প্রীতির অপ্রীতিকর কান্ড নিয়ে ততোধিক অপ্রীতিকর কিছু কথা

শুক্রবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৮ ৫:২২ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


বাংলাদেশের বাংলাভাষী উঠতি লেখক জান্নাতুন নাঈম প্রীতি বেশ ক,দিন ধরে বাঙলা অন্তর্জালে হটকেক হয়ে বসে আছেন। বরাবরের মতোই এটি বাংলা অন্তর্জালের বুদ্ধিজীবী মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণের আরেকটা ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা বাহুল্য, এই ঘটনায় প্রেম, পরকীয়া, অসম বয়স ইত্যকার বিষয় থাকাতে তা যথেষ্ট চটুল রসবোধক হয়েও দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনাকে পুঁজি করে কেউ হয়েছেন গবেষক, কেউ হয়েছেন পরামর্শক বন্ধু, কেউ হয়েছেন পরামর্শক পিতা, কেউ হয়েছেন মরাল পুলিশ। আর নিন্দুকদের কথা না হয় নাই বললাম। এবং এই লেখার মধ্য দিয়ে আমিও হয়তো ঐ কেউদের সারিতে দাঁড়াবার প্রয়াস পেলাম। বরাবরের মতোই স্রেফ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন ছাড়া আমি কোনো উপসংহারে যাবো না। আর আমার মাথায় প্রশ্নই খেলে, উত্তর আসে না।

প্রীতির অপ্রীতিকর কান্ডে লোকের সামনে প্রথম যে অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি ঘটেছে প্রীতির হাত দিয়েই। তিনি একান্ত নিজেদের কথোপথন জনতার সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় একটি কাজ এবং উনার যে উদ্দেশ্য ছিলো সেটা তা একটা পার্ভারটেড পুরুষ দ্বারা প্রেমিকার সাথে কাটানো একান্ত সময়ের ভিডিও ফাঁস করে দেয়ার মতোই। দু’টি কাজের উদ্দেশ্যই এক; বিপরীত পক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করা। আইনের দৃষ্টিতে এটি অপরাধ কি না এবং কতটুকু অপরাধ তা নিয়ে আমি এখনও নিশ্চিত নই, তবে অবশ্যই নিন্দনীয় একটি কাজ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আর এই নিন্দার কাজটি প্রীতি করেছেন বলে এর আড়ালে আরও নিন্দনীয়, আরও ঘৃণিত ঘটনাটি আমাদের অন্তর্জালিক সমাজে আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে অথবা শুধু মৃদু ভৎসনার প্রয়াসেই আটকে গেছে। অধিকাংশের কথায় জনাব ইমতিয়াজ সাহেবের প্রতি একটা মিনমিনে কটাক্ষ ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় নি। কেউ কেউ বলেছেন, ইমতিয়াজ সাহেব বউ  বাচ্চা রেখে প্রীতির সাথে যেটা করেছেন সেটা ঠিক হয় নি, উনি বউ বাচ্চার সাথে প্রতারণা করেছেন, এই সেই। আবার কেউ কেউ ইমতিয়াজ সাহেবকে ডিফেন্ডও করছেন যে সম্পর্কটিতে প্রীতির প্রভোকেশন ছিলো। এটা প্রমাণ করার একটা প্রচ্ছন্ন প্রয়াস ছিলো যে ইমতিয়াজ সাহেব ঘটনার শিকার। বাহ! কি সব মজার মজার যুক্তি দেখছি চারপাশে। ধরে নিলাম, প্রীতি এই অপ্রীতিকর সম্পর্ক ঘটাতে যথেষ্ঠ উস্কানী দিয়েছেন, সিডিউসড করেছেন, সাথে এও ধরে নিলাম, প্রীতি একজন (তথাকথিত সামাজিক দৃষ্টিকোন থেকে) পতিতা, উনার স্বভাবই এমন, উনি পুরুষদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন। তাহলেও কি একজন ষাটোর্ধ্ব পুরুষকে এই রকম ফাঁদে পা দেয়াটা মানায়? মানালে কতটুকু মানায়? আপনাদের তথাকথিত নৈতিকতাবোধ কি বলে?

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দুয়েকজনের কাছ থেকে পরে জানতে পেরেছি, জনাব ইমতিয়াজ সাহেবের এই ধরণের কান্ড এটাই প্রথম নয়। এর আগেও উনি এই রকম ফাঁদে (অনেকের মতে) পা দিয়েছেন। প্রীতির অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটালে আমরা তো সেই চিরাচরিত সচেতন, নারীবাদী, প্রতিবাদী মানবাধিকার কর্মী, পাহাড়ী বন্ধু আইনজীবীর আড়ালে এমন একজন ফাঁদে পা দিতে এক পায়ে খাড়া বন্ধুটির কথা জানতেই পারতাম না। আর উনার এই ফাঁদে পা দেয়া চলতেই থাকতো, চলতেই থাকতো এবং এই ফাঁদ খুজে পেতে উনার নারীবাদী নামক টর্চলাইটটি ব্যবহার হতেই থাকতো! এক্ষেত্রে প্রীতির অপ্রীতিকর ঘটনাটিকে সাধুবাধ জানালে ভুল হবে কি! আর জনাব উমতিয়াজ সাহেবকে লম্পট উপাধি দিলে কি সেটাও অন্যায় হয়ে যাবে?

মজার বিষয় হলো, সমালোচক এবং পরামর্শকগণ প্রীতির অপ্রীতিকর স্ক্রীনশটগুলোকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এটা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে ইমতিয়াজ সাহেবের দ্বিধা ছিলো বয়স নিয়ে। আহা! কত ভাল মানুষ!! কিশোরীর প্রেম থেকে নিজেকে নিভৃত রাখার কি সাধনা উনার!! এখানে প্রীতির বয়স যদি বাইশ না হয়ে বায়ান্ন হতো, তাহলে কি উনার দ্বিধা থাকতো না? জনাব ইমতিয়াজ সাহেব কি তার বহুগামীত্বে দ্বিধাহীন, যদি না বয়স (যদিও শেষ পর্যন্ত বাঁধা হয়ে থাকে নি) বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়? উপরন্তু যেটা সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে তা হলো, তিনি প্রীতিকে বয়সের দ্বিধার পর বলেছেন, চিন্তা করো না। কিসের জন্য চিন্তা না করতে বলেছেন?

আরেক জন গণ্যমান্যের লেখায় দেখলাম, উনি নিজে থেকে (বানিয়েছেন কি না জানা নেই) আরও কয়েকটি স্ক্রীনশট প্রকাশ করেছেন যেগুলি প্রীতি প্রকাশ করেন নি এবং উনি প্রীতির অপ্রীতিকর কাণ্ডকে বদমাইশি বলে উল্লেখ করেছেন। প্রীতির প্রভোকেশনকে গায়ে পরে হ্যাংলামো বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রীতি তার তথাকথিত প্রেমিকের সাথে ঘটা কথোপথন ফাঁস করে যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে উনার অনুমতি ছাড়া বাকী/নতুন স্ক্রীনশট প্রকাশ করাটাও কি অন্যায় নয়? এটা তো বরং আরও বেশি অন্যায় কারণ  উনি তৃতীয় পক্ষ। এরপর আবারও একই কথা, প্রীতির হ্যাংলামোকে একজন প্রবীন, সচেতন ব্যক্তি, একজন আইনজীবী পাত্তা দিবেন কেনো? উনার বুইড়া বয়সের ভীমরতিকে লাগাম দিতে না পারার ব্যর্থতার দায় একজন সদ্য কৈশোর পেরোনো বাইশোর্ধ্ব তরুণীর গায়ে না ছিটালেই কি নয়! তাও ঠিক, উনি একজন বুড়া মানুষ, বুড়ো মানুষের তো আবার মতির ঠিক থাকে না। না কি পুরুষেরা একটু আধটু এরকম হয়েই থাকেন!! আমি অবশ্য উনাকে সেই তেঁতুল হুজুরদের সাথে তুলনা দিচ্ছি না, যারা নারীর শরীর দেখা গেলে কাম তাড়িত হয়ে যায়। উনি তো আর শরীর দেখেই তাড়িত হন নি, আহ্বানে উন্মত্ত হয়েছেন। কত্ত ভাল মানুষ!!

তবে, দুঃখের সাথে দেখলাম, আমাদের তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত, রুচিশীল নারীগণের মধ্যে কেউ কেউ প্রীতির অপ্রীতিকর ঘটনাটিকে রসাত্নক (আমি ব্যাংগাত্মক বলছি না) শব্দে ভূষিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ইস্টুকুলু, কেউ কেউ বলেছেন কুড়কুড়ানি। বাহ! বাংলা সাহিত্য নতুন কিছু শব্দ পেল বটে। এই রুচিশীল নারীগণের মধ্যে আবার প্রান্তিক নারীদের জন্য কাজ করেন এমন নারীরাও আছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্ন করার খায়েস ছিলো, আপনাদের প্রান্তিক নারীগণের মধ্যে যারা প্রেমের নামে প্রতারণার (প্রীতি ইমতিয়াজের ঘটনায় প্রতারণা আছে দাবী করছি না) শিকার হন, যারা মনে করেন নারীর সতীত্বই সব এবং প্রেমিককে তাহার সর্বস্ব দিতে পারেন বিশ্বস্ততার জন্য, তাঁদের শারীরিক প্রেমটাও কি ইস্টুকুলু? অথবা, আপনাদের নিজেদের শারীরিক প্রেমখানিও কি ইস্টুকুলু কিংবা শুধুই কুড়কুড়ানি? খুব জানতে ইচ্ছে হয়, কোনো অসহায় মেয়ে যখন উনার কাছে এসে আশ্রয় চান, সাহায্য চান, তখনো কি তিনি ঐ মেয়েকে এই বলে গালমন্দ করেন যে। “ ইস্টুকুলু করার সময়, কুড়কুড়ানি মেটানোর সময় মনে থাকে না?”

অপ্রীতিকর ঘটনায় একজন স্নেহশীল পিতার একটি চিঠি পাঠক মহলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। বলা বাহুল্য সে চিঠিখানা আমারও ভাল লেগেছে। কন্যার কাছে পিতার পরামর্শ এমনই হওয়া উচিৎ। তবে, পিতার কাছেও প্রশ্ন, উনার কন্যার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটলেও কি তিনি চিঠিটির শুরুটা কথোপথনের মধ্য দিয়ে শুরু করতেন কি না, যে কথোপথনে বেশ চটুল রসাত্মক কিছু শব্দ আছে!

এবার বলি। আমি যখন ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলছি, তখন কে কার সাথে প্রেমে পড়লো, শুয়ে পড়লো, তাদের এই প্রেম, এই শুয়ে পড়া দু’জনের গন্ডি পেরিয়ে তিন, চার কিংবা চৌদ্দজনের গণ্ডিতে গিয়ে ঠেকলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না যতক্ষণ না তা সমাজের অন্য মানুষের কোনো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর যে মূল্যবোধের দাবী আমরা করি, সেসব মূল্যবোধ যে কত ঠুনকো তা চারপাশে তাকালেই বুঝা যায়। ব্যাপারটা এমন নয় যে প্রীতির অপ্রীতিকর ঘটনাই এই পৃথিবীতে প্রথম, তা ঘটছে অহরহ। এখন মনে পড়ছে মুনমুন শারমীনের একটা কথা, “ভাবখানা এমন যে সবাই ফেরেশ!” এটা সবাই স্বীকার করে নিলে, মেনে নিলে সমাজের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ আমরা এমন ভাব ধরি আকাশ থেকে পড়ার।

শেষ করি, মুনমুন শারমীনের লেখার একটা প্যারা দিয়ে, এইদেশে নারীর কাছে তার শরীরই তার সর্বস্ব। শরীর দিয়া তারে সমাজ মাপে। সেও নিজেকে শরীর দিয়াই মাপে। এই মাপামাপির ইম্যাচুরিটি আর আদিমতা থেকে এদেশের নারীরা বাইর হইতে পারবে যেইদিন, সেই দিন সত্যি দিন পাল্টাবে। দিন পাল্টাক। তরুণীরা, প্রীতিরা আরও বেশি বেশি বুড়াভামদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রয়োজনে একেকজন মেনকা হয়ে উঠুক, মেনকা হয়ে গর্বিত হোক। দেখি, বিশ্বামিত্ররা কতদিন ভড়ং ধরে থাকে।


  • ৪১৮২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

পৃথু স্যন্যাল

জার্মান প্রবাসী পৃথু স্যন্যাল আপাদ মস্তক একজন স্বাধীনতাকামী ব্যক্তি, ব্লগার। বর্তমানে নারী'র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ফেসবুকে আমরা