পিতামাতা যা ই করেন তাতেই সন্তানের মঙ্গল নিহিত, পর্ব-৪

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮ ৯:২৪ PM | বিভাগ : ওলো সই


বিয়ের সময় বিএ ক্লাসের ছাত্রী আমি। বিয়ের পর পরীক্ষা দিলাম। যেদিন রেজাল্ট বের হলো, আমি বাজারে গিয়ে ফোনের দোকান থেকে আমারিকায় ফোন করলাম, যে লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিলো তার কাছে, তাকে সুখবরটা জানাবার জন্য (আমার মোবাইল ছিলো না)। রেজাল্ট জানালাম তাকে। শুনে সে বললো, পাস করেছো তো কী হয়েছে? বললাম, আমি মাস্টার্সে ভর্তি হতে চাই। সে কঠোরকণ্ঠে বজ্রপাতের মতো আওয়াজ তুলে বললো, পড়ালেখা তো করে শুধু নষ্ট মেয়েরা। ভালো মেয়েরা ঘরের কোণে পর্দার ভেতরে থেকে সারাজীবন স্বামী শ্বশুরশাশুড়ির মন জুগিয়ে সেবাযত্ন করে টুঁ-শব্দটি না ক'রে। পড়ার কথা যদি আর কখনো মনে মনেও চিন্তা করো, আমি তোমাকে আমেরিকা থেকেই তিন তালাক পাঠাবো।

তার কথা শুনে বুক ভেঙে যাবার মতো কষ্ট হয় আমার। ফোনে আর কথা বাড়াই না, কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে আসি। চিঠিতে অনেক কাকুতি-মিনতি করি তার কাছে। আমাকে পড়তে দাও প্লিজ। আজকাল তো সব মেয়েরাই বিয়ের পর পড়ছে, চারপাশে দেখতে পাচ্ছি। লেখাপড়া তো খারাপ কিছু নয়। তাকে আমি দিস্তায় দিস্তায় চিঠি লিখি আমাকে পড়তে দেওয়ার জন্য। তার একই উত্তর, নষ্ট মেয়েরাই পড়ালেখা করে, ভালো মেয়েরা ঘরের কোণে থেকে স্বামী শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করে। আমার মা পড়ে নি, আমার দাদীনানীরা পড়ে নি, অতএব তুমিও পড়তে পারবে না। সন্দ্বীপের মেয়ে হয়ে তুমি বিএ পাস করেছো, এটাই তো অতিরিক্ত হয়ে গেছে। আমার উচিত হয় নি তোমাকে বিএ পরীক্ষা দিতে দেওয়া। বিএ পাস করেছো, তারপর আরো পড়তে চাও! তোমার এত ফুটানি কেনো? আমি তোমাকে বিয়ে করেছি দেনমোহর দিয়ে। অতএব আমার হুকুম ছাড়া নিঃশ্বাসও নিতে পারবে না।

অথচ সেই একই লোক আমার ছোটভাইদের লেখাপড়ার সমস্ত খরচ আমেরিকা থেকে পাঠায়। আমার মাকে বলে, এদের পড়ালেখার সব খরচ আমিই দেবো, আপনার কোনো চিন্তা নেই। এরা যতদূর পড়তে চায় সব খরচ সারাজীবন আমিই বহন করবো যেভাবেই হোক। সে করেছেও তাই। আমার মা আমাকে বলতো, তোর পড়ার দরকার কী? ও যখন চাইছে না, পড়িস না তুই। পড়ে কী করবি তুই? আমার ছেলেরা পড়ে লিখে মানুষ হোক। তুই ঘরের কাজকর্ম মন দিয়ে কর। ওর মন জুগিয়ে চল। ওর মন বিগড়ে গেলে আমার জন্য, আমার ছেলেদের জন্য টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবে। তুই আমার আর আমার ছেলেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিবি নাকি নিজে লেখাপড়া করতে চেয়ে চেয়ে? আমি বুঝতে পারি, সত্যিই তো, নিজে লেখাপড়া করে কী করবো? আমার ভাইগুলি লেখাপড়া করে মানুষ হোক। আমার মা ও ভাইদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হোক।

ভালো মেয়ে হয়ে যাই আমি এবার। আর পড়তে বলি না। পড়ার কথা মনে মনেও চিন্তা করি না। ঘরের কোণে পড়ে পড়ে আমার মা ভাইদের জন্য দিনরাত রান্না করি মজার মজার, ওদেরকে দিনে কয়েক বেলা খাবার পরিবেশন করি হাসিমুখে। ওরা খেয়ে যাবার পর এঁটোকাঁটা পরিষ্কার করি। সবার কাপড় ধুই নিজের হাতে। মায়ের বাড়ির মাটির মেঝে মাটির চুলো ধুয়ে নিকিয়ে আয়নার মতো চকচকে করে রাখি। টয়লেটটা সবাই হেগেমুতে যারপরনাই ময়লা করে রেখে যাবার পর নিজে মেঝে ধুয়ে রাখি। ওদের বাড়ির সামনের পেছনের আঙিনাগুলি দিনে দুইবার ঝাঁট দিয়ে পরিচ্ছন্ন করে রাখি। ওদের সবার বিছানাগুলি টানটান করে গুছিয়ে রাখি। প্রতি সপ্তাহে বিছানার চাদর মশারি নিজের হাতে ধুয়ে দিই। পানির কলসীগুলি ঝকঝকে করে মেজে বাড়ির সামনের চাপকল থেকে ভরে আনি। হারিকেনগুলি কয়েকদিন পরপর পুকুরে নিয়ে ভালো করে ধুয়ে মুছে রাখি। ওদের হাঁসমুরগির দেখাশোনা করি। ওদের গাছগাছালি ফলমূল দেখেশুনে রাখি। আশেপাশের চাষাবাদগুলি তদারকি করি। ঘরে ফসল এলে নিজেই সামালাই সব কাজ।

মা স্কুলে মাস্টারি করে। স্কুলে যাবার আগে তাকে খাবার তৈরি করে পিড়ি পেতে খেতে ডাকি। খেয়ে উঠে গেলে সব গুছিয়ে রাখি। তার চুলটা আঁচড়িয়ে দিই, শাড়িটা সুন্দর করে পরিয়ে দিই। দুপুরে ব্রেক টাইমে মা বাড়ি আসে লাঞ্চ খেতে। সে আসবার আগে আগে রান্না করে রাখি। এলে পরিবেশন করি।

আমেরিকা থেকে মাসে মাসে টাকা আসে আমার ভাইদের পড়ার খরচ ও ওদের সবার যাবতীয় সব খরচের জন্য। মা বলে, ওকে বল টাকা আরো বেশি করে পাঠাতে। আমি জমি কিনবো, ডিপ টিউবওয়েল বসাবো, পুকুরে ঘাট পাকা করবো, বাড়িটাও পাকা করা দরকার। আর ওর মন জুগিয়ে চলিস সবসময়, ওর কথার ওপর কথা বলিস না, নইলে টাকা দেবে না ও ঠিকমত আমাকে। আমার তাহলে স্বপ্নভঙ্গ হবে তোর কারণে। আমি ভালো মেয়ের মতো আমার মা-ভাইদের মন জুগিয়ে চলি, মন জুগিয়ে চলি সেই লোকেরও; দিনরাত কাজ করি, নিজের লেখাপড়ার প্রসঙ্গ কখনো তুলি না। বরের কাছ থেকে ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে আমার মা-ভাইদের জন্য টাকা আদায় করতে থাকি। মা বলে, এভাবে চললে তো আর কনো কথা নেই।


  • ১৬০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তামান্না ঝুমু

ব্লগার ও লেখক

ফেসবুকে আমরা