আসুন, বদলাই!

সোমবার, এপ্রিল ৮, ২০১৯ ৬:৪৫ PM | বিভাগ : আলোচিত


আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে খবরের অভাব নেই। বেশীরভাগই কুখবর। আমি এদেশে বসবাসের সুবাদে কুখবর এড়িয়ে উটপাখির জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টায় রত। নইলে ডেইলি রুটিনের এতো এতো দুর্ঘটনা, অপরাধ দূর্নীতির খবর পড়ে কোনো মানুষ সুস্থ্য থাকতে পারে না। আমিও যে মানসিক ভাবে সুস্থ্য আছি তাও বলব না। কারণ, টেলিভিশনে যখন কোনো দুর্ঘটনার নিউজ দেখি তখন মনে আর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। মানুষ তো রোজ ই মরছে, এ আর এমন কী! তাও, যখন মানুষ পোড়ে, নানা রকম প্রতিহিংসায় নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয় আবার অপরাধী ছাড়াও পেয়ে যায় প্রমাণ থাকা সত্যেও, তখন আবার অবাক হই, শিউরে উঠি ঘটনার বীভৎসতায়, শঙ্কিত হই কবে আমার পালা আসতে পারে! বোকা বোকা মনে, সত্যি বলতে এখন, আর বিশ্বাস করি না যে প্রভাবশালী ক্ষমতাবান অপরাধী শাস্তি পেতে পারে। এই দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে চরম অনিয়ম আর দূর্নীতি। প্রতিবাদ করলে জোটে অপমান আর মৃত্যু। বিচারে শাস্তি হলেও তাদের বদলে সাজা খাটে অন্য লোক। আর তার জন্যই রাঘব বোয়ালরা থেকে যায় অধরা। কোথায় কত দূর তাদের ক্ষমতার উৎস? ভাবতে গেলে অবাক লাগে যেখানে, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীও নিরুপায় থাকেন। আমি এখনও ভুলতে পারি না হলি আর্টিজানের নৃশংসতা। সেখানে আমার কোনো পরিচিত ছিলো না কিন্তু সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ড আমার দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন পাল্টে দিয়েছিলো আমূল।

আচ্ছা, সে প্রসঙ্গ থাক। ফেনীতে যে মেয়েটাকে আপনারা পোড়ালেন, সে বাঁচবে না। এজন্য কি কিছু যায় আসে আপনাদের? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আপনারাই পুড়িয়েছেন। রাস্তায়, বাসে, অফিসে যখন কোনো মেয়ে হেনস্থার শিকার হয় তখন কি আপনারাই বলেন না, তোমার সাথেই এমন কেনো হয়? আপনারাই তো সেই লোকজন যারা গলা উঁচু করে প্রতিবাদ করা নারীকে “নির্লজ্জ, বেহায়া” বলেন। প্রেমে প্রতারনার শিকার মেয়েটি যখন প্রতারক পুরুষের মুখোশ উন্মোচন করে তখন তাকে “বেশ্যা, খানকি“ বলা লোকজনও আপনারা। পাবলিক প্লেস বা ট্রান্সপোর্টে মেয়েদের বুক বা নিতম্বে স্থির চাউনি, অভব্য আচরণ দেখেও নিজের সিট জাঁকিয়ে আওয়াজ না তোলা নপুংসক আপনারা। ও… নপুংশক কথার মানে তো আপনাদের কাছে যৌন অক্ষমতা বৈ আর কিছু নয়। এই আপনারাই বাসায় এসে বোন বা স্ত্রীকে রাস্তাঘাটে সামলে সুমলে চলতে বলবেন, কারণ এর বেশী কিছু করার ক্ষমতা আপনাদের নেই। এই আপনাদের মত স্বার্থপর সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কারনে বোরখাবন্দী বাংলাদেশেও ধর্ষণ বাড়ছে মহামারীর মত। আপনার বোন, কন্যাশিশু কেউ আর নিরাপদ নেই। অন্যায় হলেও প্রতিকার চেয়ে সুবিচার পাওয়ার আশা ক্ষীণ। তাই সামর্থ্যবান অনেকেই দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়, আর যারা দেশ ছাড়তে পারে না তারা আতঙ্ক নিয়েই জীবন-যাপন করে।

