পিরিয়ড ট্যাবু হিসেবে নয়, বরং নারী জীবনের সুন্দরতম সত্য হিসেবে প্রচারিত হোক

শনিবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ ৩:১৪ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


ফেসবুকীয় একজন বন্ধু কাল লিখেছেন "ছে‌লে‌দের খৎনা যেমন উৎসব ক‌রে পালন করা হয়, বাড়ীর মে‌য়ে‌দের প্রথম পি‌রিয়ড তেমন উৎসব ক‌রে পালন করা উচিত"। অনেকেই দেখলাম তার পোস্টে হাহা রিয়েক্ট করেছেন। সে তাদের কাছে হাস্যকর লাগতেই পারে কিন্তু একটা মেয়ে হিসেবে আমি এটা সমর্থন করি। কেনো করি?

আমার প্রথম পিরিয়ড হয় ক্লাশ সেভেনের প্রায় শেষের দিকে। স্কুল থেকে ফেরার সময় পেটে চিনচিনে একটা ব্যথা হচ্ছিলো। বাসায় ফিরে সাদা সালোয়ারে লাল রক্ত দেখে স্বাভাবিক ভাবেই ঘাবড়ে গেছিলাম। আম্মু বাসায় ছিলো না। গুডমনি (দাদী) ছিলো। তাকে বলার পর সে আমাকে নিয়ে একটা ঘরের ভিতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রাখলো!

একা সেই ঘরে ভয়ে, ব্যথায়, অস্বস্তিতে আমি একেবারে কুঁকড়ে রইলাম। গুডমনি যথেষ্ট শিক্ষিত মহিলা হওয়া সত্ত্বেও বয়স্ক মানুষ হিসেবে কিছু কুসংস্কার তার ছিলোই। তাকে আমি দোষ দেই না কেননা তার যাপিত নারীজীবন দিয়েই সে জীবন এবং জগত কে বিচার করবে এটাই স্বাভাবিক।

আম্মু ফিরে এসে গুডমনির নিষেধ অমান্য করেই আব্বুকে জানালো। সেটা অবশ্য খুব মজার আরেক ইতিহাস; আমার কোনো অসুখ বিসুখ হলে আব্বুরও বুকে ব্যাথা শুরু হয়ে যেতো আর সে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে থাকতো। এবারেও হলো তাই, একদিকে আমাকে সামলানো আরেকদিকে আব্বুকে; আম্মু পরে গেলো মহা ঝামেলায়।

পরে অবশ্য বিকেল বেলা আব্বু এক গাদা ফল, মিষ্টি, পোলাওয়ের চাল, কবুতর ইত্যাদি নিয়ে আসলো যখন গুডমনি তো একেবারে হা রে রে রে করে উঠলো। “একি যন্ত্রণা! মেয়ের পিরিয়ড হইছে কোথায় সেটা আড়াল করবে তা না সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হচ্ছে!”

যাই হোক! সে যাত্রায় আম্মু আর আব্বুর জন্যেই এক ভয়ানক অভিজ্ঞতার হাত থেকে বেচেঁ গেছিলাম। নয়তো ৪/৫ দিন আমার ওইভাবে একলা ঘরে বন্দী হয়েই থাকা লাগতো হয়তো। এজন্য অবশ্য আমার মা কে কম গঞ্জনা শুনতে হয় নি। পিরিয়ড হলেই আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা হয়। গুডমনির কথা মানি নি বলেই এই ব্যথাটা হয় এটা অনেকদিন অব্দি তার বদ্ধমূল ধারনা ছিলো। বাংলাদেশের গ্রামীন যৌথ পরিবারগুলোতে বেড়ে ওঠা প্রত্যেক টা মেয়েকেই হয়তো প্রথম পিরিয়ড কিংবা পিরিয়ডকালীন সময়ে এরকম কিংবা আরো বেশী বাজে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

