লীনা হাসিনা হক

উন্নয়ন কর্মী

পূর্ব আফ্রিকার ডায়রী -৪

অফিস থেকে প্রায়ই সন্ধ্যা উতরে বা সন্ধ্যার মুখে মুখে বাড়িতে ফিরে আর হাঁটতে যাওয়া হয়ে উঠে না। আলো আঁধারি নির্জন রাস্তায় নিরাপত্তার অভাব  একটা বড় বিষয় আর আলসেমির কথা না হয় নাইই বললাম। আগের বাড়ি বদলে এই নূতন জায়গায় এসেছি প্রায় মাস পাঁচেক। যে এস্টেটে থাকি সেটা বেশ  বড়, দৈর্ঘ্যে প্রস্থে সমান সমান আধা কিলোমিটার হবে, আটটা ব্লকে ষাটটি ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট গুলো বেশ আলোহাওয়াময়, চারতলায় টপ ফ্লোরে আমার বারান্দা আর শোবার ঘর থেকে লেক ভিক্টোরিয়ার খানিক দেখা যায়। সুইমিংপুল আর জিমসহ স্বাস্থ্য ঠিক রাখার  সব সুবিধাই আছে এখানে, এমনকি হাঁটার জন্য বাইরের মাঠে না গেলেও হয়, বিশাল চত্বর আর পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামা ড্রাইভওয়ে ধরে কয়েক চক্কর দিলেই প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যায়। প্রায়ই  পিঠের ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ি, ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়ম করে হাঁটতে বলেন! কেবল চরম অলস আমারই একা একা হাঁটার তাগিদটাই কম। হাঁটার সঙ্গীর বড্ড অভাব এই বিশাল বসতিতে। এখানে প্রায় আশি শতাংশ মানুষ বিদেশি, সাদাই বেশিরভাগ, টার্কিশ,  চাইনিজ, ইথিওপিয়ান আছে। হাতে গোনা কালো মানুষদের মধ্যে দেশী আরো কম, আর সবেধন নীলমণি বাদামি চামড়া আমি।

আমার আগের বাড়িকে মিস করি খুব, টার্কিশরা  বেশ মিশুকে ছিলো, খাবার দাবারও দিতো আমাকে  অনেক, কয়েকজনের সাথে রাতে খাবার পরে হাঁটতে  বের হতাম। এই এস্টেটে কেউ তেমন কারো সাথে মিশে না। আমি একদিন আমার পাশের ফ্ল্যাটের জার্মান প্রতিবেশীর সাথে আলাপ করে এলাম, ওই পর্যন্তই।  তিনতলার উগান্ডান প্রতিবেশী ডাক্তার দম্পতি, স্বামীটি সার্জন, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করেছেন পন্ডিচেরী থেকে, স্ত্রী শিশু বিশেষজ্ঞ, চমৎকার একটি মেয়ে আছে তাঁদের, সাড়ে চার বছর বয়সী শিশুটি, কিন্তলী  বেণি করা চুল, বড় বড় স্বচ্ছ চোখ আর ফোলানো গালে যেন একটা জীবন্ত পুতুল। প্রথম কয়েকদিন আসাযাওয়া হলো, উগান্ডান কফি আর বাংলাদেশি চা পান হলো, এখন শুধু প্রতিদিন ভোরবেলা মেয়েটিকে স্কুল বাসে উঠিয়ে দেয়ার সময় ছাড়া আর সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। বেশি রাত জেগে থাকলে কখনো ব্যস্ত সার্জন  স্বামীটির কাজ সেরে ঘরে ফেরার শব্দ টের পাওয়া যায়। সাঁতার কাটতে গিয়ে পরিচিত হয়েছিলাম  আর্জেন্টাইন পরিবারের সাথে, বাংলাদেশের নাম ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশি ফুটবল প্রেমিক যারা আর্জেন্টিনার জন্য পতাকা বানায়, ম্যারাডোনার জন্য  বাংলাদেশিদের এই পাগলপ্রায় ভালোবাসা তাদেরকে  বিস্মিত করে, আমি ফুটবলপ্রেমী নই বললে খানিক হতাশ দেখায় তাদের। ব্যস্ততাময় জীবন সবার,  রবিবার দুপুরে সুইমিংপুলে গেলে তাদের দেখা পাওয়া যায়, বাসায় চা খাওয়ার নেমতন্ন করি একে  অপরকে, ব্যস ওখানেই শেষ। 

কিছুদিন আগে পিঠের ব্যথা এমন বাড়ল যে  হাসপাতালের শরণাপন্ন, এইবার নিজের তাগিদেই হাঁটা  শুরু করলাম। একলা একলা হাঁটা এমন বিরক্তি  লাগে, আমি কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনে  হাঁটার চেষ্টা করি, কিছুতেই ভালো লাগে না, দশ  মিনিট হেঁটেই সমানে ঘড়ি দেখা শুরু করি। আমার বিল্ডিং এর সামনে রেলিং দেয়া চত্বরে গাড়ি রাখার  জায়গা, লম্বা জায়গাটা শেষ হয়েছে পাহাড়ের ঢালুতে,  পূবমুখী কোনাটায় দাঁড়ালে পুরো নামাসুবা ভ্যালি  চোখের সামনে বিস্তৃত সবুজ, দূরে দুই পাহাড়ের মাঝে  দিয়ে লেক ভিক্টোরিয়া ঝিলিক  দেয়। হাঁটা চাইতে সেখানে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে দেখাই আমার প্রধান আকর্ষণ।

একদিন হেঁটে ফেরত আসছি, সন্ধ্যা নামছে, ভ্যালি পেরিয়ে পাহাড়ের ঢালের লোকালয়ে বাতিগুলি জ্বলে  উঠছে, একজন আনমনে দাঁড়িয়ে সেই কোনাটাতে, তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেট জোনাকির মতন জ্বলছে নিভছে। আমি কাছাকাছি যেতেই আমার দিকে মুখ ফিরালে ভারি চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে তার বড় বড় চোখ আমাকে দেখে। কদম ছাঁট চুলের নিচে কেমন অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভরা সেই চোখের দৃষ্টি আমাকে যেন চুম্বকের মতন টেনে নিলো। হ্যালো বলে পাশে দাঁড়াই। সে আবছা হেসে বলে, এ জায়গাটা তোমার প্রিয় আমি লক্ষ্য করেছি। আমি এখুনি চলে যাবো, তুমি দাঁড়াও তোমার জায়গায়। আমি হাসি, প্রতিদিন দাঁড়াই বলে জায়গাটা আমার হয়ে যায় নাই, তুমি থাক যতক্ষণ তোমার মন চায়। ‘আমি মিশেল’ বলে করমর্দনের জন্য বাড়ানো তার হাত ধরি, অদ্ভুত এক তপ্ততা আমার হাতের তালু দিয়ে যেন ছড়িয়ে যায়। ননআফ্রিকান খানিক ব্রিটিশ উচ্চারণে জানায় তারা আমার পাশের বিল্ডিংএর নীচের তলায় থাকে। বেসিক্যালি তার মা বাবা থাকেন। সে বোগলবি বলে শহরের মধ্যে একটা জায়গায় থাকে, এখানে মাঝে মাঝে থাকতে আসে, এই জায়গার নির্জনতা তার বড্ড প্রিয়। হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়ায় নারীটি। আমি যথারীতি আমার বাংলাদেশী পরিচয় দিতেই সে বলে, আমিও তাই ভাবছিলাম  যে তোমার উচ্চারণ ভারতীয় নয়। হেসে ফেলি আমি।  মিশেলের বয়স আমার মতন হবে। নিরাভরণ অবয়ব, আফ্রিকান নারীদের জন্য কেশসজ্জার অনুপস্থিতি এক অসম্ভব ব্যাপার, কোনো রকম ডিজাইনড ব্রেইডছাড়া  তার কদম ছাঁটে দু’একটা সাদা চুল উঁকি দেয়। পরনে  ধূসর ট্র্যাক স্যুটের ট্রাউজারের উপরে একটা লাল টপস। দাপ্তরিক গাড়িতে যাতায়াত বলে আমার অফিসের পরিচয় দিতে হয় না, কেবল কি কাজ করি তা একটু জানতে চায়। পরিবার আমার সাথে থাকে না সেটাও আর নূতন করে বলতে হয় না। মিশেল লন্ডনের বাসিন্দা প্রায় কুড়ি বছর, মাঝে মাঝে দেশে আসতো বেড়াতে, তবে এখন থেকে ঠিক করেছে দেশেই থাকবে, লন্ডনে যাবে বছরে একবার। গত দুইমাস ধরে সে দেশেই আছে। বোনের সাথে থাকছে বেশিরভাগ সময়, এখানে মাঝে মাঝে আসে। আলাপ জমার আগেই  শেষ করতে হল টিপটিপ বৃষ্টি ঝরতে শুরু করাতে।  আমরা বাই বলে চলে এলাম, খেয়াল করলাম মিশেল পা টেনে টেনে হাঁটছে।

পরের দিন হাঁটার জন্য নিচে নেমে বিল্ডিঙের সামনে দিয়ে এক চক্কর দিতে না দিতেই দেখি মিশেল বের হয়ে আসছে তাদের বিল্ডিং থেকে। পরস্পরের  কুশল  জিজ্ঞাসা করে হাঁটা শুরু করি দু’জনে। সে নিজে  থেকেই বলে তার পায়ের নার্ভে সমস্যার কারণে সে একটু ধীরে হাঁটে, আমি যেন আমার স্বাভাবিক  স্পিডেই হাঁটি, হেসে বলি, আমি চরম ফাঁকিবাজ হাঁটুরে  তাই ধীরে হাঁটা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই। হাঁটতে হাঁটতে গল্প করি আমরা, নিজেদের ফোন  নম্বর বিনিময় করি। তার পায়ের নার্ভের সমস্যা, আমার বেগতিক পিঠের ব্যথার কথাবার্তা ছাড়িয়ে আমরা উগান্ডার রাজনীতি, ব্রেক্সিট, ডলার পাউন্ডের  এক্সচেঞ্জ রেইট, ভালো রেস্টুরেন্ট, জার্মান ফিজিওথেরাপিস্টের প্রতি সিটিং এর ফিস সবই আলাপ করে ফেলি, অবাক হয়ে দেখি কখন যেন একঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তাকে বাসার সামনে বিদায় দিয়ে আমি খুশি মনে বাসায় ফিরি, যাক  হাঁটার একজন সঙ্গী  পাওয়া গেছে।

এর পরের কিছুদিনে কখন যে আমরা পরস্পরেরর নৈকট্যে চলে এসেছি, সিগারেট তার স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি, মিষ্টি খাবার আমার জন্য প্রায় বিষের মতন, মেনোপোজ সম্পর্কিত নানা শারীরিক সমস্যা, আমার সন্তানদের পড়ালেখা, আমার ডিভোর্সড একাকি জীবন, তার পার্টনার মারা যাওয়ার পরে গত কুড়ি বছরে  তার জীবনের গতি বদলে যাওয়াসহ আরো গভীর কথা শেয়ার করতে শুরু করেছি। এটা টের পেলাম, যখন একদিন হাঁটা শেষে বিদায় নিতে গিয়ে মিশেল বললো, তুমি কি খেয়াল করেছো আমি গত দেড় মাস ধরে এখানেই থাকছি। তাইতো, সে তো এর মধ্যে আর  বোনের বাড়িতে থাকতে যায় নাই। ধন্যবাদ জানাই। সেই রাতে ঘুমাতে যাবার আগে মিশেলের টেক্সট মেসেজ পাই, আমি আগামীকাল শহরে যাব, কিন্তু  বেলা পড়বার আগেই ফিরে আসবো, তুমি হাঁটা  শুরু করে দিও, আমি জয়েন করবো।

পরের দিন হাঁটা প্রায় শেষ, কতবার যে ঘড়ি  দেখলাম, কিন্তু মিশেলের দেখা নাই। ফোনের বাটন  চাপতে গিয়েও সামলে নেই, হয়তো জরুরি কাজে আটকে গেছে, ডিস্টার্ব করা উচিত হবে না। একলা  একলা কুয়াশামাখা সন্ধ্যা নামা দেখা শেষ করে  সিঁড়িতে পা রেখেছি এমন সময় ফোন বেজে উঠলো, ওপাশে মিশেল, ‘তুমি কি আছো না বাসায় ফেরত গেছো?’ ঠিক করলাম দু’জনেই ফ্রেশ হয়ে ডিনার শেষে আরেক দফা বের হবো। সাদা জমিনে নীল কালো ফুল তোলা ফ্রকে তাকে আজ খুব মিষ্টি  লাগছে, কিশোরী মেয়ে যেন। বলাতে শব্দ করে হাসলো, হাসলে তার গালে টোল পড়ে, ঝকঝকে  সাদা দাঁতে সেই টোল পড়া হাসির সাথে চোখের বিষণ্ণতা মানায় না। সে কথা বলাতে মিশেল আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, কি জানি কেনো আমার মনে হলো, চোখের মনির বিষণ্ণতায় লুকিয়ে আছে যে কথা তা হয়তো শেয়ার করতে চায় সে। বলি, মিশেল, চলো  বাসায়, বেলকনিতে বসে বাংলাদেশি চায়ে চুমুক দিতে দিতে গল্প করি। চারতলায় উঠবার সময় হাত ধরি তার, উগান্ডায় এখনো লিফটের চল তেমন নাই, পাঁচ ছয় তলা উঁচু বাড়ি গুলিতে লিফট নাই।

বেলকনিতে বসে খেয়াল করি, আকাশে প্রায় গোল একটা চাঁদ, এত দূর থেকেও লেকের জলে চাঁদের  আলোর ঝিকমিকানি ঠাহর করা যায়। আমার বেলকনি ঘেঁষে লম্বা পাম গাছ ছাদ ছাড়িয়ে উঠেছে, ঠাণ্ডা হাওয়ায় পাম গাছের পাতার সরসরানির সাথে সাথে শরীরও যেন সিরসিরিয়ে উঠে। পাতলা চাদর এনে মিশেলকে দেই, নিজেও একটা জড়িয়ে বসি।  কিছুক্ষণ নিজের কথা প্যাঁচাল পেড়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করি, মিশেল, তোমার পার্টনার এত অল্প বয়সে কি ভাবে মারা গেলেন? কোনো রোগ ব্যাধি? তুমিই  বা আর কাউকে পেলে না? হাতে ধরা লাল সবুজ রঙের আড়ঙের মগটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সে, কিছু বলে না। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সংকোচ বোধ করি। সিগারেট ধরিয়ে আনমনে টানে, তারপরে হঠাৎ  কথা বলতে শুরু করে সে, যেন ঘুমের ঘোরে।  মিশেলের পার্টনারের নাম ছিলো ‘রবিন’, সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল অসম্ভব সুদর্শন আর বেপরোয়া সাহসী সেই মানুষটির সাথে মিশেলের বিয়ে হয় নাই, রবিনের একজন বিবাহিত স্ত্রী ছিলো, কিন্তু রবিন আর মিশেল পরস্পরকে ভালোবেসে একসাথে থাকতো। উগান্ডার সমাজে এভাবে থাকা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়, যদিও আইনগত বা সামাজিক স্বীকৃতি  পাওয়া যায় না এইসব সম্পর্কে। 

মিশেলের চাইতে প্রায় বছর দশেকের বড় ছিলো রবিন। মিশেল এখনো পরিষ্কার মনে করতে পারে  সেই আলো ঝলমলে সন্ধ্যার কথা, তার উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা বাবার সাথে তরুণী মিশেল  প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়েছিলো কোনো সরকারী অনুষ্ঠানে, সেখানেই রবিনের সাথে তার পরিচয়, রবিন তখন ইদি আমিনের বিরুদ্ধে উগান্ডার স্বাধীনতা যুদ্ধে তার  অসম সাহস আর বীরত্বের জন্য বিখ্যাত, বলা যায় তরুণীদের হার্ট থ্রব। ইংল্যান্ড থেকে কলেজ শেষ করে আসা তরুণী মিশেলের মেধা, সুরেলা গলা, নাচের পারদর্শিতা আর কাজল কালো হরিণী চোখের মায়াবী যাদুতে চিতার মতন ক্ষিপ্র যুদ্ধবাজ রবিন তার হৃদয়  সঁপে দিতে দ্বিতীয় চিন্তা করে নাই।

প্রায় আট বছর একসাথে ছিলো তারা। সুখে ছিলো, ভালোবাসায় পূর্ণ  ছিলো, কোনো সন্তান হয় নাই তাদের, সামাজিকভাবে কোনো বাধা ছিলো না কিন্তু  তিনবার মিসক্যারেজের পরে আর গর্ভসঞ্চার হয় নাই  মিশেলের। এ নিয়ে কোনো কমতি বোধ ছিলো না  তাদের, আইনের বিয়ে হোক আর না হোক, উগান্ডাতে  কোনো নারী পুরুষ একসাথে থাকলে আর তাদের  গোটা চারেক সন্তানাদি না হলে সমাজে সন্মান রক্ষা হয় না। কিন্তু রবিন বা মিশেল এতে বিচলিত ছিলো না মোটেও। দিন কেটে যাচ্ছিলো আনন্দে, সংসার করে, বেড়িয়ে। এর মধ্যে রবিনও সরকারী খরচে  ইংল্যান্ড থেকে সমরবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে এসেছে।

কিশোর  বয়সে  যুদ্ধে গিয়েছিলো রবিন, প্রাতিষ্ঠানিক  লেখাপড়া করার সুযোগ হয় নাই তার, আরও হাজার হাজার ইউপিডিএফ সৈনিকের মতন। রবিন যখন ইংল্যান্ডে পড়ছিলো সেই দুই বছর যেন প্রজাপতির ডানায় ভর করে উড়ে গিয়েছিলো। ১৯৯৮ সালের  সেপ্টেম্বরের এক মেঘলা ভোরে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে রবিন রওয়ানা হলো পাশের দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর উদ্দেশ্যে। সেখানে তার বড় ভাই উগান্ডা সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ, কঙ্গোর বিদ্রোহীদের দমনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সন্ধার মধ্যে ফেরত আসার কথা বলে বিদায় নিয়ে যায় রবিন। এন্টেবে এয়ারপোর্ট থেকে ছয় সীটের হেলিকপ্টারে যাত্রা শুরু। ঘণ্টা কয়েক পরে খবর আসে রবিনকে বহনকারী হেলিকপ্টারটির সাথে বিমানবন্দরের রাডারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন  হয়ে গেছে। মিশেল তখন শহরের পাঁচ তারা হোটেলে তার ক্র্যাফট শপে নূতন আসা হ্যান্ডিক্রাফটের চালান গুছানোর কাজে তদারকি করছিলো। তেমন চিন্তিত হলো না, নিশ্চিত জানে যে সেনাবাহিনী ঠিকঠাক সংযোগ স্থাপন করে ফেলবে তাদের সব থেকে চৌকস অফিসারকে বহনকারী হেলিকপ্টারের সাথে। রাতে ক্যান্ডেললাইট ডিনারে যাওয়ার কথা নূতন তৈরি আগা খান গ্রুপের সেরেনা হোটেলে, রবিন না বললেও মিশেল চুপি চুপি জানে যে রবিন সাউথ আফ্রিকা থেকে আংটি কিনে এনে লুকিয়ে রেখেছে। মিশেলের বোনকে বলেছে মিশলেকে না জানাতে, আজই সে মিশেলের অনামিকায় আংটি পড়িয়ে দেবার অনুমতি চাইবে, হাঁটু গেড়ে বসে যদি, তাহলে কি খুব সিনেম্যামটিক হবে ব্যাপারটা? মিশেলের ভাবনায় কেবল কি পোশাক পরবে, সেলুনে গিয়ে চুলের স্টাইল চেঞ্জ করবে কিনা, রবিন চুলে আঁটো বা চুড়ো খোঁপার চাইতে কোমর পর্যন্ত লম্বা কিন্তলি ব্রেইড ভালবাসে। কিছুদিন আগে রবিন বেনিন গিয়েছিলো, সেখান থেকে সুতার কাজ করা জমকালো পার্পল রঙের  সিল্কের গাউন এনেছে, আজ সন্ধ্যায় সেটাই পরবে। সেটার সাথে মিলিয়ে রবিনের জন্যও লাইট পার্পল শার্ট এনেছিল সেই শার্ট বের করে ইস্ত্রি করে রাখতে হবে।  কর্মচারী মেয়েদেরকে তাড়া দেয় মিশেল।

প্রায় এক সপ্তাহ পরে রবিনের মৃতদেহ ফোরট পোর্টালের কাছে রোয়েঞ্জিরি পাহাড়ের ঢালে নদীর চড়া  থেকে উদ্ধার করা হয়। হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনায় পড়েছিলো বলে জানা যায়, যদিও দুর্ঘটনার জায়গাটি  অরিজিনাল যাত্রাপথ থেকে একদম উল্টোদিকে। 

যখন নিজের মধ্যে ফেরে মিশেল ততদিনে মাস পেরিয়ে গেছে, নানারকম কানাঘুষা শোনা যায় যে, রবিন নাকি আসলে কঙ্গো থেকে সোনা আর হীরার চালান আনতে গেছিলো। ওই সময়ে উগান্ডার সরকারী সেনা কর্মকর্তারা কঙ্গো থেকে অঢেল সোনা আর ডায়মন্ডের কারবার করেছিলো বলে শোনা যায়। কেবলমাত্র সেনাবাহিনীর বেতনের পয়সায় যে রবিনের শানশওকতের জীবনযাত্রা সম্ভব ছিলো না সেটুকু অবশ্য মিশেল ভালই বুঝতে পারতো। কিন্তু সেসব তো উগান্ডার সমাজের অংশ, সেনাবাহিনী নানা ধরনের  ব্যবসা সুবিধা পাবে, ব্যবসার কমিশন পাবে এত মামুলি ব্যাপার। সেই হেলিকপ্টারে একজন ইসরায়েলি  আর একজন ভারতীয় রত্ন ব্যবসায়ী ছিলো। খারাপ  আবহাওয়ার কারণে কেনিয়ান পাইলট যাত্রা স্থগিত করে ফিরে আসতে চেয়েছিলো, রবিন নাকি পাইলটের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে উড়তে বাধ্য করে।  অবশ্য সবই শোনাকথা, কারণ কপ্টারটা দুইভাগ হয়ে গেছিলো আর কোনো যাত্রীই জীবিত ছিলো না। যদিও হেলিকপ্টার রাডার থেকে বিছিন্ন কিভাবে হলো, বা কেনোই বা রোয়েঞ্জিরি পর্বতের দুর্গম জঙ্গলে গিয়ে পড়লো, এদিকে রবিনের শরীরে নাকি বুলেটের আঘাত ছিলো অথচ তার ছায়াসঙ্গী পিস্তলটি লোডেড অবস্থায় কোমরের হোলস্টারেই আটকানো পাওয়া যায়। কোনো  ময়নাতদন্ত হয় নাই। রবিনের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট নাকি বলেছিলেন,  তাঁর সাহসী চিতা রবিন স্বভাবে বেপরোয়াও ছিলো। তার মানে কি তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন রবিনের বেপরোয়া আচরণ তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী! পুরো দুর্ঘটনাটাই রহস্যে ঘেরা রইলো কুড়ি বছর পরেও।

রবিনের মৃত্যুর কয়েকমাস পরে মিশেল লন্ডনে ফিরে যায়। ‘আই ওয়াজ সো বোরড, কুড নট কন্সেন্ট্রেট  অন এনিথিং, সোল্ড মাই বিজনেস ইন কাম্পালা এন্ড ফ্লিউ টু লন্ডন। বাট আই কুড নট সেটল ইন লন্ডন আইদার, হ্যাড টু গো ফর আ সাইক্রিয়াট্রিক ট্রিটমেনট, লাস্ট টুয়েন্টি ইয়ারস আই আম জাস্ট ট্রায়িং টু স্টেবল মাই মাইন্ড!’ তার হরিণী চোখে জল কিনা আমি ঠিক বুঝতে পারি না, কেবল হাঁটু মুড়ে কোলকুঁজো হয়ে বসা মিশেলকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করি।

এরপরে কয়েকজনের সাথে সম্পর্কের সূচনা হলেও কোনোটাই পরিপূর্ণতা পায় নাই। পাবেই বা কিভাবে, ক্যান্ডল লাইট ডিনারে যাবে বলে কথা দিয়েছিলো যে দুর্দান্ত সাহসী সৈনিক, তার অপেক্ষা যে মিশেল এখনো করে। পুরনো সবকিছু ছেড়ে গেলেও সেই পোশাকটা আর রবিনের লুকিয়ে রাখা আংটিটা আজো সাথেই রাখে মিশেল। কি জানি, যদি কোনো বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় তার প্রেমিক এসে উপস্থিত হয়ে বলে, মিশা  ডার্লিং, লেটস গো! ও মাই লর্ড! ইউ আর লুকিং সো গর্জাস সুইট হার্ট! আহ! মেন ইন দ্যা টাউন উইল বি সো জেলাস!’ বেশ অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলি না, বলার থাকেই বা কি! এক সময় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলি, চলো, বাসায় দিয়ে আসি। আবছা শোনায় মিশেলের স্বর, ‘জানো, যত কথা আমি আজ তোমাকে বললাম, এই প্রায় দুই যুগে কারোকেই এমন নিঃসংকোচে বলতে পারি নি। চিনিও তো না তোমাকে তেমন, তুমি কে গো বলোতো?’ মিশেলের হাত ধরি, এত ঠাণ্ডা হাওয়ায় বসে আছি প্রায় ঘণ্টা দুয়েক, তারপরেও তপ্ত তার হাত, এই তপ্ততা কি তার অকালে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার জন্য? সেই ভালোবাসার কোনো আইনগত বা সামাজিক স্বীকৃতিও তো ছিলো না! এক জীবন এই আবছায়া নিয়েই মিশেল কাটিয়ে দিলো। 

পুরো  চত্বর  শুনশান নির্জন, চাঁদের আলো যেনো আর তীব্র  হয়েছে, দু’জনে হেঁটে তার বাসার সামনে আসি, বাসায় ঢুকতে ঢুকতে মিশেল ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, ‘ওহো, তোমাকে সরি বলতে ভুলে গেছি বিকেলে দেরী করার জন্য। আসলে কাজ সেরে আমি রবিনের সমাধিতে গিয়েছিলাম। ওর সাথে কথা বলতে বলতেই দেরী  হয়ে গেলো! তোমার কথাও বললাম!” পা টেনে টেনে বাসায় ঢুকে যায় মিশেল আর আমি কেমন যেন ঘোরের ভিতর ডুবতে ডুবতে বাসায় ফিরে আসি।

1521 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।