাতে কেউ কিছু বলবে না। পুলিশরাও সমাজেরই অংশ, ওদের মধ্যেও কিছু কিছু লোক থাকবে যারা এই পাবলিক পারসেপশনটা ধারণ করে আর সেই অনুযায়ী আচরণ করবে। পুলিশের সকলের কাছে তো আর পেশাদারী আচরণ প্রত্যাশা করি না আরকি।

(৩) 
মেয়েটার আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সুহৃদ যারা আছেন তারা নিশ্চয়ই উকিল সাহেবদের কাছে গেছেন, তার জামিন টামিন চাইবেন। আমাদের এখানে পুলিশের একটা কায়দা আছে, সকল মামলায়ই খালি রিমান্ড চায়। এইসব করে হয়তো জামিন ঠেকাতে চাইবে। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের কথা জানি না, পাবলিক পারসেপশনে যে মেয়েটিকে একটি মন্দ নারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাকে জামিন দিতে ওরা দ্বিধা করবেন কিনা কে জানে!

আর আপনারা যারা আছেন বিশাল বিশাল সব ফেসবুক ফিলসফার, আপনারা মেহেরবানী করে একটু বিবেচনা করবেন। একজন মৃত ব্যক্তির ফেসবুক স্ট্যাটাসে কিছু লেখা আর কিছু ছবি দেখে একজন নারীকে তুলাধুনা করে ফেলবেন, এটা ঠিক কতদূর পর্যন্ত ন্যায় সেটা ভেবে দেখবেন। ঐসব ফেসবুক পোস্ট আর ছবি ছাড়া আমি আপনি আর তো কিছুই জানি না। এই মৃত্যুটা আদৌ আত্মহত্যা কিনা সেইটাই বা কে নিশ্চিত করেছে?

আর দুইজন নারী পুরুষের নিজেদের সম্পর্কের মধ্যে কি হয় না হয় তার ক্রিয়া প্রক্রিয়া রয়াসন ভূগোল ইতিহাস ইত্যাদি বাইরের কারো পক্ষে জানা কঠিন। একটা দুইটা ফেসবুক পোস্ট দেখে বিচার করতে বসে যাওয়া সত্যিই একটু অবিবেচকের কাজ হয়ে যায়। না, এই ধরনের ঘটনা ঘটলে তো আলাপ আলোচনা জল্পনা কল্পনা লোকজন করবেই। আমরা করিই এটা। আর এইরকম একেকটা ঘটনা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও চলে আসে সামনে অনেক সময়। সুতরাং আলোচনা তো চলতেই থাকবে।

কিন্তু একজন নারী সম্পর্কে কোনো ঢালাও মন্দ কথা চট করে বলে ফেলাটা ঠিক কিনা সেটা একটু ভেবে দেখবেন আরকি।

(৪) 

মিতু নামের এই মেয়েটা, গ্রেফতার যখন হয়েছে মামলাও নিশ্চয়ই হয়েছে। ওর বিচার হবে। অপরাধী প্রমাণিত হলে শাস্তি তো পাবেই। কিন্তু অপরাধী প্রমাণিত হবার আগে যেন তার শাস্তি না হয়। এইটা একটু বলেন আপনারা প্লিজ! অপরাধী সে হতেও পারে, দেখা যাক, কিন্তু বিনা বিচারে যেন ওর শাস্তি না হয়। বিচার হোক, শাস্তি যা হবার বিচার করে নির্ধারণ করা হোক।

কম বয়সী একটা মেয়ে, প্রেম করে বিয়ে করেছে দুই তিন বছর আগে। বিয়ের আগে অন্য কারো সাথে ওর প্রেম ছিলো কি ছিলো না -অনেকেরই একাধিক সম্পর্কের পর গিয়েই বিবাহ সংসার ইত্যাদি হয় -সেগুলি নিয়ে তাকে স্ক্যান্ডালাইজ করা, আজেবাজে গালি দেওয়া এটা তো ঠিক না। বিয়ের পরও ওর অন্য কোনো সম্পর্ক হয়েছে কিনা নাকি সেগুলি নিতান্তই সন্দেহপ্রবণ স্বামী বা রক্ষণশীল শ্বাশুড়ি ওদের কল্পনা সেগুলি তো আমরা জানি না। জানলেও সাধারণ বিচারে এইগুলি তো একটু পার্সোনাল ধরনের ব্যাপার।

এইগুলির জন্যে বেচারাকে যেন হেনস্তার শিকার হতে না হয় সেটা দেখাটাই এখন জরুরি।


  • ৪৬৬৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ইমতিয়াজ মাহমুদ

এডভোকেট, মানবাধিকারকর্মী

ফেসবুকে আমরা