শুধু গ্রামেই বা বলি কেনো! শহরের শিক্ষিত মানুষগুলোর মধ্যেও কি মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে কম কুসংস্কার ভর করে আছে! আমার বন্ধুদের কথাই যদি বলি, আমি আমার ভার্সিটি পড়ুয়া বন্ধুদের (ছেলে কিংবা মেয়ে) এই ট্যাবু নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে কমই দেখেছি। উল্টো মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে ছেলেবন্ধুদের নোংরা দুষ্টূমি করতে দেখেছি অনেক।

আগেই বলেছি পিরিয়ডের সময়ে আমার প্রচন্ড পেটে ব্যথা হয়। বেশ কয়েকবারই ক্লাশ চলাকালীন সময়ে স্যারকে বলে আমার বের হয়ে যেতে হয়েছে আর আমার শিক্ষিত শহুরে বন্ধুদের কাছ থেকে হাসি-ঠাট্টা শুনতে হয়েছে প্রতিবারই। সবথেকে পীড়াদায়ক ব্যাপার হলো, আমার সুশিক্ষিত সঙ্গীটিকে অনেক সময় বিরক্ত হতে দেখেছি, নাক সিটকাতে দেখেছি এটা নিয়ে। প্রায়ই শুনতে হয়, “কই আমার মা, বোন ওদের ও তো হয়। কই কখনো তো টের ও পাই না!” তার ধারনা আমি নিতান্ত নির্লজ্জ বলেই ব্যাপারটাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার জন্য পেটে ব্যাথার নাটক করি। যার কাছে পিরিয়ড মানেই জঘন্য একটা ঘটনা, ঘেন্নার বিষয় তাকে আমার বুঝাতেও ইচ্ছে করে না যে সবারই পেইনফুল মিনিস্ট্রেশন হয় না। এক জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে এই একটা বিষয়ে যে কতরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। আসল কথা হচ্ছে, গ্রামে কিংবা শহরে মেয়েদের পিরিয়ড একটা নিষিদ্ধ বিষয় বলে বিবেচিত হয় যেটা কখনোই কাম্য না। এবার থেকে এই ট্যাবু গুলো এই কুসংস্কারগুলো ভাঙা উচিৎ!

পিরিয়ড শুধুমাত্র শারিরীকভাবেই যন্ত্রণাদায়ক না বরং মানসিকভাবেও ভীষণ অস্বস্তিকর। একটা ১২/১৩/১৪ বছরের মেয়ে যখন জীবনে প্রথম এই যন্ত্রণার মুখোমুখি হয় তখন সবথেকে জরুরী তার পরিবারের পজেটিভ অবস্থান! মেয়েটি যখন দেখবে তার প্রথম পিরিয়ড উপলক্ষে সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে তখন সে আর নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাববে না বরং মানসিক অস্বস্তি থেকে খুব সহজেই রিলিফ পাবে যেটা তাকে

শারিরীকভাবেও সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে। যেমনটা একটা ছেলের বেলায় করা হয়। ছেলের খৎনা উপলক্ষে যদি গরু জবাই করে দু'একশ মানুষকে খাওয়ানো হয়ই তাহলে মেয়ের প্রথম পিরিয়ড হলে কেন নয়! ছেলের যন্ত্রণাময় সময়টাতে যদি পরিবার পজেটিভ অবস্থান নিতে পারে তাহলে মেয়ের যন্ত্রণাময় সময়ে কেন নয়! এক্ষেত্রে একটা বিষয় ক্লিয়ার করে রাখি, আমি কিন্তু খৎনা আর পিরিয়ড কে মিলিয়ে দেখি নি। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। খৎনা একটি নির্দিষ্ট ধর্মের আচার, মুসলিম বাদে অন্যান্য ধর্মের ছেলেদের এই বিষয়টা ফেস করতে হয় না অন্যদিকে মেয়ে মাত্রই তার পিরিয়ড হবেই। অথচ জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একটা মেয়ের জন্য স্বাভাবিক একটা বিষয়কে সমাজ এমনভাবে ট্যাবু বানিয়ে রেখেছে যেটা হাস্যকর!

মাতৃত্বই যদি একজন নারীর নারী হয়ে ওঠার মূল বলে ধরি তাহলেও পিরিয়ড কিন্তু সেই মাতৃত্বের ইঙ্গিতই বহন করছে অথচ বেশীরভাগ মানুষ পিরিয়ড কে যৌনতার সাথে মিলিয়ে ফেলে। আর যৌনতার সাথে মিলিয়ে ফেলে বলেই পিরিয়ডকে তারা ট্যাবু করে রেখেছে। ১২/১৩ বছরের একটা মেয়ের মানসিক শক্তি কতটুকুই বা থাকে? ওই বয়সের একটা মেয়ে প্রথম পিরিয়ডের সময়ে স্বাভাবিকভাবেই মানসিক এবং শারিরীক দুইভাবেই বিপর্যস্তবোধ করে। এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মধ্যে যদি তার মাথায় এটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে পিরিয়ড মানে একটা ট্যাবু, তোমাকে এটা সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে হবে, তোমাকে সাবধানে চলতে হবে যেন কেউ টের না পায় এমনকী তোমার বাবা, ভাই এর কাছ থেকেও তোমার নিজেকে লুকিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, আজ থেকে প্রত্যেক মাসে তুমি এক নিষিদ্ধ জগতের বাসিন্দা, এইদিনগুলোতে তুমি নাপাক, তুমি খেলবে না, তুমি দৌড়বে না , তুমি আলাদা  ইত্যাদি সেটা কতটুকু যৌক্তিক! বরং তাকে বলা হোক আরেহ! এটা কোনো ব্যাপার ই না। এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সুন্দর একটা ঘটনা। সুন্দর কেননা তুমি যে একজন সুস্থ এবং পরিপূর্ণ মানুষ পিরিয়ড সেটারই ইঙ্গিত বহন করছে।  

আর হ্যাঁ, অনেককেই বলতে শুনি পরিবারের পুরুষদের সাথে কেনো পিরিয়ডের কথা শেয়ার করতে হবে। মা, বোন থাকার পরেও বাবা কিংবা ভাই কে কেনো জানাতে হবে। জানাতে হবে, কেননা এই একটা কারণে ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হওয়া বোন আর ভাই এর মধ্যে হঠাত করে দুরত্ব তৈরি হয়ে যায়। ভাই জানতেও পারে না তার বোন কি পরিমাণ মানসিক এবং শারিরীক যন্ত্রণা ভোগ করছে। বোন পেট ব্যাথায় মরে যাবে কিন্তু ভাই তার পাশে এসে দাড়াবে না এরকম অসভ্য ট্যাবু আর হয় না। এই ভাইগুলোই বাইরে গিয়ে পরিচিত অন্যান্য মেয়েদের সাথে পিরিয়ড নিয়ে নোংরা অসভ্যতা করে বেড়ায়। উঁচু গলায় বলে, আমার বোনেরও হয় কিন্তু আমি কখনো টেরও পাই না।

বোনের যন্ত্রণাময় সময়ে তার পাশে থাকা তো দুরের কথা সে যে টের ও পায় না এটা ভাই হিসেবে কতবড় ব্যর্থতা এটা বোঝার মতোন চিন্তার মুক্তি কবে আসবে তাদের! আমার কথা যদি বলি, পিরিয়ডের দিনগুলিতে মায়ের চাইতে বেশী  বাবাই আমার সেবা করেছে। কেননা আম্মু রান্নাবান্না, ঘরের কাজ ফেলে আমার জন্য ততোটা সময় চাইলেও বের করতে পারতো না। এর ফলে  বাবার সাথে আমার কোনোদিন কোনো দূরত্ব তৈরি হয় নি, তার প্রতি আমার ভালোবাসা, সম্মান আরো বেড়েছে। আমার মনে হয়, একজন পুরুষ যখন নিজের পরিবারের মেয়েটির পিরিয়ডকালীন যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারবে তখন সেই পুরুষটি বাইরে কোনো মেয়ের পিরিয়ড নিয়ে নোংরা ফাজলামি করবে না। এই অসভ্য ট্যাবুও সেদিন ভাঙবে।  


 


  • ৫৪৫৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আফরোজ ন্যান্সি

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুকে আমরা