ওয়ান্স এগেইন আর আমরা

রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ ৪:০০ PM | বিভাগ : ওলো সই


গত দুদিন ধরে শেফালী সাহা আর নিরাজ কবিরের অভিনয় একটা হারানো পুরানো এলিজির সুরের মতো বাজছে বুকের ভেতর। দু’জন পঞ্চাশ এর গোড়ায় দাড়ানো, একজন বিধবা রেস্টুরেন্ট মালিক, দু বাচ্চার মা আর ডিভোর্সী সিনেমা অভিনেতার সামাজিক মিলনহীন চিনচিনে সুরেলা প্রেম বা সঙ্গ-সুখের দৃশ্যকল্প।

সিনেমাটা আমার মানসিক দ্বন্দ্ব বা ক্ষতের জায়গাগুলো তাজা করে দিয়েছে। আমি দু’বছরের সুফিকে নিয়ে একা পথ চলা শুরু করেছিলাম, আজ ৫ বছর ধরে কতশত বার, হাজারবার আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে এ সমাজ, পরিবার আমাকে ব্যর্থ মেয়ে, বড় বোন, স্ত্রী আর মা হিসেবে।

এখন আর ক্লান্ত লাগে না ক্ষোভ হয় না, রাগ ও না কেমন যেনো অ্যাসেক্সুয়ালিটির মতো অ্যাইমোশনালিটি কাজ করে, পথ চলতি রাস্তার লোক থেকে বন্ধু সবাই প্রশ্ন করে এতো স্বার্থপর কেমনে তুমি? বাচ্চাটাকে বঞ্চিত করে কেমনে এতো মজা করো? কেমনে এতো আনন্দে থাকো? আগে তাও বুঝাতে চাইতাম আমি আসলে ইচ্ছে করে থাকি না, আমার কাছে যেটা সবচেয়ে ভালো অপশন মনে হয়েছে তাই করছি শুধু আমার জন্যে না, আমাদের দু’জনেরই জন্যেই।

ডির্ভোসের মতো আপাতদৃষ্টিতে সমাজের চোখে লজ্জাজনক একটি ঘটনা ঘটেই যায় তাও আবার একাধিকবার, ছোটবেলার বন্ধুটা দাওয়াত দেওয়ার সাহস করে লিটনের ফ্ল্যাটে। চোখের জল মুছে দেওয়ার নাম করে ব্রা’র ফিতেতে হাত বোলায় মার বন্ধু মামাটিও। সবাই ভাবে একবার ট্রাই করে দেখি না খালি চেয়ারতো।

নিজের মা’ই বলতো সকাল বিকাল এতো জেদের জন্যে জামাইর ভাত ও খেতে পারি নাই। কাজের জায়গায় কলিগরা বলতো আমার ছুটি লাগবে কেনো আমারতো ফ্যামিলিই নাই। শুভচিন্তকরা আপনার শরীরের একজন লিগাল মালিক খুজে নিয়ে আসবে, আপনি সেই পাত্রদের রিজেক্ট করলে শুনতে হবে, এক বাচ্চার মা হয়ে গেছে তাও দেমাগ যায় না। হা দেমাগিতো, আমিতো জানি আমি কে! ঐ দেমাগ আর জেদিতো সম্বল ছিলো আমার একমাত্র সম্বল, ঠিকে থাকার লড়াই।

গত পাঁচ বছর ধরে প্রত্যেকটা দিন গেছে আমার নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার লড়াই করতে, তার আগের যে সময়ের অপচয়টুকু ছিলো, সমাজের ভয়ে, ছোট বোনের বিয়েতে সমস্যার ভয়ে -আজ সেটাকে বড্ড অপচয় মনে হয়। সময় আর জীবনের অপচয়। এ সময়টাতে আমার দরকার ছিলো মানসিক সাপোর্ট, শেল্টার, তার বদলে পেয়েছিলাম সোশ্যাল শেমিং, পরিবার থেকে ও, মোরাল পুলিশিং, পাশে পেয়েছিলাম হাতে গোনা দু’একজন বন্ধুকে তাদের অনেকেই আমার মতো একি নৌকার মাঝি। প্রতিটা রাত যুদ্ধ করতে হয়েছে, আজো করছি হতাশা, অনিশ্চয়তা, হেরে যাওয়ার ভয় এর সাথে। রোজকার তেল নুন আর মাথার উপর রোজ একই ছাদের ব্যাবস্হা করা, ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়ানো, নিশ্চিত আর্থিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, ইমিগ্রেশন এর স্ট্রেস, দিন শেষে একা বিছানায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া।

একদিন কাজের শেষে স্টাফ রুমে আমি দু’কলিগস যারা ভালো বন্ধুও, বললাম -লাইফ বোরিং, আমার বাসায় আসো একদিন, গ্লাস নাইট আউটিং এ যাবো। এক বাংলাদেশী আপু বললো ওরা মজা করে, ওদেরতো বর আছে। এরকম কত সূক্ষ্ম খোঁচা উপহাস রোজ হজম করি। অথচ ইনি একজনকে বিয়ে করে এদেশে এসেছিলেন, এসে একটা রেডিমেড ঘর আর ঘরের সামনে গাড়ি পেয়েছিলেন। আমার এমন ও দিন গেছে সুটকেস নিয়ে সারারাত ট্রেনে ঘুরেছিলাম থাকার জায়গা ছিলো না বলে। কাজ ও ছিলো না। তবু কি সহজ আমাকে নিয়ে আমার একাকীত্ব নিয়ে উপহাস করা।

আমার যে আত্মীয়রা আমাকে কাঁদিয়েছিলো ছেলেকে ছেড়ে একা থাকতাম বলে, তারা বর নিয়ে এসে বিদেশের এ যান্ত্রিক জীবনে বাচ্চাকে সাথে রাখতে পারে না।

আর কত সহস্র বছর মেয়েদের ঘাড়ে দূর্গা হওয়ার দায় চাপিয়ে তাদের দেবী বানাবে। আমার ছেলের বায়োলজিক্যাল বাবা গত পাঁচ বছরে পাঁচ আনা পয়সাও দেয় নি, তার নতুন সংসারে নতুন সন্তান, তাকে ও কি সমাজ আমার মতো সকাল বিকাল কাঠগড়ায় দাঁড় করায় বলে -পয়সা দিলেই মা হওয়া যায় না। তারও কি আমার মতো ছেলের কাস্টোডি না পাওয়ার ভয়ে মাঝ রাতে ঘুম ভাঙে? তাকে কি প্রমাণ দিতে হয় সতী সাবিএী হওয়ার? তাকে ও কি কেউ জিগ্যেস করে -ছেলেকে দূরে রেখে হাসো কি করে? এতো সুন্দর একটা ছেলে আছে তোমার আর কি চাও? নামাজ পড়ো পর্দা করো, ছেলেকে বুকে নিয়ে ছোট্ট জীবন পার করে দাও।আমি কে? কোনটা আমার জীবন? আমার জীবনে আমার অধিকার কতখানি?

যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম কস্ট হতো রান্না করে খাবার ফ্লোরে রেখে, নিচু হয়ে সে খাবার বেড়ে দিতে। এক্সকে কত বলেছি একটা ডাইনিং টেবিল কিনে দিতে, সমস্ত আসবাব বাবার কিনে দেওয়া ছিলো, ডাইনিং এর টাকাটা এমনকি আমার ডেবিট কার্ড এর শেষ পয়সাটা ও শেষ করেছিলো তার নিজের খরচে। অথচ তারপর প্রথম ঢাকায় পরিবারের অমতে প্রথমে ৬ ফুট বাই ৬ ফুটের হার্ডবোডের পাটিশন দেওয়া মেয়েদের নোংরা স্যাঁতস্যাতে হোস্টেল, তারপর চাকরী খোজা ২/৩ টি বাসা বদলে উত্তরায় থিথু হওয়া, একা মেয়েকে কেউ একটা বাসা ভাড়া দেয় না, ক্যাডেট কলেজে টেকার পর ও ডিস্টার্ব চাইল্ড বলে বাচ্চা ভর্তি নিতে চায় না, বেতনের স্লিপ থাকার পরও ভাড়া দিতে পারবে কিনা সন্দেহ, একা নারী, রোজগেরে নারী, কথা বলতে পারা নারী, নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে পারা নারী, তার স্বাধীন আত্মা, স্তন, যোনী সব কিছু একটা বুদ্ধিপতিবন্ধী সমাজের জন্যে হুমকি, বানানো নিয়মের জন্যে হুমকি।

কত দিক থেকে কত হাত কত নামে গলা টিপে ধরবে তোমার স্বপ্নের। দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের মতো এক এক করে হরণ করেছে আমার সামাজিক জীবন, চরিত্র, স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিশ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুও। সব হারিয়ে, অজস্র গালি আর অসংখ্য ডিক পিক্স এর উপহাস নিয়ে ও আমি ঠিকই বেছে নিয়েছি আমার পচ্ছন্দের নরক, তোমাদের চাপিয়ে দেওয়া স্বর্গের চেয়ে ও আমার নরক উত্তম।

ধর্ম নারীর জন্যে আইন বানিয়ে রেখেছে দ্বিতীয় বিয়ে করলে সন্তানের কেয়ার গিভার হবার অধিকারটুকু ও হারাবে, সন্তানকে নয় মাসে গর্ভে ধারন করো, বুকের দুধ খাওয়াও, সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবাসো তবুও একদিন এ সমাজই শেখাবে আর্দশ মা একা থাকে, নিজের সমস্তটা বিসর্জন দিতে হয়৷ না হয় তো তুমি মাই না। তোমার সন্তানের গার্ডিয়ান কার্ড এ আসবে বাবার নাম, শত সহস্র বছরের পুরুষতন্ত্র আর ধর্মের শক্তিতে স্পামদানকারী সে পুরুষের অনুমতি ছাড়া তুমি তোমার সন্তানকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না, দেশের সীমারেখার বাইরে। ক’টা মায়ের যুদ্ধের কথা জানেন শুধুমাত্র নিজের ভ্রুনের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যে। তবু দিন শেষে বিনোদিনীদের বিয়ে হয় না, শেফালীরা সন্তানের সম্মানের জন্যে আলিঙ্গণ করে নিবিড় বিষন্ন একাকীত্বকে, রোহিনীরা লোভী, সুন্দরী, বিদূষী, হিংসুটে, কুলটা, নৈরাজ্য সৃস্টিকারী তারা ভুলিয়ে নিয়ে যায় ভ্রমরদের স্বামীকে, শেষে গোবিন্দলাল আর মহেন্দ্ররা ফিরে যায় তাদের নীতিপরায়ন বৌদের কাছে, সমস্ত নারীসত্বার মুখে চড় মেরে, যে চড় থেকে রেহায় পায় না আশা বা ভ্রমররাও। রোহিনী, বিনোদিনীদের বড্ড লোভ, পুরুষ মানুষের লোভ, সংসারের লোভ, ভালোবাসার লোভ, জীবনের লোভ।


  • ২১২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শায়লা হক তানজু

প্রবাসী লেখক, এক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা