স্বাগতম পিরিয়ড

বুধবার, মে ২৯, ২০১৯ ২:৪৩ AM | বিভাগ : ওলো সই


আমার যখন পিরিয়ড শুরু হয়, আমি মোটামুটি বড়ো। ক্লাস এইটে পড়ি। আমার সহপাঠীদের মধ্যে অনেকেই এই দিকে আমার সিনিয়র। ক্লাস ফাইভ থেকেই অনেকের পিরিয়ড শুরু হয়ে গেছে। ক্লাস সেভেন এর গার্হস্থ্য অর্থনীতির বই-এ, যে চ্যাপ্টারটা বাসায় গিয়ে পড়তে বলেছিলো ম্যাডাম সেই ঋতুস্রাব নিয়েই সচেতনতার জন্য, আজ world's Menstruation Hygiene day.

আমি যখন ক্লাস এইটে, আমার পিরিয়ড হচ্ছে না কেনো, এই নিয়ে আমার মা কে প্রশ্ন করলাম। আমার মা বিব্রত হলেন। তারপর বললেন যে হবে, চিন্তা করো না। না হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।

তো বেশ কয়েকদিন পর আমার পিরিয়ড শুরু হলো। সেই দিন কোন একটা ক্লাস টেস্ট ছিলো এবং সকাল থেকেই আমার খুব পেট ব্যথা করছিলো। আমি জানতাম কী কী করতে হবে। বলা চলে বরণ ডালা সাজিয়ে রাখার মতো আমি কাপড় প্যান্টি সাজিয়ে রেখেছিলাম। এইদিক থেকে আর কারো পিরিয়ডের প্রথম দিনের সাথে আমার অভিজ্ঞতার এখনো মিল খুঁজে পাইনি।

ক্লাসে পরীক্ষার সময় বুঝতে পারছিলাম, নার্ভাস ছিলাম, কারণ কাপড়ে দাগ লেগে যেতে পারে। আর একটা কেমন যেনো উত্তেজনা। এই সেই কাহিনী? যার জন্য গোপন গোপন কথা, ফিসফাস, হাসাহাসি, একে ওকে চিমটি দেয়া, নানান কোড দিয়ে ডাকা, দাগ ঢেকে রাখার কৌশল! এই সেই কাহিনী যেটা হয়ে যাওয়ার পর আমি আর আমি থাকবো না, নারী হয়ে যাবো, বড় হয়ে যাবো। কোনো ছেলে একটু ছুঁয়ে দিলেই আমার বাচ্চা হয়ে যাবে!

বাসায় এসে রুমের দরজা বন্ধ করে রক্ত মাখা কাপড়টা দেখলাম, এই রক্তকে আমার চেনা জানা সবাই বলেছে শরীরের দূষিত রক্ত। আমি কাপড়টা আগ্রহ নিয়ে দেখলাম, নিজের শরীরের এই পরিবর্তন কে আমি স্বাগতম জানালাম।

আমি দেখলাম, এই নিয়ে আমার মা আমার সাথে কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছে। আমাকে বোঝাচ্ছে আমার বাড়ির সাহায্যকারী, যে নিজের নামই লিখতে পারে না। সে শিখাচ্ছে, রক্ত দিয়ে তিনটা দাগ দিলে পিরিয়ড তিন দিনে ভালো হয়ে যায়। সে শিখাচ্ছে পিরিয়ড হলে সকল ধর্মীয় কাজ কারবার থেকে দূরে থাকতে হয় ইত্যাদি।

আমার মা খালা ফুফুরা যথেষ্ট প্রগ্রেসিভ, কিন্তু তারপরও, নানান বিষয়ে তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ মাত্রই সীমাবদ্ধ। বেশি কিছু তাদের বলতে পারি না, কারণ বললেই... এক্কেরে বেশি নারীবাদী হয়া গেছস গা... তোরে ন্যাংটা দেখছি, পালছি... ইত্যাদি বাক্যবাণ ছুটে আসে।

স্কুলে কো এডুকেশন, একটা নিষিদ্ধ বিষয় ছিলো। আমাদের শিক্ষকরা ছেলে মেয়েদের প্রেম ঘটিত ব্যাপার স্যাপার আটকানোর জন্য যত পরিশ্রম করতেন, তাদের উচিৎ ছিলো, সেই পরিশ্রম জীবন সম্পর্কিত, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞান গুলো সুন্দর করে ক্লাসে বোঝানোতে ব্যয় করা।

পিরিয়ড নিয়ে হাসাহাসির শিকার একবার হয়েছিলাম। প্যাড সম্ভবত লিক হয়ে গিয়েছিলো বা সরে গিয়েছিলো। প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে আমার সহপাঠীর মা বলল, জামায় দাগ লেগে আছে। আমি খুবই বিব্রত, কারণ সবাই আমাকে নিয়ে বিব্রত। আমি কোনায় দাঁড়িয়ে আছি, স্যার বারবার বলছে এই তুই বসিস না কেন? আমার সহপাঠীরা আমাকে দেখে হাসছে। একজন আবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এই নে জায়গা ছেড়ে দিলাম, বস।

আমি কোনমতে বাসায় চলে আসলাম। রিকশায় আসার পথে কেঁদেছিলাম।


  • ৩৮৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

প্রমা ইসরাত

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

ফেসবুকে আমরা