প্লিজ ওদের বলতে দিন! প্রসঙ্গ: #Metoo

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১১, ২০১৯ ১২:৩৯ PM | বিভাগ : #Metoo


অপমান আর ঘৃণায় কুঁকড়ে আছে মেয়েটা। সে তার অভিভাবকদের খুলে বলেছে ঘটনাটা এবং মনে প্রাণে চাইছে এর একটা বিহীত হউক। কিন্তু কে করবে এর বিহীত? তার সাহসী আর আদর্শবান বাবাও যে আজ মাথা নিচু করে বসে আছেন। তার দু’চোখ বেয়ে ঝরে পড়ছে নীরব অশ্রু, ভিজে গেছে সাদা পাঞ্জবীটা। তিনি কী করে আপন সহোদরের মুখোমুখি হবেন, তার কাছে কৈফিয়ত চাইবেন?

সমাজের মাথা এই ব্যক্তি নানাজনের বিচার করে বেড়ালেও নিজের মেয়ের অপমানের বিচার করার সাধ্য তার নেই। তাইতো নিজের সমস্ত অক্ষমতা নোনা জলে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চাইছেন। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে গুমরে গুমরে কাঁদছে মা।

আজ বোনের কাছ থেকে দূরে সরে আছে ছোট ছোট ভাইবোনগুলোও। তারা জানে তাদের প্রিয় বোনটার সঙ্গে এমন কিছু হয়েছে যা হওয়া উচিত হয় নি। তাই তাদেরও খুব মন খারাপ, খেলায় মন নেই, স্কুলেও যাওয়া হয় নি। এ সবই আমার শোনা গল্প, নিজের চোখে দেখি নি, কিন্তু এক বর্ণও মিথ্যা নয়।

ওই কিশোরী মেয়েটা এখন মধ্যবয়সী নারী। স্বামী, সংসার, সন্তান, ধন দৌলত এমনকি সামাজিক মর্যাদা কোনো কিছুরই অভাব নেই তার। কিন্তু তারপরও একটা গোপন কষ্ট আর গ্লানি তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। নিজের লজ্জা আর অপমানের কথা কাউকে বলতে না পারার কষ্ট, অপরাধীকে শাস্তি না দেবার কষ্ট, এসবই কিন্তু তাকে কুঁড়ে কুড়ে খায়। এই কষ্টের কোনো শেষ নেই, চলবে আমৃত্যু।

স্ব চোখে দেখি আর না দেখি আমার বিশ্বাস কমবেশি এরকম ঘটনা সব পরিবারেই আছে। আর যাদের অভিজ্ঞতা নেই তারা জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমাদের ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি পড়ে নিতে পারেন। মেয়েরা যে তাদের পরম প্রিয় আর বিশ্বাসী মানুষটির কাছ থেকে কীভাবে প্রতারিত হয় তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে সেই বইটিতে।

চাচা, মামা, খালু, নানা ধরনের ভাই, দুলাভাই, গৃহশিক্ষক, লজিং মাস্টার, স্কুলের শিক্ষক এমনকি বিয়ের পর দেবর, ভাসুর, নন্দাই, কখনও কখনও শ্বশুর, সৎবাবা বা মায়ের প্রেমিক; কার হাতে না অপমানিত হয়েছে বা হচ্ছে এ দেশের নারীরা! প্রতিনিয়ত জোর জবরদস্তি, প্রলোভন এবং নানা রকম ফাঁদে ফেলে তাদের নানাভাবে যৌন হয়রানি বা নির্যাতন করে চলেছে এইসব আত্মীয় ও অনাত্মীয় পুরুষেরা। এ নিয়ে যখনই মুখ খুলতে গেছে তারা তখনই তাদের টুটি চেপে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘চুপ কর, মেয়েদের এসব কথা বলতে হয় না।’ মেয়ের কষ্টে মা কেঁদেছেন কিন্তু পাশাপাশি মেয়েকে ‘চুপ’ থাকার শিক্ষাটাই দিয়েছেন যুগ যুগ ধরে। তাই বুঝি হাজার বছর ধরে এই দেশের প্রতিটি মা তার কিশোরী মেয়েটিকে বলেন, তোমার সহ্যশক্তি আরো বাড়াতে হবে। তোমাকে যে ভবিষ্যতে অনেক কিছু সইতে হবে মা!’

