মানুষ কে এতো ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না

শুক্রবার, মার্চ ১, ২০১৯ ৩:৫৮ PM | বিভাগ : ওলো সই


আমাদের ময়মনসিংহের বাসার কাছে যে গীর্জা আছে, সেখানে ভোর ছয়টায় ঘন্টা বাজতো। ঢং ঢং ঢং। আমি চুপ হয়ে বিছানায় শুয়ে সেই গীর্জার আওয়াজ শুনতাম। স্কুল-কলেজের তখন রুটিনটা ছিলো ভোরে ওঠার। ভালো লাগতো না মোটেও। গীর্জার ঘন্টার আওয়াজ টা কেমন যেনো লাগতো, বুকের ভেতর কেমন করতো।

সৈকতের সাথে ফোনে কথা বলছিলাম, নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, আমার মন ভালো না। সৈকত সেই গীর্জার ঘন্টার মতো কানের কাছে বলছে, আপনি লিখবেন, আপনি লিখবেন, আপনি লিখবেন। তারপর আরো কিছুক্ষণ কথা হলো, সৈকত তার আবৃত্তি শোনালো, আমি বললাম, নিজের কবিতাগুলোর সাথে এইসব করবেন না।
হঠাৎ সৈকত বলে উঠলো তার “মারুপ বাই” কক্সবাজারে এসেছে। কথা বলতে বলতে হয়তো ফেসবুকে স্ক্রল করছিলো। আমি সঙ্গম য়িমাম কক্সবাজারে আসছে জানতাম, অনুষ্ঠানের কার্ড পেয়েছিলাম এবং জীবনে প্রথমবার ইচ্ছে করে সংগঠনের কোনো অনুষ্ঠানে যাই নি। আমার খুব খারাপ লেগেছে। আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।
সৈকত বললো, কি হয়েছে, আমি বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলাম এবং কাঁদতে কাঁদতে একটা কথাই বললাম -আমি লিখতে পারছি না।

বাবা আমাকে বলে, একজন লেখক কে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। অনেক সমস্যায় পড়েছি, কিন্তু লেখা বন্ধ করি নি। টুকুর টুকুর করে লিখতাম। আহামরি লিখি না, সাহিত্যে এই লেখার অবদান নাই হয়তো। কিন্তু লিখি। ভালো লাগে। আমার বাবা বলে তুমি মানুষের জন্য লিখবা। একজন লেখক সমাজের প্রতিচ্ছবি, লেখক তার লেখার মাধ্যমে মানুষকে ভাবতে শেখায়।

এই যে ধরেন, যাদের নিয়ে আমি বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, বিমর্ষ, ভুগছি বিষণ্ণতায়, তারা ভয়ংকরভাবে নির্বিকার, তাদের ভেতরে কোনো অনুশোচনা নেই, গ্লানি বোধ নেই, যারা তাদের ব্যাপারে আমার লেখায় পড়েছে তারা বুঝতে পারছে না কি প্রতিক্রিয়া দেবে। কেউ চুপ থাকাকে ভালো মনে করছে, কেউ আমার সাথে বেদনা অনুভব করছে, আমার খোঁজ নিচ্ছে, কেউ এসে খোঁচা মেরে বলছে, বুঝছি, তোমাদের তিন নারীর হিংসার শিকার হইছে ছেলেটা।

তো সেইদিন সঙ্গম য়িমাম ফেসবুকে কভার ফটো চেঞ্জ করলো এবং ক্যাপশনে লিখলো মাই ফ্যামিলি। ছবিতে, মারুপ রছূল, এবং তার মাতা-পিতা-ভ্রাতা। তাদের সম্পর্কটা যেহেতু চ্যালেঞ্জিং, মানে মারুপ রছূলের আম্মুর চাইতে তিনি বছর দুই তিন এর ছোট হবেন, তাই মাই ফ্যামিলি লেখাতে আসলে কিছু বুঝা যায় না, মনে হয় তিনিও বোধ হয় মারুপকে তার ছেলেই মনে করেন। এইটা আমাদের সোসাইটির হাজার বছরের চিন্তা, যা আমিও ধারণ করি, এবং এই ট্যাবু ভেতরে ছিলো বলেই আমি ভাবতে পারিনি নি, যে এই ফ্যামিলি, পুত্রসম ভাবা ফ্যামিলি না। তিনি মারুপ রছূলকে তার স্বামী মনে করেন। যদি লেখা থাকতো ইন এ রিলেশনশিপ যেটা আজকালকার বহু মানুষ করে, তাহলে সুবিধা হতো। আমার না শুধু আরো বহু বহু মানুষের লাভ হতো।

