প্রিয় আন্টিরা শুনুন, ২৫-এ মেয়েরা বুড়ি নয় বরং পরিপূর্ণ নারী হয়

শনিবার, জুন ১, ২০১৯ ১২:২৬ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


'চাকরি পাওয়ার পর বিয়ে করবো' একথা বললেই প্রতিবেশী আন্টিরা তাদের অন্তদৃষ্টি দিয়ে আমাকে যেভাবে দেখতে পান:
 
বছর তি'নেক পর। আমি ২৪/২৫'র বুড়ি হয়ে গেছি, চামড়া অনেকটা ঢিলে, গালে মেসতার দাগ, হাত-পায়ের পেশি শক্ত হয়ে গেছে, যৌন আবেদন বলতে কিচ্ছু নাই, কাচ্চাবাচ্চাও জন্ম দিতে পারবো কিনা যথেষ্ট সন্দেহ। প্রতিদিন ২/৪ জন ছেলে দেখতে আসে, বয়সী দেখে ফিরে চলে যায়, কিছুতেই বাবা আমার বিয়ে দিতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত আমার বিয়ে আদৌ হবে কিনা, এনিয়ে তাদের প্রচুর টেনশন।
 
 
আচ্ছা, এই মানুষগুলির সুবুদ্ধি কি কোনোদিন হবে না? এরা কি ইমম্যাচিউর, কচি কচি (এমনকি শিশুও), পরাশ্রয়ী, পরনির্ভরশীল, সিরিয়াল খেকো, ময়দাসুন্দরী, বোকা, নির্বোধ, লুতুপুত আর জ্বী হুজুর টাইপ মেয়ের কন্সেপ্ট থেকে বেরিয়ে আত্মনির্ভশীল, মেধাবী, ম্যাচিউর, বুদ্ধিমান, আত্মসচেতন, পারসোনালিটিসম্পন্ন, পরিবার-সমাজ ও দেশের সম্পদ মেয়েদের কথা কোনোদিন চিন্তা করতে পারবে না?
 
আমি জানি, এই একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এদেশের প্রত্যেকটি স্বাবলম্বী হতে চাওয়া মেয়েকে। অনার্সে ১ম বর্ষ পার করার পরপরই চারপাশের মানুষগুলো খুব সূক্ষভাবে বুঝিয়ে দিতে শুরু করে: তোমার বয়স হয়েছে, চেহারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এখন বিয়ে না করলে পরে বিয়ে হবেনা, ভাল পাত্র পাওয়া যাবে না, বাচ্চা হবে না। এসব শুনে মেয়েদের মন খারাপ হয়, হীনমন্যতায় ভোগে, কেউ কেউ হাল ছেড়ে দিয়ে বিয়েও করে নেয়। মানুষ তো!
 
সুখের বিষয় এই যে, এতকিছুর পরেও সবাই দমে যায় না। কেউ কেউ টিকে থাকে। সংগ্রাম করে। জিতে যায়। এভাবেই তো ৪৩% মেয়ে কর্মক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী-সচিব, সাহিত্যিক, মিলিটারি, ম্যাজিস্ট্রেট-কমিশনার, ডাক্তার-ইন্জিনিয়ার, শিক্ষক, জজ, অলিম্পিক, মাল্টিন্যাশনাল, গার্মেন্টস শ্রমিক অথবা গৃহকর্মী কোথায় নেই মেয়রা আজ? লোকে কী বলে তাতে কীইবা এসে যায়!?
 
আমি মনে করি, ২৫শে মেয়েরা মাত্র পরিপূর্ণ হয়। কচি, মোলায়েম, বাচ্চা বাচ্চা চেহারা আর শরীর, ভোলাভালা মন আর অপরিপক্ব চিন্তাভাবনা পেরিয়ে, একটা ম্যাচিউরড চেহারা, স্টাবল শারীরিক গঠন আর একেবারে পরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষে রূপান্তরের বয়স এই ২৫। এইতো বয়স পরিপূর্ণভাবে মেয়ে হওয়ার, সম্পুর্ণ মানুষ হওয়ার।
 
এই বয়সে মেয়েদের আরও থাকবে উচ্চশিক্ষা ও ১টা চাকরি। যা মেয়েদেরকে সঠিকভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবে, নিজে নিজে ডিসিশন নেওয়ার জন্য যোগ্য করে তুলবে, সাবলম্বী করবে নিজেকে, নিজের জীবিকা নিজে অর্জন করার উপযোগী করবে। তবেই না সত্যিকার অর্থে একটি সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে নিজ টাকায় লালন-পালন করে বড় করার শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ্য হবে সেই মেয়েদের! তবেই না সে বিয়ের কোনো অর্থ হবে মেয়েদের জীবনে! হ্যাঁ, মেয়েরা শুধু তখনই বিয়ে করবে। তার আগে নয়।
 
যে স্বজন, যে বন্ধু, যে প্রতিবেশী তোমার বিয়ের বয়সের হিসাব রাখার মহৎ কাজটি করে আসতেছে এতোদিন, বিয়ে দিয়ে তোমাকে কৃতার্থ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, তাদের বলো- তুমি তোমার জীবনসঙ্গীকে গাধাটাইপ কোনো জন্তু ভাবতে পারবে না। একা তাকে দিয়ে সংসারের  ঘানি টানাতে বিবেকে বাধবে তোমার। তার ঘাম-ঝড়ানো পয়সায় বসে খেতে লজ্জা হবে তোমার।
 
ওদের বলে দাও- মাস শেষে সন্তানের হাতে টিউশন ফি বা পিকনিকের চাঁদা দিতে না পারলে বড্ড ছোট হয়ে যাবে তুমি। বছর শেষে নিজের পয়সায় বাবা-মা'কে কিছু উপহার দিতে না পারলে কিংবা চিকিৎসা না করাতে পারলে ব্যর্থতার দায়ে মানসিক মৃত্যু ঘটবে তোমার। সঙ্গীর দু:সময়ে আর্থিক সাপোর্ট দিতে না পারলে মাথা নিচু হয়ে যাবে তোমার। পরনির্ভর জোঁকসদৃশ অর্হথহীন সেই জীবনটার জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে কোনোদিন?
 
কিংবা উল্টোটা যদি ঘটে। যদি কোন কারণে তোমার সংসার ভেঙে যায়? তুমি কি উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করবে? তারা কি তোমার ভরণপোষণ করবে? যদি ১/২/৩ বাচ্চা নিয়ে সংসার ভাঙে, তখন কি হবে? তুমি কি তোমার বাচ্চাদের সেই কুলাঙ্গারের নতুন বউয়ের কাছে ফেলে আসবে? নাকি বাবা'র বাড়ি রেখে শুধুমাত্র জীবিকার আশায় বিয়ে বসবে আবার? কি উপায়ে সন্তানদের মানুষ করবে? ভেবেছো?
 
ওদের বলে দাও যে তুমি জানো কেউ তোমার দায় নিবে না। তোমার বাবা-মাও নিবে না। তারা আবার একটা বিয়ে দিবে তোমার। সেই বিয়ে তুমি চাও না। সেই ধ্বজভঙ্গ সমাধান তুমি চাও না। শুধুমাত্র পেটের দায়ে নতুন সংসার পাততে চাও না তুমি। চিৎকার করে বলে দাও যে- চাও না! তারা বরং এবার নিজের চরকায় তেল দিক।
 
নারী কুড়িতেই বুড়ি- এসব গপ্পের দিন শেষ। মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স 'স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা' হোক।

  • ১০১০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নওরীন পল্লবী

নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা