অপর্ণা হাওলাদার

পোস্টডকটরাল ফেলো, ইউনিভারসিটি অফ রোড আইল্যান্ড, ইউএসএ।

মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু - কিছু আর্থ সামাজিক ব্যাখ্যা

প্রবাদটি অনেক পুরনো, কোথায় শুরু হয়েছে জানা নেই। ইদানীং অনেক জায়গায় দেখি মানুষ ব্যবহার করে - সবচেয়ে বহুল ব্যবহার বোধকরি শাশুড়ি/ ননদের সাথে পুত্রবধূর সম্পর্কের ক্ষেত্রে হয়েছে। অন্যদিকে অনেককে এটাও দেখি বলতে যে "মেয়েরা মেয়েদের শত্রু" এটা পুরুষতান্ত্রিক মিথ্যা কথা, এর অস্তিত্ব নেই।

নারীরা অন্য নারীদের সাফল্যে বেশি ঈর্ষান্বিত হন, পুরুষের সাফল্য তাদের ততটা ঈর্শান্বিত করে না। আবার, নারীরা নারীদের উন্নতিতে বাধা দেন, পুরুষদের দেন না। এই ব্যাপারটা পুরোই একটা সামাজিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বলে আমার ধারণা। পুরুষতন্ত্রই হয়তো মূল সামাজিক কারণ, কিন্তু একে ভাঁওতা বলে এড়িয়ে গেলে আমরা হয়তো নিজেদের ক্ষতি করবো। এই টানাপোড়েনকে সামনে থেকে এর উৎস এবং রূপ বুঝে মোকাবেলা করাই হয়তো একমাত্র প্রতিরোধের উপায়। আমাদের প্রতিদিনের নারীবাদ চর্চার একটা বিশাল অংশ জুড়ে নিজের "আনলার্নিং"ই থাকা উচিত।

আমি নিজে সামাজিক বিজ্ঞানের ছাত্র গবেষক হওয়ায়, সেই ধারা থেকেই দেখার চেষ্টা করছি। এবং, প্রথমে বলে রাখা ভালো, আমি আসলে "মেয়েরা মেয়েদের শত্রু" এই প্রবাদকে সম্পূর্ণ মিথ্যা মনে করি না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় নারীরা অন্য নারীর সাফল্যে বেশি ঈর্ষা আক্রান্ত হন। আত্মসচেতন নারী দেখলে হীনমন্যতায় ভোগেন। "নারীবাদ" অনেক নারীই টিটকারি মেরে উড়িয়ে দেন। এই প্রবাদের সূত্র, এবং নারীদের এই ব্যবহারের সূত্র পুরুষতন্ত্র হলেও এটাকে পুরুষতান্ত্রিক ভাঁওতা আমি বলতে চাই না।

পুরুষদের পারস্পরিক শত্রুতাকে আমরা "পুরুষই পুরুষের শত্রু" প্রবাদ দিয়ে ঢেকে রাখি না। পুরুষের কম্পিটিশনকে মোটামুটি স্বাস্থ্যকর হিসেবেই সমাজে দেখা হয়। চারিদিকে কত পুরুষকেই অন্য পুরুষের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হতে, বাধা দিতে দেখি। শ্যালক - ভগ্নীপতি, দুই ভাই, অফিসের সহকর্মী - "পুরুষই পুরুষের শত্রু" এই প্রবাদটি তবে নেই কেনো? এমনকি এক ভাই আরেক ভাই এর কল্লা কেটে সিংহাসন নেওয়াকেও ইতিহাস প্রশ্রয়ের চোখে দেখেছে। "নারী নারীর শত্রু" মেনে নিয়ে "পুরুষ পুরুষের শত্রু" না বলার পেছনের সামাজিক কারণটিকেই আমরা "পুরুষতন্ত্র" বলে দাবি করতে চাই।

আমি বরং এই প্রবাদের কোনও সামাজিক অস্তিত্ব থাকলে সেই সামাজিক বাধা পেরোনোর পক্ষপাতী। জৈবিক কিছু ব্যাখ্যা দেখা যায় এদিক ওদিক, মূলত নারী যে পুরুষ আকর্ষণ করতেই সব কিছু করে, এই ধারণা ব্যাখ্যা করে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এই জৈবিক ব্যাখ্যার ধারণা আজকাল আর সত্য বলে মনে হয় না। আমার ধারণা এর উল্টোটা- নারী প্রতিদিন সামাজিক বাঁধাগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। নিজের হতাশাগুলো অন্য নারীর উপর প্রক্ষেপ করেন।

সামাজিক কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

১। নারীদের নিজেদের মধ্যে তুলনামূলক প্রতিযোগিতা: মানুষ যখন নিজেকে অন্য কারো সাথে তুলনা করে ঈর্ষান্বিত হন, তখন সাধারণত তুলনা "লুক এলাইক" (Look alike) এর সাথে করেন। নিজের মত দেখতে হিসেবে প্রথমেই আসে নিজের পরিচিত নারীরা। নারী তাই পুরুষের এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে অন্য নারীর এগিয়ে যাওয়াকে বেশি ঈর্ষার চোখে দেখেন।

২। নারীদের ঝুঁকি না নেওয়া এবং ভাগ্য হিসেবে মেনে নেওয়া: সামাজিক বিভিন্ন কারণে নারীরা রিস্ক এভার্স হয়ে থাকেন। কেউ রিস্ক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেখলে হীনমন্যতায় ভোগেন। নিজে চর্চা করে যে রিস্ক এভার্স চরিত্র থেকে বের হওয়া সম্ভব, এটা সত্য মানেন না।

৩। ইন্সটিটিউশনের অভাব: প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সামাজিক বাধাকে প্রতিহত করার জন্য উন্নত বিশ্বে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। যারা নারীদের সাহায্য করেন, মেন্টরিং করেন, প্রয়োজনে লিগ্যালি লড়াই করেন। এমন সুযোগগুলো আমাদের সমাজে উপস্থিত না একেবারেই।

৪। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বাধা - প্রতিদিনের জীবনে বাঁধাগুলো নারীকে নিজের জীবন নিয়ে হতাশায় ভোগায়, সেই হতাশা নারী তার "লুক এলাইক" - নিজের মতো দেখতে কারো ওপর প্রক্ষেপ করেন।

উত্তরণের উপায় বলতে তো আসলে এই সমাজ কাঠামো পুরোটাই বদলানোর কথা বলতে হয়। আপাতত কিছু সহজে চিন্তা করা যাক।

১। সাংস্কৃতিক: সমাজে বিশাল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিয়ের জন্য প্রস্তুতির নাম জীবন না; নারী শিশুদের পুরুষ শিশুদের মতই জীবনের আনন্দ, সুযোগগুলো পাওয়া উচিত।

২। নিজেকে তৈরি করা, ঝুঁকি নিতে শেখা: নিজে এম্বিশাস হিসেবে তৈরি হলে অন্যদেরটা দেখে ইন্সপায়ার্ড লাগবে। নিজে এম্বিশাস হয়ে তৈরি না হলে অন্যের সাফল্য দেখলে ঈর্ষা ছাড়া আর কিছু আসবে না।

৩। ইন্সটিটিউশনালি: উন্নত বিশ্বের মত আমাদেরও দরকার নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, মেন্টরিং এর ব্যবস্থা করা উচিত ।

৪। এক্সপোজার/পড়াশোনার ব্যাপ্তি: একটা মানুষ যত জানবে, তত নিজের হীনমন্যতা নিয়ে সচেতন হবে। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে শিখবে। ভাবতে শিখবে। আর এই "আনলার্নিং" প্রসেসের মধ্য দিয়ে জানবে, ঈর্ষা কোনও কাজের কথা না।

নারীদের - আমাদের - তরবারি হাতে নিয়ে একে অপরের মাথা কাটার আগে ভাবা দরকার শত্রু বলে কাকে চিহ্নিত করছি। আমার প্রথম পর্যবেক্ষণে ফেরত যাই, ধরুন, পার্টনার যদি নারীকে পড়াশোনার বাধা দেন, সেই সমস্যার শত্রু আর যাই হোক, পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অন্য নারী নন। শাশুড়ির জীবনে রান্নাঘর ছাড়া আর কোনো কিছু না থাকলে, চড়াও হওয়ার জন্য শত্রুটি পুত্রবধূ নন। শত্রু কে, কার বিরুদ্ধে লড়ছি, এটা বুঝতে হলে ইমোশনাল ম্যাচিউরিটি এবং পড়াশোনার ব্যাপ্তি দুইই থাকতে হবে। মোটকথা, এই প্রবাদ "নারীরা নারীদের শত্রু" এটা একটা সামাজিক প্রথা জাত সত্য। এই সত্যকে ভেঙ্গে দিতে কয়েক প্রজন্মের পরিশ্রম দরকার।

উত্তরণের সবকটি উপায় আজকেই ধারণ করা সম্ভব না হলেও, আমরা আমাদের নিজেকে প্র্যাকটিসে কিছু সূচনা করতেই পারি। যেমন, এর পরের বার কোনো নারীর সাফল্য দেখলে তাকে স্লাট শেইমিং এ, "বেশ্যাকরণ" , না ফেলি। সূচনা নিজেকে দিয়েই হোক।

505 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।