যুগের পরিবর্তনে মেয়েরা যখন লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে এবং চার দেয়ালের বাইরে এসে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করেছে তখনও স্বস্তিতে নেই নেই তারা। নানা হেনস্থার শিকার হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, তারা যেন কোনো ভদ্র সমাজের তথাকথিত কোনো সুসজ্জিত অফিসে নয়, কাজ করছে গভীর অরণ্যে যেখানে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পুরুষরূপী হায়নার দল। আর সুযোগ মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিরস্ত্র নারীর ওপর। এখানেও সেই একই নিয়ম, ‘এসব সহ্য করে থাকতে পারলে থাক, নয়তো ফিরে যাও। এতই যদি গুমোর তাহলে চাকরি করতে আসা কেনো, বাড়ি বসে থাকলেই পারেন।’ পাবলিক যানবাহনে উঠতে যাবেন সেখানেও ঘুরে বেড়ায় কত শিকারি হাত, সুযোগ পেলেই সাপের মতো ছোবল মারে, মাংসাশী জানোয়ারের মতো খুবলে নিতে চায় মাংস। এ নিয়ে কিছু বলতে গেলেই সেই একই যুক্তি, ‘বাসে চলতে গেলে এরকম একটু আধটু গায়ে হাত লাগবেই। পছন্দ না হলে নেমে যান।’ এইসব কারণে কত শিক্ষিত মেয়ে যে চাকরি না করে বাসায় বসে আছে, কত মেয়ে যে কর্মক্ষেত্রে ইস্তফা দিয়ে চার দেয়ালে অভ্যন্তরে ঠাঁই নিয়েছে এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই সরকারি সংস্থা কিংবা কোনো এনজিওর কাছে। যদিও এসব তারা নারীদের নিয়ে এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্যই কাজ করছেন।

কিন্তু এখন যে সময় বদলে গেছে! বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টিকারী #মিটু আন্দোলনের ফলে আমাদের মেয়েরাও সাহসী হয়েছে। তারা মুখ খুলছে, বলতে শুরু করেছে তাদের মনের গহীনে দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা লজ্জা আর ঘৃণার কথা। তারা আঙ্গুল তুলে এই বোবা আর তথাকথিত সুশীল সমাজকে বলছে, ‘দেখ, এই সেই ভদ্রলোক, অতি সজ্জন ব্যক্তি যে আমার নারীত্বকে চরম অপমান করেছে।’ এমনকি এবার নিজের জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধেও মুখ খুলেছে মেয়ে।

এসব দেখে মনে হচ্ছে যেন হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকা আগ্নেয়গিরি জীবন্ত হয়ে উঠেছে এবং তার ভিতরে জমে থাকা ভয়, ঘৃণা, অপমান, অসম্মান, লজ্জা আর কষ্টগুলো লাভা হয়ে বেরুচ্ছে। এই আগুন নেভানোর চেষ্টা করবেন না, প্লিজ। বরং তাদের বলতে দিন। তারা তো আপনাদের কাছে, এই সমাজের কাছে, প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার কাছে কোনো বিচার চাইছে না, নালিশও করছে না কারো কাছে। তারা কেবল হাজার বছর ধরে মনের ভিতর জমিয়ে রাখা ক্ষোভ আর ঘৃণাটুকু উগড়ে দিচ্ছে।

পারলে তাদের এই কষ্টের মিছিলে শরিক হয়ে তাদের কিছুটা সমর্থন করুন। বলুন, ‘ভয় নেই, আমরা আছি তোমাদের সঙ্গে।’ আর না পারলে চুপ করে থাকুন। কেবল তাদের থামতে বলবেন না।


  • ৪০২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মাহমুদা আকতার

লেখক ও সাংবাদিক। কাজ করেছেন ইউএনবি, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক ডেসটিনি, বিএনএসসহ আরো বেশ কিছু পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থায়। বর্তমানে কাজ করছেন দৈনিক বাংলাদেশ জার্নাল পত্রিকায় শিফট ইনচার্জ হিসেবে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুল, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিয়মিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর লিখছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ পাঁচটি।

ফেসবুকে আমরা