গণস্বাস্থ্যের করোনা শনাক্তকরণ কিট এবং আমলাতন্ত্রের নাক কাটা নীতি

সোমবার, এপ্রিল ২৭, ২০২০ ৮:৩৯ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


একেই বলে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করা। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কেউ যে উপস্থিত থাকবেন না, এটা শুক্রবার একাত্তর টেলিভিশনের টক'শোতে আসা অধিদপ্তরের লোকটার কথাবার্তা শুনেই বোঝা গিয়েছিলো। অধিদপ্তরের ওই কর্তাস্থানীয় লোকটার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিলো ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং তার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যেনো সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে নেমেছে।

অবশেষে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট 'জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট' হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অধিদপ্তরের কেউ উপস্থিত না হয়ে যে দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন, তা আমাদের কারোর ভালো লাগবার কোনো কারণ নেই। করোনা যাচাইয়ের সহজ ও সুলভ মূল্যের পদ্ধতিটির আবিষ্কারক ড. বিজন কুমার শীল একজন খাঁটি উদ্ভাবক। তবে নব্বইয়ের দশকে এই উদ্ভাবককে নাকি ব্ল্যাক গোটের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার অপরাধে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো। সাংবাদিক স্বদেশ রায় স্পষ্ট করেই লিখেছেন, 'বিজন সমস্ত বিপদ মাথায় নিয়ে দেশেই থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর এবং তাঁর সন্তানের জীবনের কথা চিন্তা করে আমাদের মতো অনেকেই অনেকটা জোর করে ড. বিজন কুমার শীলকে সিঙ্গাপুরে চলে যেতে রাজি করাই।'

বিজন কুমার শীলের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় নেই। তবে স্বদেশ রায়সহ আরো অনেকের লেখা থেকে জানতে পেরেছি, নব্বইয়ের দশকে তার আবিষ্কৃত ব্ল্যাক গোটের ভ্যাকসিন বাংলাদেশ প্যাটেন্ট করতে পারলে চা রপ্তানি করে যে অর্থ আয় হয় তার থেকে দ্বিগুণ আয় করা যেতো এখন। ড. বিজন ভ্যাকসিনটি প্যাটেন্ট করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন তার সাধ্যমতো। স্বদেশ রায় লিখেছেন, 'নিজের পেশার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সেদিন ড. বিজনের আবিষ্কারের মালিক যাতে বাংলাদেশ হতে পারে তার কিছুটা চেষ্টা করেছিলাম।'

শেষ পর্যন্ত সেই সব ব্যবসায়ী ভ্যাকসিন আমদানি করতে পারলে যাদের মুনাফা হয় এবং রাজনৈতিক চক্রের যারা ওই মুনাফার বখরা পায় তাদের কাছে পরাজিত হয়েছিলো সব চেষ্টা।

করোনাভাইরাস চিহ্নিত করার কিট নিয়েও শুরু হয়েছে পুরোনো রাজনীতি। কিটটি শতভাগ কার্যকর হবে না হয়তো। তবে ব্লাড গ্রুপ যে পদ্ধতিতে চিহ্নিত করা হয় এটা মোটামুটি সে রকমের একটি পদ্ধতি। ১৮ কোটি মানুষের দেশে এমন সহজ একটা পদ্ধতির প্রয়োগ খুবই জরুরি।

২০০৩ সালে যখন সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল তখন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল সিঙ্গাপুর গবেষণাগারে কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে সার্স ভাইরাস দ্রুত নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ‘র‌্যাপিড ডট ব্লট’ পদ্ধতিটি ড. বিজন কুমার শীলের নামে প্যাটেন্ট করা। পরে এটি চীন সরকার কিনে নেয় এবং সফলভাবে সার্স মোকাবেলা করে।

‘র‌্যাপিড ডট ব্লট’ পদ্ধতিতে উদ্ভাবন করা 'জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট'। এই পদ্ধতি উদ্ভাবনে ড. বিজন কুমার শীলের সঙ্গে কাজ করেছেন ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাশেদ জমিরউদ্দিন ও ড. ফিরোজ আহমেদ। আজ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার্স ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) কাছে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট 'জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট' হস্তান্তর করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ওই হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সরকারের কেউ আসেননি।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের তৈরি করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট 'জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট' হস্তান্তর অনুষ্ঠানঃ

ডা. জাফরুল্লাহ ওই অনুষ্ঠানে দুঃখ প্রকাশ করে বলে ফেলেছেন, 'ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিচালক (ডিজি) আমাকে জানিয়েছেন, আজকে তারা আসতে পারবেন না। জানি না, আজকে তারা কেনো আসতে পারলেন না। মন্ত্রীকেও (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) আমরা তিন দিন আগে এই অনুষ্ঠানে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। উত্তর পাইনি। মন্ত্রী এখন অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। হতেই পারে। কারণে-অকারণে অনেক ব্যস্ত আছেন, লেনদেনের ব্যাপারও হয়তো আছে।'

এটাই ডা. জাফরুল্লাহ, মুখ ফসকে অনেক অপ্রিয় সত্য বলে ফেলেন। যাই হোক, মহামহিম আমলারা ডা. জাফরুল্লাহকে শিক্ষা দেওয়ার নাম করে জাতিকে শিক্ষা দিয়ে দেবেন না। আগামীকাল রোববার গণস্বাস্থ্য কিটগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেবে বলে জানিয়েছে। সেগুলো গ্রহণ করে তারা জাতিকে বাধিত করবেন কিনা সংশয় আছে। পত্রিকান্তরে জানা গেছে গণস্বাস্থ্যকে এমন অনুষ্ঠান করতে মানা করা হয়েছিলো। কিট উদ্ভাবনের স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে বলেছিল ওষুধ প্রশাসন। দেখলাম এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষে একটি পত্রিকার সঙ্গে বলা হয়েছে, 'আমরা কেনো যাব? এটা তো অ্যাপ্রুভড কোনো প্রডাক্ট না। তারা আবেদন করবে। তারপর নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।'

আমার বন্ধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহা তানজীম তিতিল গতকাল রাতেই লিখেছিলেন, 'ল্যাংচে চলা মোটা মাথার নীতিনির্ধারকরা ছুতো করে আরো কালক্ষেপণ করতে যাচ্ছেন। এই দেশে যতো বড়ো পদ, ততো বড়ো গাধা না হলে বসা যায় না। সরল অংক জানে না এরা।'

গাধা হলেও তো মন্দের ভালো হয়। ঘোলা করে হলেও জল খায় গাধারা। কিন্তু আমলাতন্ত্র তো হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না নীতিতেই চলে। তাই গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত কিটটা কার্যকর কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখার আগেই নানান তালবাহানা শুরু হয়ে গেছে। কিটটা কার্যকর হলে এটা দেশের জন্য তো বটেই করোনাক্রান্ত পৃথিবীর জন্য মঙ্গল বইয়ে আনবে। কাজেই সেটা ভালো কি মন্দ, সেই পরীক্ষাটা তো করতে হবে আগে। অবশ্য যদি আমরা কম পরীক্ষা এবং কম রোগী দেখানোর নীতি গ্রহণ করি, তাহলে তো বলার কিছু থাকে না।


  • ৪০১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রাজীব নূর

সাংবাদিক