আমার মডারেট মুসলমান বন্ধু

শুক্রবার, মে ১৮, ২০১৮ ২:৪৯ AM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


অনেকদিন আগে ফেসবুকে কোলন মসজিদ সম্পর্কিত একটা ছবি দিয়েছিলাম যেখানে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার টয়লেট আছে ঠিকই কিন্তু ঈমানী দায়িত্ব রক্ষার্থে তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আজকে সেই মসজিদে যাবার কাহিনীটা বলি।

দাবী করা হয় মসজিদটি জার্মানীর সবচে বড় একটি মসজিদ যা তুরস্কের মুসলমানরা তৈরি করেছে। নিঃসন্দেহে এটি নন্দনীয় একটি মসজিদ। ইউরোপীয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্যকলার মিশেল দিয়ে মসজিদটি বানানো হয়েছে। তো সেদিন আমার মডারেট শিয়া বন্ধু ছিলো সফর সঙ্গী। সে এমনিতে কোনো রাস্তাঘাট চেনে না, কোনো রুটে, কোনো ট্রামে চড়ে কোথায় যেতে হবে সবকিছুর জন্য সে আমার সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। আমার জন্য তো গুগলেশ্বর আছে। তো সেদিন বেচারা দেখি নিজেই গুগল ম্যাপ খুঁজে খুঁজে ঠিকই বের করে নিয়েছে মসজিদের ঠিকানা, রুট সবকিছু।

আমি যেহেতু তাঁর সফর সঙ্গী এবং একটা ক্যামেরা থাকার সুবাধে ক্যামেরা ম্যানের দায়িত্ব পালন করছি, অগত্যা মুধুসুদন তাঁর সাথে সাথেই গেলাম। আমি নাস্তিক জানার পরও বন্ধুটির বারংবার অনুরোধ রাখতে গিয়ে প্রবেশও করতে হলো মসজিদ চত্বরে। প্রবেশ যেহেতু করেই ফেলেছি, তাই দু’ফোটা মূত্রত্যাগের প্রয়োজনটা সেরে নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিধি বাম, লাল ফিতের সুবাধে সেটা আর হয়ে উঠে নি। মসজিদ চত্বর সকলের জন্য উন্মোক্ত হলেও আর শৌচাগার সকল ধরণের মানুষের জন্য চিন্তা করে বানানো হলেও দাঁড়িয়ে কাজ সারাদের জন্য ছিলো লাল ফিতার রুদ্ধ বন্ধন।

তো, দেখাদেখি আর ছবি তোলার পর ভাবলাম এবার ফিরি। না, বন্ধুটি এবার অনুরোধ করলেন দুই রাকাত নামাযের। বললাম, তুমি কি জানো না আমি নাস্তিক? সে বললো, নাস্তিক হলেও নামায পড়লে দিল ঠান্ডা হয়, মন নরম হয় ইত্যকার নানান কথা দিয়ে বুঝাতে শুরু করলো। অনেক পীড়াপীড়ির পরও যখন আমি নামাজে রাজি হচ্ছিলাম না, বেচারা মুখখানা কালো করে একাই নামাযে গেলো।

সেই যাই হোক, সেই শিয়া বন্ধুটি আবার হাদীস মানে না, শুধু কোরান বিশ্বাস করে। অন্য সাহাবীদের কোনো মূল্যায়ন না করলেও আলীকে মানে। আর আমাকে বারংবার দ্বীনের দাওয়াত দিতে ভুল করে না। হয়তো সে ধরে নিয়েছে, আমাকে লাইনে আনতে পারলে তাঁর বেহেশতখানা নিশ্চিত হয়ে যাবে। এমন সুযোগ কে আর ছাড়ে?

দাওয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে বন্ধুটির সাথে কথাচক্রে একদিন বলেছিলাম, ধরো, মোহাম্মদ খাদিজাকে বিয়ে না করে যদি কোনো অল্প বয়স্ক তরুণীকে  বিয়ে করতেন? তাহলে, তিনি কি সেই তরুণীর রূপ-যৌবনে না মজে হেরা গুহায় ধ্যানে যেতেন? এরপর তাঁর সে কী অগ্নিমূর্তি! জার্মানীতে এসেও কল্লা হারানোর ভয়ে আমি একেবারে চুপসে বেলুন হয়ে গেলাম। এরপর থেকে তাঁর সাথে শর্ত হলো, সে আর কোনোদিন দ্বীনের দাওয়াত দেবে না, আমিও ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলবো না।

রমজান মাস এসে গেছে, খোদ জার্মানীতেও এই খবরটা জেনেছি আমার সেই বন্ধুর কল্যাণে। আমরা প্রতিমাসেই কোলনে যাই দু’জন। সেই বন্ধুটি যথারীতি রাস্তাঘাট না চিনলেও কোলনের বিখ্যাত নাইটক্লাব-এর ঠিকানা বের করে ফেলেছে, জেনে গিয়েছে ট্রাম বাসের রুট। আমিও পাশ্চাত্যের লাস্যময়ী রমনীদের নগ্ন নৃত্য অবলোকনের লোভ সামলাতে না পেরে তাঁর সঙ্গী হয়েছি। কিন্তু, একবারের পর সেইসব নগ্ন নৃত্য কত আর ভালো লাগে? কৌতূহলী কিংবা লুলোপ দৃষ্টি যাই বলুন না কেনো, প্রথমবারের পরে নগ্ন নারীর উদ্যম নৃত্যের মতো কুৎসিত আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। অথচ, বন্ধুটির ফি মাসে যাওয়া চাই, দর্শন করা চাই তাঁর ভাষায়, "হুর আল আইন" মানে দুনিয়ার হুর। গতমাসের ভ্রমনের সময় আমি বারংবার বাদ সাধছি, বন্ধু, প্লিজ, এইমাসে বাদ দাও। একমাস নাইটক্লাবে না গেলে কি আর এমন আসে যাবে? আর যাই হোক, অন্তত কিছু টাকা তো বেঁচে যাবে। আর তখনই জানলাম, সামনে রমজান মাস। এর আগে শেষবারের মতো যাওয়া চাই-ই চাই।

যদিও আমাদের শর্ত ছিলো, ধর্ম নিয়ে কোনো কথা নয়, তথাপি বন্ধুটি এরপর থেকে আমাকে সাওম পালনের জন্য নানাবিধ আবদার চালিয়ে যাচ্ছিলেন বিরামহীন, তুলে ধরছিলেন রোজার নানাবিধ বৈজ্ঞানিক উপকারের কথা, দেখাচ্ছিলেন ইফতারীর লোভ।  গতকাল থেকে দেখলাম বন্ধুটি সাওম পালন শুরু করে দিয়েছেন। আমিও ভাবলাম, শয়তান বন্দির দুঃখে মুসলমানরা অনশন শুরু করে দিয়েছে। এ সম্পর্কিত স্ট্যাটাস দেয়ার পর আল্লার দেয়া কসমগুলোর কথা মনে পড়লো। মনে পড়লো, সময়ের কাছে আল্লা আর মোহাম্মদ বড় অসহায়, বাংলাদেশে রমজান আরও এক দুইদিন পরে শুরু হয়। আল্লা, মোহাম্মদ দু’জনে মিলেও পৃথিবীর সময়টাকে এক করতে পারে নি, তাদেরই দেয়া পবিত্রতা দেশে দেশে শুরু  ভিন্ন ভিন্ন সময়ে।

আজ সকালে বন্ধুটির সাথে দেখা হলে মদ পানের খবর নিচ্ছিলো, বুঝলাম রমজানে পান না করার আক্ষেপ তাঁর ভেতর। জানালাম, তার সাথে পান করার পর চারদিন হলো পান করছি না। এ কথা শুনে বন্ধুটির উচ্ছাস দেখে কে! জড়িয়ে ধরে আমাকে বারংবার ধন্যবাদ দিতে লাগলো, জপতে লাগলো, “থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ ফর রেস্পেক্টিং রমাদান”। বললাম, ধন্যবাদ দেবার কিছু নাই, আমি ইউক-এন্ড ছাড়া পান করি না। শুনে, মুখটা দেখার মতো পাংশু হয়েছিলো। মনে মনে বললাম, তুমিই প্রকৃত মডারেট মুসলমান।


  • ৫৬৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

পৃথু স্যন্যাল

জার্মান প্রবাসী পৃথু স্যন্যাল আপাদ মস্তক একজন স্বাধীনতাকামী ব্যক্তি, ব্লগার। বর্তমানে নারী'র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ফেসবুকে আমরা