আত্মহত্যা একটি মানসিক রোগ

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ১, ২০১৯ ৪:৩০ PM | বিভাগ : আলোচিত


আকাশ নামের এক তরুণ চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার আগে সে বিশদ পোস্ট দিয়েছে ফেসবুকে এই বলে যে -তাঁর স্ত্রী তানজিলা হক মিতুর পরকীয়া প্রেমের জন্যে আকাশের আত্মহত্যা। শুধু তাই নয় আকাশ আরও জানিয়েছে যে মিতুকে সে খুব ভালোবাসে এমন কি মিতুর সঙ্গে অন্য ছেলের সম্পর্ক জেনে সে বিয়ে না করে থাকতে পারে নি। ফেসবুক, ইন্টারনেট সবখানে মিতুর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি এবং ধিক্কার জানানো হচ্ছে। আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষণা, মনোরোগ নিয়ে গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষিতে আমি অনেকবার এগুলো নিয়ে লিখেছি। এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য করতে চাই।

এক.

আত্মহত্যা একটি রোগ, এর পেছনে থাকে আরও ভয়ঙ্কর মানসিক অসুখ যা একজন ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। পারিপার্শ্বিকতা অনেক সময় দায়ি হলেও মূল কারণ হয়তো মানসিক রোগ, যেমন সিভিয়ার ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিজর্ডার, স্ক্রিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি। আর এইসব মানসিক রোগ চিকিৎসা ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়, কোনো কোনোটি সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়; কিন্তু ওষুধ ও সাইকোথেরাপি দিয়ে প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব।

দুই.

যতটুকু আকাশের হিস্ট্রি পড়ছি বা শুনছি, তার যে মানসিক রোগ ছিলো এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সে কি কোনোদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছে? এইসব মানসিক রোগের মধ্যে লক্ষণ থাকে 'প্যারানয়া' বা অতিরিক্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা, আতিরিক্ত পজেসিভনেস ইত্যাদি। কারো অতিরিক্ত যৌন চাহিদা আবার কারো এমনকি ইম্পোটেন্স (পুরুষত্বহীনতা) থাকতেও পারে। এগুলো না জেনে একজনকে একতরফাভাবে দোষ দিয়ে শাস্তি চাওয়া আরেকটি অন্যায়। আমাদের মনে রাখা উচিত দাম্পত্য জীবনে মানুষের অনেক জিনিস থাকে যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। না জেনে, না বুঝে কোনো পক্ষের নিন্দা করাই আরেকটি অন্যায়।

তিন.

যারা ভীষণ পজেসিভ ধরণের মানুষ, এদের ভালোবাসাও প্রশ্নাতীত নয়। লক্ষ্য করুন আকাশ মিতুকে অপছন্দ করলেও চক্ষুলজ্জায় বিয়ে ভাঙতে পারে নি। এইসব পুরুষতান্ত্রিক "ইগো" কোনোদিনও মঙ্গল ব'য়ে আনতে পারে না। অন্যদিকে যদি সত্যিকারের ভালোবাসবে সেখানে এতো ভিনডিক্টিভ বা প্রতিহিংসাপরায়ণ সে যে মৃত্যুর পরও মেয়েটির সর্বনাশের সব রকমের ব্যবস্থা করে গেছে। মেয়েটির ভিডিও ভাইরাল, ফটো ভাইরাল। বাহ, প্রেম বটে! মনোবিজ্ঞানীরা জানেন এটা যে প্রেম নাকি পুরুষতান্ত্রিক পজেসিভনেস কিনা।

চার.

মিতু কে নাকি এরেস্ট করা হয়েছে। পরকীয়া অনৈতিক হতে পারে কিন্তু তা কি অপরাধ? সেই হিসাবে তো আত্মহত্যাও বাংলাদেশের আইনে অপরাধ ছিলো। সেই বৃটিশ আমল থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে গেলে তাঁকে উল্টো শাস্তি দেয়া হতো; অথচ এঁদের দরকার চিকিৎসা এবং ভালো পরিবেশ দেয়া। এইসব বস্তাপচা আইন কবে বাতিল হবে বাংলাদেশে?

আকাশের মতো তরুণ চিকিৎসক আত্মহত্যা করেছে; এর চেয়ে বেদনার আর কিছু নেই। তাঁকে আমরা আর ফেরাতে পারবো না। কিন্তু ভেতরের সকল খবর না জেনে আরেকজন জীবিত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া আরেকটা অন্যায়। ফেসবুকের এইসব তথাকথিত পণ্ডিতেরা না জানে মানসিক রোগ সম্পর্কে, না জানে সামাজিক মনস্তত্ব। নিজেদের ব্যক্তিগত ধারণা দিয়ে কোনো উগ্র সিদ্ধান্ত দিতে যাবেন না। তাতে একটি অন্যায়ের প্রেক্ষিতে আরেকটি বড় অন্যায় হয়। এখানে আমি কোনোভাবেই পরকীয়া করার পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না; কিন্তু সম্পর্ক ভালো না থাকলে, না টিকলে সুস্থ উপায় হলো আলাদা হয়ে যাওয়া। যার সঙ্গে চলবে না তার থেকে দূরে থাকুন, নিজেও ভালো থাকবেন, অন্যকে ভালো রাখতে পারবেন। কিন্তু আত্মহত্যা বা হিংসায় অন্যকে হত্যার অধিকার কোনো আইনে বা সামাজিক নিয়মে দেয়া হয় নি।

আমি বাংলাদেশের আইনের অনেক গলতির কথা বলতে পারি। কিন্তু সবচেয়ে স্টুপিড আইন হলো আত্নহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টাকে বেআইনি বলে বিচার করা এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্যে কাউকে শাস্তি দেয়া। প্ররোচনার সংজ্ঞা এবং প্রমাণ কীভাবে করবেন? যেখানে নিজেরাই জানে না আত্নহত্যা কি? মানুষ কেনো আত্মহত্যা করে। এইসব উন্মাদনা বন্ধ হওয়া দরকার। আকাশের মতো কেউ আত্মহত্যা করার আগে তার জন্যে চিকিৎসা ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করুন। মানসিক রোগ কে স্বাভাবিক ভাবতে শিখুন এবং সকল স্টিগমা পরিহার করুন যাতে আকাশের মতো ছেলে বা মেয়েরা কোনো সামাজিক ব্যাকল্যাশ ছাড়াই মানসিক চিকিৎসা নিতে পারে। পারলে সেগুলো নিয়ে ফেসবুকে শোরগোল তুলুন। না হলে পুরো সমাজের প্ররোচনাকারী হিসাবে বিচার হওয়া উচিত। তা কি ভেবে দেখেছেন?


  • ১৪৭৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সেজান মাহমুদ

Assistant Dean and Professor, UCF College of Medicine, USA.

ফেসবুকে আমরা