পুরুষই কেনো কলুর বলদ?

বুধবার, আগস্ট ৫, ২০২০ ১:১৯ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


কলুর বলদ বলে যে প্রবচনটি ব্যবহৃত হয় তার অর্থ করলে কি আমাদের মাথায় একজন বাবা, স্বামী, ছেলে বা এমন কোন পুরুষের ছবি ভাসে না, যিনি তার সংসারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে খেটে মরছেন? যিনি ক্লান্ত, কিন্তু সংসারের চাওয়া পাওয়ার হিসেব থেকে তার নিস্তার নেই। তাকে বউ বাজারের ফর্দ ধরিয়ে দেয়, ইদে পার্বণে শাড়ি, গয়না, সন্তানের সমস্ত খরচ, বাবা-মা পরিজনদের নানা প্রয়োজন তার আয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু, কেনো কলুর বলদ বলতে শুধু পুরুষের ছবিই ভাসে? আর কেনই বা পুরুষকে কলুর বলদ প্রবচন ধারণ করতে হয়? নারী কি উপার্জনক্ষম নয়? সে কি পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের ভার তুলে নিতে পারে না? কেউ বলবেন, কেনো পারবে না, এখন তো অনেকেই করছে! কিন্তু সেই সংখ্যাটা আর তা থেকে ঝরে পড়ার হারটা ঠিক বলতে দেয় না যে নারী পুরুষের সাথে সমানতালে নিজ উপার্জনে এগিয়ে আসছে।

কেনো আসছে না বা আসতে পারছে না তার অনেক রকম কারণ আছে। তবে আমার মতে মূল কারণটি মনস্তাত্ত্বিক, যা সমাজ প্রোথিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর জন্য উপার্জনহীন যে দায়িত্ব নির্ধারিত থাকে তা স্বামীর ভালোবাসা, সন্তান, সংসারের রানী ইত্যাদি সুগার কোটেড ড্রাগে তাকে গেলানো হয়। নারীকে বোঝানো হয় এর বাইরের জীবনের প্রয়োজন নেই কারণ পুরুষ তাকে তার যা প্রয়োজন তা দেবে। নারীও তার সব প্রয়োজনের ভার পুরুষের কাঁধে তুলে দেয় কারণ সমাজ তাই চায়। নারী অকারণ অশান্তি চায় না। কারণ, সে সৃজন করে, লালন করে, সুন্দর রাখতে চায় তার চারপাশ। কিন্তু তার সৃষ্টিশীলতা, মননশীলতা, আপন প্রতিভা লোপ পায় প্রকৃত চর্চার অভাবে। কারণ, নিশাচর বাদুর যেমন অন্ধকারে থাকতে থাকতে আলো সইতে পারে না, নারীও মনুষ্য প্রজাতি হয়েও ভুলে যায় তার জীবনের উদ্দেশ্য। নারী মাত্রই গৃহবাসী, মহলে থাকা মহিলা, রমণযোগ্য রমণী, অমুকের মিসেস,  তমুকের মা, এই পরিচয়েই সে তার ছক টেনে বেশ জাঁকিয়ে বসে থাকে। শেকড় গজিয়ে গেলে তো আর ওঠাও যায় না। তাই ভাত-কাপড়ের জন্য অমর্যাদার অনুষ্ঠান করে, অর্থনৈতিক সিকিউরিটির জন্য দেনমোহরে বারগেইন করে, শারীরিক মানসিক দিক কম্প্রোমাইজ করে নব্যবিবাহিত পুরুষকে বিদেশ পাঠিয়ে নারী টিকে থাকে তেলাপোকার মতো। নারী বাইরে কাজে যেতে চায় না। গেলেও তার সময় বাঁধা থাকে পুরুষের হাতেই। যারা বাইরে কাজ করেন তাঁদের মনের ভেতর অপরাধবোধের এক কণা বালি সমাজ ঢুকিয়ে দেয়। তাই কোনো একটা পরিবর্তনে নারী বেশীদিন বাইরে কাজ করতে পারে না। আর নারীর নিজ যোগ্যতার কাজ খুঁজে নেওয়াও দুষ্কর। তার পড়াশোনাতেই তো কত বাঁধা!

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে মেয়েরা সামান্য এগিয়ে আছে। মাধ্যমিক স্তরে মেয়ে আরেকটু বেড়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে মেয়েদের পেছানো শুরু হচ্ছে, তবে তখনো ছেলে-মেয়ে প্রায় সমান। তারপরই উচ্চশিক্ষা আর পেশাগত শিক্ষার স্তরে নারীর সংখ্যা হঠাৎ করে পড়ে যাচ্ছে। ব্যানবেইসের সর্বশেষ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। শিক্ষিত বেকারত্বের হারেও পুরুষের তুলনায় নারী বেশি। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক নারী যোগ্যতা সত্ত্বেও শ্রমবাজারে আসতে পারছে না। অনেকে পারিবারিক চাপে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সন্তান ধারণের জন্য শ্রমবাজার থেকে সরে যাচ্ছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এখনও বাল্যবিয়ের হার ৫৯ শতাংশ এবং ৩৩ শতাংশ নারী ১৯ বছর বয়সের আগে সন্তান জন্মদান করছে, যা শুধু নারীদের শ্রমবাজার থেকে দূরে ঠেলছে তা নয়, একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতাও বাড়িয়ে দিতে পারে। একজন পুরুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য পরিবার ও সমাজ যতটুকু সমর্থন করে, একজন নারীকে করে না। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা দাবি করে যে, দেশে উদ্যোক্তাদের মাত্র ১০ শতাংশ নারী।

এদেশে আদর্শ নারীর যে চিত্র সমাজে প্রচলিত সে হিসেবে নারী ঘরে থাকবে, স্বামী সেবা ও সন্তান ধারণ ও পালন করবে, স্বামীর ইনকামকে নিজের অধিকার মনে করবে এটাই রীতি। সেই জীবন একজন নারী নিজ ইচ্ছায় কাটাতেই পারেন। কিন্তু অর্থ উপার্জনের এই একচ্ছত্র ভার কেনো পুরুষ তুলে নেয় কাঁধে জানেন বোধকরি। তার যত কষ্টই হোক, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তাকে নারীকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়, তার পাতে মাছের মাথা কি মুরগীর রান তুলে দেয়, সে বাইরে থেকে এসে সারাদিন বাসায় মোবাইল টিপলেও সব কাজ শেষ করার জন্য নারীরা থাকেই। তো, যখন নারী নিজের চলার মতো কাজে উপার্জন শুরু করে তখন পুরুষের আরাম আয়েশে একটু টান পড়ে। নারী তখন দেখে ঘরে বাইরে তাকেই বেশী কাজ করতে হয়, পুরুষ বাইরে কাজ শেষে বাড়ী এসে চোটপাট করে। সমস্যা হয় তখনই। তাই শান্তিকামী নারী একটা পর্যায়ে বাইরের উৎপাদনশীল বা উপার্জনকারী কাজটি ছেড়ে দেয়। এর মূলে সেই সমাজপ্রোথিত আদর্শ নারীর অবয়ব লুক্কায়িত থাকে। নারীর মূল প্রতিবন্ধক তাই সে নিজেই হয়।  

অথচ, এই প্রবল অর্থনৈতিক মন্দার সময়, একটি সুস্থ সুন্দর জীবন প্রত্যাশায় যে যার যোগ্যতার সঠিক প্রয়োগে আনতে পারেন সুন্দর কোনো পরিবর্তন। পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম থেকেই প্রভু আর সেবাদাসের পার্থক্য শিখছে! সেই লিগ্যাসী পরবর্তীতে চর্চা করবে নিশ্চয়ই! সুতরাং, পুরুষকে মুক্তি দিন কলুর বলদ হওয়ার দায় থেকে। হে নারী, নিজের শক্তিতে নিজের তাগিদে জ্বলে উঠুন। প্রতিবন্ধকতা হাজার হোক, বাঘিনীর মতো এবার আপনি মাঠে নামুন!


  • ৩৫৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নায়না শাহ্‌রীন চৌধুরী

সঙ্গীত আর লেখালেখি’র সাথে দীর্ঘদিন পথ চলা। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী ও গীতিকবি। কাজ করছেন অডিও শিল্প, মঞ্চ ও ফিল্মেও। এ পর্যন্ত তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। জীবিকা নির্বাহে জ্বালানী ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

ফেসবুকে আমরা