পঁচাত্তর ভাগ পোড়া শরীর নিয়ে যে মেয়েটা কাতরাচ্ছে, তার দায়িত্ব স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিক বা বিধাতা নিক, কি এসে যায় বলুন তো? সে বেঁচে যে নরকযন্ত্রণা ভোগ করল, তার প্রতিবাদে যে সংগ্রাম করল, যার বিরুদ্ধে দাঁড়াল, আপনি কি হলফ করে বলতে পারবেন সেই একই যন্ত্রণা যৌনহয়রানী করা লোকটার হবে? কয়দিন পর সে নিজের একটা গতি ঠিক করে  ফেলবে।

সবচেয়ে অবাক লাগে, এ ধরনের মানুষ কখনও অনুতপ্ত হয় না। রাস্তাঘাটে এরা নিজেদের যৌনকাতরতা বা উলঙ্গপনা দেখিয়ে আনন্দ পায়।  হোক সে, যত্রতত্র জল বিয়োগে অথবা পছন্দ সই কারো পানে চেয়ে স্বমেহনে। এদের দেখেও তো আমরা না দেখার ভান করি। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, যার অধীনে সব শিক্ষার্থী পিতৃ আশ্রয় খোঁজে, সেই লোক যখন তার প্রৌঢ়ত্বের বিকৃতিতে একটা মেয়ের জীবন দুর্বিষহ করে দেয় তখন তার কী করবেন আপনারা? ফেসবুকে, ইশ…এংরি ইমো আর পত্রিকার পাতায় নিউজ দেখে দু-একটা দীর্ঘশ্বাস  ছাড়া আর তো কিছু পারবেন না। আপনারা পারবেন না, কোন মেয়ের সাথে অন্যায় হলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। তবে মেয়েটিকে উপদেশ দিতে পারবেন। তাতে অবশ্য লাভ হয় না। শিশু, বোরখায় ঢাকা, কথা কম বলা, বোবা, প্রতিবন্ধি, ঘরের ভেতর থাকা, মাদ্রাসায় থাকা সব রকম নিরাপত্তাবলয়ে থাকা মেয়ে চরম অন্যায়ের শিকার হয়েছে এবং আরও হবে। কারণ, আপনাদের চিরাচরিত নিয়ম হচ্ছে নারী অবদমন। পুরুষ ঘুরবে ফিরবে, ভোগ করবে, অন্যায় করবে আবার পুরস্কার ও পাবে। তাই, রাষ্ট্র সমাজ কে দোষ দেওয়ার আগে আপনি নিজে বদলাতে পারবেন কিনা দেখেন।

আপনার ছোট বদল সমাজে অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আপনি আপনার সন্তানকে যে আদর্শেই বড় করুন, সমাজ যাতে নারীবান্ধব হয় সে দায় আপনারও। অসুস্থ চিন্তা চেতনা, শরীর ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পায়ে দলে মেয়েরা এর মধ্যেই এগিয়ে গেছে বহুদূর। এখন তদের লাগাম টানার চিন্তা করা অবাস্তব। আর অবাস্তব আর মান্ধাতার আমলের চিন্তা চেতনা যত আঁকড়ে ধরতে চাইবেন নিজেকে একসময় আস্তাকুরে আবিষ্কার করবেন। তাই অন্ততঃ আপনার ভবিষ্যতের কন্যা শিশুটির কথা ভেবে ওর জন্য একটা সুস্থ্য সমাজ গড়ার লড়াইতে নামুন তো ভাই!


  • ২৭৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নায়না শাহ্‌রীন চৌধুরী

সঙ্গীত আর লেখালেখি’র সাথে দীর্ঘদিন পথ চলা। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী ও গীতিকবি। কাজ করছেন অডিও শিল্প, মঞ্চ ও ফিল্মেও। এ পর্যন্ত তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। জীবিকা নির্বাহে জ্বালানী ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

ফেসবুকে আমরা