সীতা মার্কা ভুত মাথা থিকা বের করতে হবে

রবিবার, মে ১৯, ২০১৯ ৪:৫৭ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


ছোটবেলায় ইন্ডিয়া দূরদর্শনে দেখা একটা নাটকের কথা মনে পরে। নাম এতো মনে নেই। সন্ধ্যার পর প্রচারিত হতো। তখন ডিশ লাইন আসেনি গ্রামে। এমনিতেই ইন্ডিয়া দূরদর্শন আসতো, এতো ক্লিয়ার না। সন্ধ্যার পরই মা কাকীরা ওই নাটক দেখতে বসে যেতো। যতোদূর মনে পরে নাটকের কাহিনী ছিলো এমন, এক নর্তকী দেহপসারিনী রমনী যার নাম ছিলো সম্ভবত লক্ষহীরা। সে এতো সুন্দরী ছিলো যে তার সাথে একরাত্রি যাপন করতে সম্ভবত লক্ষহীরা বা এমন কোন বড় এমাউন্ট লাগতো। তো সেই নাটকের যে নায়িকা তার যিনি স্বামী, সেই স্বামীদেবতার শখ লক্ষহীরা নর্তকীর সাথে রাত্রিযাপনের। স্বামীর সেই ইচ্ছে পূরণের জন্য মহান সেই স্ত্রী প্রানপণ চেষ্টা করতো কি করে সে লক্ষহীরার ব্যবস্থা করবে। যেহেতু পতিদেব ইচ্ছে পোষন করেছেন তা পূরণ করতেই হবে। তা গল্পের গরু না হয় আকাশে ওঠে। কিন্তু ওই নাটক দেখার জন্য রমনীকূল হুমড়ি খেয়ে পড়তো। বিশাল আলোচনা চলতো ওই নায়িকার পতিপ্রেম নিয়ে। মেয়েটা কি ভালো, কি ভালো, স্বামীরে কি ভালোবাসে!

কোনো মেয়ে ভালো না মন্দ তা নির্ধারণ করার একটাই মাপকাঠি সে কতো মারা খাইতে পারে, কতো অত্যাচার অবিচার মেনে নিতে পারে, কতোভাবে কতো স্যাক্রিফাইজ করতে পারে। যে যতো ছাড় দিবে সেই মেয়ে ততো ভালো বউ! আর মজার কথা হইলো এইসব উদ্ভট থিওরি মেয়েদের মাথা দিয়েই আসে।

সেদিন ফেসবুকে একজন এক ভিডিও শেয়ার করেছে, পরকীয়া নিয়ে। এক মহিলা একটা মেয়েকে মারছে ”এই তুই আমার বরের সাথে শুইছিস? তোরে মেরেই ফেলব।” পাশে আরো কয়েকজন দাঁড়ানো। মারতে বাঁধা দিতেছেন। সম্ভবত মহিলার বরও আছে। বরকে উনি কিছু বললেন না। যতো আক্রোশ ওই মেয়ের উপর। যেন ওনার আলাভোলা বরকে ওই মেয়ে ফুঁশলিয়ে পরকীয়া করেছে। পরকীয়া হলে যে বিবাহিত থাকে তারই দায় বেশি, তারই দোষও বেশি কারণ সেই একটা রিলেশন বা প্রতিজ্ঞার ভেতরে থাকে।

ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের ছাড় দেওয়া শেখানো হয়। সব হিন্দু মেয়েরা একেবারে ছোটবেলায় প্রথম যে পৌরাণিক গল্পের চরিত্রের সাথে পরিচিত হয় তা হলো সীতা। সীতার জীবনী, সীতা কতো মহান, সে কতো সতী, সে কি কি স্যাক্রিফাইজ করলো, সে এতো ভালো ছিলো যে শেষ অব্দি মাতা বসুমতী পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে নিয়ে নিলো। মেয়ে হবে সীতার মতো। যে সব সহ্য করবে, মেনে নিবে, অগ্নীপরীক্ষা দিবে। পৌরাণিক গল্পগুলোও কি পুরুষতান্ত্রিক!

যুগে যুগে মেয়েদের কাছেও এই অগ্নিপরীক্ষা আশা করা হয়। তুমি মেয়ে- তোমার আজীবন পদে পদে অগ্নীপরীক্ষা দিতে হবে। আর অগ্নিপরীক্ষা চাইলো যে রাম সে হইলো শৌর্যবান, মহান, আদর্শ স্বামী। কেনো? যে তোমার আর তোমার বাপের ঝামেলার জন্য রাজকুমারী হয়েও বনে গিয়ে থাকলো, তার নিরাপত্তা তুমি দিতে পারো নাই। এরপর সে অশোক বনে দুর্বিষহ জীবন কাটালো। তুমি বানর সৈন্য নিয়ে বিভীষণের সাহায্যে তারে উদ্ধার করে হলে শৌর্যবান মহান। আবার তারে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললে!

সেই সময় যদি সীতা একবার বলে বসতো আমি রামের সাথে যাবো না। তুমি আমার নিরাপত্তা দিতে পারো নাই। যে আমারে জয় করে নিয়ে আসছে সেই রাবনের সাথে আমি থাকবো। তবে কোথায় যেতো রামের শৌর্য? সব সীতার এক ফুৎকারে উড়ে যেতো। কিন্তু তা সে করে নাই। তবু তারেই অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলা সেই রাম শৌর্যবান, মহান রাজা।

এখনও সেই অদ্ভুত “সব মেনে নেওয়া” সীতার গল্প গেলানো হয় মেয়েদের। সীতার মতো হও, মা ধরিত্রীর মতো সর্বংসহা হও। পদে পদে পরীক্ষা দাও। তবেই তুমি ভালো। আমার এক পরিচিত জনেরে তার বর বিয়ের একবছর পর ভার্জিন ছিলো কিনা তার প্রমাণ দিতে কইছিলেন। আমি উনারে বলছিলাম আপনের বররে আগে প্রমাণ নিয়ে আসতে বলেন তার ভর্জিনিটির এরপর আপনারে নিয়ে চিন্তা করতে বলবেন। ওই মেয়ে পরে কি করেছে জানি না। এইসব পরীক্ষা, ভালোত্ব, ছাড় দেওয়া মেনে নেওয়া এইসব খালি মেয়েদের কাছেই আশা করা হয়। যেনো এইগুলা করাই তাদের কাজ। হওয়া উচিৎ উল্টা, এইসব ফালতু পরীক্ষা এক ফুঁতে উড়িয়ে দিয়ে চলা........ সীতা মার্কা ভুত মাথা থেকে বের করা।


  • ৩১৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

পুষ্পিতা মন্ডল

বর্তমানে প্রবাসী পুষ্পিতা বাংলাদেশ সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন।

ফেসবুকে আমরা