সঙ্গম য়িমাম আমাকে ফ্রেন্ড রিকু পাঠিয়ে আমার ম্যাসেঞ্জারে তার আর মারুপ রছূলের একটি মোটামুটি ঘনিষ্ট ছবি দিয়ে বললেন, “তোমার ভালোবাসার মানুষ, আমার ঘরে”। আমি খুবই আশ্চর্য হলাম, যে তিনি এইসব কেনো করছেন। তার যদি মারুপের সাথে কিছু থেকে থাকে সেইটা তার আর মারুপের ব্যাপার। মেরে ইনবক্স মে, তুমহারা ক্যায়া কাম হ্যাঁয়।

আর এই ছ্যাড়া যদি আমার ভালোবাসার মানুষ হয়, তাইলে সে তুমার ঘরে কি করে? আর সে যদি তুমার ঘরের লোক হয়, তাইলে আমার ভালোবাসার মানুষ ক্যামনে হয়?

তারপর তিনি লিখলেন, মারুপের সাথে "আমার স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক, এইটা আমার তার পরিবার, আমার বাবা মা, ছেলে সবাই জানে।“

ও রিয়েলি! ব্যাপারটা দারুণ, সো ইউ আর ভেরি চার্মিং ল্যাডি, গর্জিয়াস, খুব সুন্দর শাড়ি পরেন আপনি, বড় লাল টিপ দেন, মানুষ আপনাকে দেখলেই আদর আদর করে, আপনি একটা সংগঠনকে নেতৃত্ব দেন, সো হোয়াই ডোন্ট ইউ ইউজ ইওর গাটস এন্ড, পুট ইট অন ফেসবুক?

মারুপ রছূল কে নিয়া তো আপনি হাগতে মুততে, নানান স্ট্যাটাস, ছবি, আরো কি কি পোস্ট দেন, এইটা বাদ রাখছেন কেনো? আপনাদের চ্যালেঞ্জিং রিলেশনশিপ দেইখা তো মানুষ কনফিউজড হইয়া যায়।

তারপর তিনি লিখলেন, এই সবই মারুপের খেলা, সে গত পাঁচ বছরে এই রকম করেছে বহুবার। আবার ক্ষমা চেয়েছে, ব্লা ব্লা ব্লা। তারপর তিনি লিখলেন, তুমিও খুব আদরের আশা করি আমি-মারুপ-তুমি, আমরা বন্ধু হয়ে, থাকতে পারবো।

বন্ধু হয়ে থাকা মাই ফুট!

আমি তাকে আর কোনো রিপ্লাই দেই নাই। আমি আসলে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
তারপর সঙ্গম য়িমাম, অনেকবার আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে এবং এক নতুন ধরণের “বন্ধু বন্ধু”, মানসিক অত্যাচার শুরু করেছে। আমার কবিতার নিচে কমেন্ট, আমার লেখার নিচে কমেন্ট, লেখা “ভালো থাকো ছোট্ট বন্ধু”, ও রিয়েলি, আর ইউ ফাকিং কিডিং মি? আমি ছোট্ট বন্ধু? আর মারুপ রছূল, তাইলে কি? এবং প্রতিদিন ফুলের স্টিকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠে শুভ সকাল লেখা ম্যাসেজ, আমার ইনবক্সে। ম্যাসেঞ্জারে কল, দেখা করার জন্য মানসিক চাপ। হাউ ছ্যাচড়া ইজ দিস!

এবং শেষ ইতরামিটা উনি করছেন, গত বছরের রোজার ঈদে, ময়মনসিংহে গিয়েছিলো, আমার মামার বাসায়। আমার খালার সাথে ছবি তুইলা সেইটা আমারে ইনবক্সে পাঠায়। আমার খালারে, মামারে উনি আপা-ভাই ডাকে, তাইলে উনি আমার সাংগঠনিক খালা লাগে, তাইলে সেই হিসাবে মারুপ রছূল আমার খালু। রিডিকিউলাস!!

মারুপ রে তারা বুকে কইরা রাখছে, কারণ মারুপ খুব ভালো লিখে এবং তারা বিশ্বাস করে এতো কান্ডকীর্তির পড়েও সে খুব ভালো মানুষ। মানুষ?
যান, তারে সুলতান সুলেমান বানাইয়া, নিজে হুররম সুলতাম সাইজা তার হেরেম গরম করেন গা।

মানুষ! মানুষ শব্দটার মানে বোঝেন আপনারা?

মানুষ নিয়ে ভাস্কর চৌধুরি লিখেছিলেন,
মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন।


  • ৩০১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা