রমা চৌধুরী: যে পায়ে জমা ছিলো অভিমান, যে পা আলোর অভিযাত্রী

রবিবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ ৯:০৪ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


‘পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে প্রাণে না মারলেও আমার আত্মার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে, যার ফলে নেমে এসেছে জীবনে শোচনীয় পরিণতি। আমার দুটি মুক্তিপাগল অবোধ শিশুর সাধ-স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষাভরা জীবন কেড়ে নিয়েছে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম। আমার কাঁধে ঝোলা, খালি পা ও দুঃসহ একাকিত্ব একাত্তরেরই অবদান।’

রমা চৌধুরীর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ একাত্তরের জননী থেকে উদ্ধৃত অংশটুকু নেওয়া।

বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে কয়েকজন বীর নারীর সম্ভ্রমহানির ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তিনি। তিনি তাঁর সর্বস্ব দিয়ে বাংলাদেশটা আমাদের উপহার দিয়েছেন। এ দেশের জন্য তিনি তাঁর সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছেন, উৎসর্গ করেছেন জীবনের অনেক খ্যাতিময় অর্জন। যে জাতীয় পতাকা আজকে আমাদের কাছে, যা নিয়ে আমাদের গর্ব, সেই জাতীয় পতাকার মাঝে অন্তর্নিহিত আছে তাঁর গল্প।

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা রোহিনী চৌধুরীকে হারান। মা মোতিময়ী চৌধুরী শত বাধা পেরিয়ে তাঁকে পড়াশোনার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়ে যান।

মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৫২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বোয়ালখালীর মুক্তকেশী গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৫৬ সালে কানুনগোপাড়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার জন্য সালাম, জব্বার, রফিকদের প্রাণ দিতে দেখেছেন রমা চৌধুরী। তাই এইচএসসিতে পছন্দের বিষয় গণিত হলেও স্নাতকোত্তরের বিষয় হিসেবে বেছে নেন বাংলা। তিনি বলেন, 'বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগ দেখে মাস্টার্স করেছি বাংলায়। তবে সুযোগ পেলে আবার ভর্তি হবো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবার মাস্টার্স করতে চাই ইংরেজি কিংবা ইতিহাসে।'

মোতিময়ী চৌধুরীর উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকে তখন নারীদের উচ্চশিক্ষা এত সহজ ছিলো না। সেই সময় রমা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিনিই প্রথম নারী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিলো প্রবল। তাই তিনি বলতেন, ‘সুযোগ পেলে আবার ভর্তি হতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মাস্টার্সটা করতে চাই ইংরেজিতে।’

তাঁর জন্ম অন্য সাধারণ নারীর মতো হতে পারতো, স্বামী-সংসার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে দিন পার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা পারেন নি। মাত্র ২০ বছর বয়সে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ এক যুগের উপরে তিনি বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে তিনি বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন। এরই মধ্যে আসে ১৯৭১, স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বিদুগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ রমা চৌধুরীর সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যান। সাগর আর টগর দুই সন্তানকে নিয়ে রমা চৌধুরী পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

১৯৭১ সালের ১৩ মে। রাজাকার আর পাকিস্তানি সেনারা বাড়িতে ঢুকে রমার মা, দুই ছেলে সাগর ও টগরের সামনেই তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণেই ক্ষান্ত হয় নি পাকিস্তানি হানাদাররা- রমাদের বাড়িটাও পুড়িয়ে দেয় তারা। কোনও মতে মুক্ত হয়ে রমা পুকুরে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন— চোখের সামনে দেখেন গান পাউডারের আগুনে পুড়ে যাওয়া বসতবাড়ির লেলিহান শিখা। মুক্তিযুদ্ধের বাকি আটটি মাস তিনি লুকিয়ে বেড়িয়েছেন সন্তান আর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে। মায়ার টানে রাতে পোড়া বাস্তভিটায় এসে মাথা গুঁজতেন খড়কুটো বা পলিথিনে। সেই একাত্তরে স্মৃতিগুলো অক্ষরবৃত্তে সাজিয়ে বই ফেরি করে বিক্রি করতেন।

নিজের লেখা একাত্তরের জননী গ্রন্থের ৫২ পৃষ্ঠায় নিজের ধর্ষিত হওয়ার কাহিনীর পাশাপাশি রমা চৌধুরী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পৈশাচিকতার বর্ণনা দিয়ে লিখেন,

'যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।

সেদিন আমাদের পাড়ায় কত মেয়েকে যে ধর্ষণ করেছে পিশাচগুলো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। যুবতী মেয়ে ও বৌ কাউকেই ছাড়ে নি। গর্ভবতী বৌ এমনকি আসন্ন-প্রসবারাও বাদ যায় নি। এসব কথা জানতে পেরে আমি অন্তরের গ্লানি ভুলে নিজেকে কোনমতে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও মা কিন্তু আমার গর্ভে হানাদারের সন্তান আসতে পারে ভেবে আতংকে ও উদ্বেগে ছটফট করতে থাকেন।`

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর নিকটজনসহ সমাজের কাছে শুরু হলো তার দ্বিতীয় দফা লাঞ্ছিত হবার পালা। পাক-হানাদারদের কাছে নির্যাতিত হবার পর সমাজের লাঞ্ছনায় এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়লেন রমা চৌধুরী।

একাত্তরের জননী গ্রন্থের ৬৪ পৃষ্ঠায় রমা চৌধুরী লিখেছেন,

'আমাদেরকে দেখতে বা সহানুভূতি জানাতে যারাই আসছেন তাদের কাছে আমার নির্যাতিত হবার ঘটনাটা ফলাও করে প্রচার করছে অশ্রাব্য ভাষায়।

আমাদের বাড়ির উত্তর দিকে খোন্দকারের বাড়ি। সে বাড়ির দু`তিনজন শিক্ষিত ছেলে আমাদের তখনকার অবস্থা সম্পর্কে জানতে এলে আমার আপন মেজকাকা এমন সব বিশ্রী কথা বলেন যে তারা কানে আঙ্গুল দিতে বাধ্য হয়। আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না, দোকানে গিয়ে কিছু খাবারও সংগ্রহ করতে পারলাম না মা ও ছেলেদের মুখে দেবার জন্য।'

পোড়া দরজা-জানালাবিহীন ঘরে শীতের রাতে বস্ত্রহীন থাকতে হয়েছে মাটিতে। গরম বিছানাপত্র নেই। সব পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দিনান্তে ভাত জুটে না। অনাহারে, অর্ধহারে ঠাণ্ডায় দু'সন্তান সাগর আর টগরের অসুখ বেঁধে গেলো।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সারা দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, তখন বোয়ালখালীর পোড়া ভিটের এক কোণে কোলের শিশুকে বাঁচাতে লড়ছেন রমা চৌধুরী। পারেন নি তিনি। নিউমোনিয়া আক্রান্ত বড় ছেলে সাগর ২০ ডিসেম্বর মারা গেলো। এরপর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় রমা চৌধুরীর মেজ ছেলে টগরও। পুত্রশোকে উন্মাদ রমা চৌধুরী সেই থেকে আর পায়ে জুতা পরেন নি।

সন্তানহারা মা রমা চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলেদের আমি পোড়াতে দিই নি। এই মাটিতে তারা শুয়ে আছে। আমি কীভাবে জুতা পায়ে হাঁটি। পারলে তো বুক দিয়ে চলতাম–ফিরতাম। তারা কষ্ট পাবে।’

১৯৭১ সালের বিভীষিকা কিংবা সন্তানদের মৃত্যুর ক্ষণগুলো ঝলমলে ছিলো রমা চৌধুরীর মনে। ‘আমার ছেলে সাগর ৭১–এ সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী। মিছিলের পেছন পেছন জয় বাংলা জয় বাংলা বলে ছুটতো। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও বুকে আগলে রাখতে পারি নি। সাগর আমার মারা যায় ১৯৭১ –এর ২০ ডিসেম্বর। ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় মারা যায় টগরও।’—গলা ধরে আসে রমা চৌধুরীর।

একাত্তরের জননী’ বইটির ২১১তম পৃষ্ঠায় রমা চৌধুরী লিখেছেন,
'ঘরে আলো জ্বলছিলো হ্যারিকেনের। সেই আলোয় সাগরকে দেখে ছটফট করে উঠি। দেখি তার নড়াচড়া নেই, সোজা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সে, নড়চড় নেই। মা ছটফট করে উঠে বিলাপ করে কাঁদতে থাকেন, আঁর ভাই নাই, আঁর ভাই গেইয়্যে গোই (আমার ভাই নেই, আমার ভাই চলে গেছে)।”

একই রোগে আক্রান্ত দ্বিতীয় সন্তানও। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্ধউন্মাদিনী রমা চৌধুরী নিজের ছেলে টগরকে ওষুধ খাওয়াতে গিয়ে অসাবধানতাবশত তার শ্বাসরোধ হয়ে যায়। এতে মারা যায় টগর। প্রথম সংসারের পরিসমাপ্তির পরে দ্বিতীয় সংসার বাঁধতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে টুনু ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

পুত্র শোক তাঁকে আর মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ে দগদগে স্মৃতি নিযে তিনি পুরোদমে লিখতে শুরু করেন। নিজেই লিখেন। নিজেই পাঠাকের কাছে তাঁর বইগুলো তুলে দেয়। এজন্য তিনি নিজে বলতেন বইয়ের ফেরিওয়ালা। এভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে চালিয়েছেন। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলতো তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে ২০টি গ্রন্থ প্রকাশ করেন।

বই বিক্রয় প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, `আমি বই বিক্রি করি। যেদিন বিক্রি করতে পারি সেদিন খাই, যেদিন পারি না সেদিন উপোস থাকি।’

কেনো লিখেন তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আমার কাঁধে ঝোলা দিয়েছে। আমার খালি পা, দু:সহ একাকীত্ব মুক্তিযুদ্ধেরই অবদান। আমার ভিতর অনেক জ্বালা, অনেক দুঃখ। আমি মুখে বলতে না পারি, কালি দিয়ে লিখে যাবো। আমি নিজেই একাত্তরের জননী।`

রমা চৌধুরীর ২০টি বই বের হয়েছে। লিখেছেন সাহিত্যের প্রায় সব ধরনের শাখায়- সমালোচনা সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মৃতিকথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস গ্রন্থ, গল্প, উপন্যাস, লোক-সংস্কৃতিবিষয়ক গ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং ছড়া।

তাঁর ‘ছায়াসঙ্গী’ বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন। খোকন মায়ের মতো সেবাশুশ্রূষা করেন রমা চৌধুরীর। আলাউদ্দিন খোকন বলেন, বই বিক্রি করেই তিনি চলেন। কারও দাক্ষিণ্য নেন না। চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবনের চারতলার একটি কক্ষে তিনি থাকেন।

সামগ্রিক কবিতায় আমরা প্রতিবাদী রমা চৌধুরীর পাশাপাশি মানবিক ও প্রেমময়ী নারী রমা চৌধুরীকে পাই। একই সঙ্গে কিছু লেখায় পাওয়া যায় বিপ্লবী রমা চৌধুরীকেও।

রমা চৌধুরীর কবিতার বই দুটো ‘স্বর্গে আমি যাব না’ ও ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’। প্রকাশিত হয়েছে মাধুকরী থেকে।

‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’ শিরোনামে তার একটি ছড়ার বইও আছে।‘ নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলাদা করে গ্রন্থ লেখার পাশাপাশি পল্লীকবি জসীমউদদীন-এর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে লিখেছেন ‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’ বইটি। জসীমউদদীন-এর ‘কবর’, ‘রাখালী’, ‘বালুচর’ ও ‘বেদের মেয়ে’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি তার মৌলিক চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। বইয়ের একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ হলো ‘বেদনার কবি’।

২০১১ সালে প্রকাশিত হয় তার ছোটগল্প সংকলন ‘আগুন রাঙা আগুন ঝরা অশ্রু ভেজা একটি দিন’। এই গল্পে তিনি চিরায়ত গল্প বলার কৌশল অবলম্বন করেছেন। শুরুটা করছেন এভাবে- ‘সেই কিশোরীটি যে বধূ হতে চেয়েছিল অথচ পারলো না, তারই জীবনের করুণ-মধুর কাহিনী আজ বলে যাবো।’ এরপর তিনি গল্প বলার কথ্যরীতি অবলম্বন করে গল্পটি লিখে চলেন। লেখার ভেতর যে গতিটা আছে সেটি পাঠেও সঞ্চারিত হয়। পড়তে পড়তে একটুও ক্লান্তি আসে না। রমা চৌধুরীর গল্পে ছোট ছোট কোলাজের মতো সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির চিত্র পাওয়া যায়। মূলত নারীজীবন তাঁর কথাসাহিত্যের প্রধানতম বিষয়।

‘মেয়েদের মা হওয়ার সুযোগ দাও’ শীর্ষক গদ্যে তিনি বলেছেন, ‘বন্ধ্যা নারী যেমন আছে, বন্ধ্যা পুরুষও তেমন আছে। বন্ধ্যা নারীর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে সন্তানের বাবা হতে পারছে। কিন্তু বন্ধ্যা স্বামীর স্ত্রীর জন্য সেই স্বাধীনতা কেন থাকবে না?’

‘নীল বেদনার খাম’ বইটি মা ও ছেলের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনকে লেখা পত্রাবলী দিয়ে সাজানো। রমা চৌধুরীর ছেলে দীপংকর টুনুর কিশোরকালে লেখা চিঠিগুলো নানাভাবে সংগ্রহ করে এই বইতে সংকলন করেছেন একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী।

শরীর ভালো থাকলে খালি পায়ে কাঁধের ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ৭৪ বছর বয়সী এই সংগ্রামী নারী। তার ভাষায়, ‘আমার সন্তানেরা শহীদের মর্যাদা পায় নি, কিন্তু তারা আমার কাছে শহীদ। কারণ, একাত্তর আমাকে দিয়েছে পোড়া ভিটে, কাঁধের ঝোলা, ছেলের শোক আর খালি পা।’

রমা চৌধুরীর লেখা বইগুলোর তালিকা

প্রবন্ধ সংকলন
* রবীন্দ্র সাহিত্য ভৃত্য, * নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, * সপ্তরশ্মি,* চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যের জীবন দর্শন, * অপ্রিয় বচন, * যে ছিল মাটির কাছাকাছি, * ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ, * নির্বাচিত প্রবন্ধ

উপন্যাস
* একাত্তরের জননী, * লাখ টাকা, * হীরকাদুরীয়

কাব্যগ্রন্থ
* স্বর্গে আমি যাব না, * শহীদের জিজ্ঞাসা, * ১০০১ দিন যাপনের পদ্য

পত্র সংকলন
* নীল বেদনার খাম

স্মৃতিকথা
* সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, * স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়

গল্প সংকলন
* আগুন রাঙ্গা আগুন ঝরা * অশ্রুভেজা একটি দিন

‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত রমা চৌধুরীর জীবনের এমন চিত্র আমাদের স্বাধীন দেশের দিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলে দিচ্ছে, দেশের জন্য তাঁর সব ত্যাগ যেন ধুলোয় মিশে গেছে, সেই ধুলো মাড়িয়ে নগ্ন পায়ে হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করে আহার জোটাতেন। আহারের সন্ধানে হেঁটে বেড়ানো বৃদ্ধা রমা চৌধুরীর শরীরে ছিলো স্বাধীনতার ঘ্রাণ, মস্তিষ্কে ছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দীপ্ত শপথ, অস্তিত্বে ছিল পাক হানাদারদের নৃশংস ছাপ, মুক্তিযুদ্ধে যিনি হয়েছিলেন নিঃস্ব। স্বাধীনতা কি এই রমা চৌধুরীর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পেরেছিলো? শূন্য হাতেই কি বিদায় নিলেন একাত্তরের গর্ব এই বীরাঙ্গনা জননী। মরে গিয়ে জাতির কাছে রেখে গেলেন এই প্রশ্ন।

প্রকৃতিতে রোদ আর মেঘের লুকোচুরি। চট্টগ্রাম নগরীর শিরিষ গাছের শীতল ছায়ার ফাঁক গলে আসা রোদের উত্তাপে তপ্ত পিচঢালা রাজপথ। উত্তপ্ত এই পথ উপেক্ষা করে আলো হাতে খালি পায়ে হেঁটে চলেছেন ৭৪ বছরের এক বৃদ্ধা। এ যেন বিশ্বকবির সেই কবিতা; আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারেরও যাত্রী। তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে আকা… না তিনি ছবি নন রক্তমাংসের মানুষ। হাতে তার বইয়ের ঝোলা। ঘুরে ঘুরে দর্শনার্থীদের কাছে নিজের বই বের করে দেখাচ্ছেন, পাঠকের ইচ্ছে হলে কিনতে বলছেন।

শেষ জীবনে এ বীরাঙ্গনার বন্ধু হয় চারটি বিড়ালছানা। বই বিক্রির টাকা দিয়ে নিজে খেতেন। খাওয়াতেন বিড়ালদেরও। লুসাই ভবনে রমাদির এক কক্ষের বাসায় একটি খাট ছিলো। সেই খাটে পরম মমতায় ঘুম পাড়াতেন তিনি বিড়ালদেরও।

রমা চৌধুরী তার ৮টি বই উৎসর্গ করেছেন তার ৮টি বিড়ালকে। এমনই বিড়ালপ্রেমী ছিলেন তিনি।

দিদি বলেন, 'ওরাই আমার সন্তান। ওদের মাঝে খুঁজি আমি হারানো ছেলেদের। আর জানেনতো, মানুষ বেঈমান হয়। ছলনা করে। কিন্তু বিড়ালরা প্রতারণা করে না। ওরা ভালোবাসার প্রতিদানে ভালোবাসাই দেয়। '

প্রচণ্ড কষ্টের জীবন কাটলেও তাঁর দু’চোখে স্বপ্ন ছিলো সুখ-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। আজন্ম লালিত স্বপ্ন মানুষের জন্যে কিছু করার তাগিদ কে অনুপ্রেরণা দিতো বলেই একটা মানুষ এত ঝড় এত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে হাসিমুখে বলতে পারতেন "আমি আরো বেঁচে থাকতে চাই আমার তো এখনো কিছুই করা হয় নি"।

জীবন ধারণের পাশাপাশি তিনি তাঁর অকালপ্রয়াত ছেলের নামে ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথআলয়’ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে থমকে যায় তার সেই স্বপ্নের অনাথালয়ের কার্যক্রম। এখন বন্ধ রয়েছে অনাথ আশ্রমটি।

এ আশ্রম নিয়ে নিজের স্বপ্ন নিয়ে রমা চৌধুরী বলেন, ‘দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খোলার ইচ্ছা ছিলো। সেই আশ্রমে বসবাস করবে সব ধর্মের অনাথরা। দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয় খুললাম কিন্তু চালাতে পারি নি। এখন নিজেরই চিকিৎসার খরচ চালাতে পারি না। সেখানে আশ্রম চালাবো কী করে? তবে যদি সুস্থ হয়ে উঠি, যদি সুযোগ আসে আবার চালু করবো অনাথ আশ্রমটি। ’ আক্ষেপ নিয়েই চলে গেছেন।

রমা চৌধুরী আমাদের একাত্তরের জননী। রমা চৌধুরীরা আমাদের একাত্তরের বীরাঙ্গনা। তপ্ত রোদে নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়ানো রমা চৌধুরী ধারণ করেছিলেন এদেশের স্বাধীনতা।

‘১৯৭১ সালে এদেশের মাটি স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু দেশের মানুষের মুক্তি আসে নি। মানুষের মুক্তি না এলে সেই স্বাধীনতার কোনো ভিত্তি নেই। লেখাপড়া শিখে অনেকে বিদেশে চলে যায়। ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য দেশকে বঞ্চিত করা উচিৎ নয়। যে মাটিতে জন্ম, সেই মাটি আর মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করতে হবে। তরুণরা দেশপ্রেমে জাগ্রত হতে হবে।’- এই কথাগুলো ‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর।

রমা চৌধুরী শুধু একজন মানুষের নাম না, নিঃসন্দেহে তিনি বীরত্বপূর্ণ এক জীবন সংগ্রামের নাম। একাত্তরের এতো এতো বীরত্বগাঁথা আর বীরযোদ্ধাদের গল্পের নিচে চাপা পড়ে গেছে রমা চৌধুরীদের আত্মদান। তাঁদের গল্প আমরা কেউ শুনি নি, আমাদের শোনানো হয় নি ছেলেবেলা থেকে, বড় হয়ে, পরিণত বয়সে আমরা নিজ উদ্যোগে শুনে নিয়েছি, আর পরম শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছি, মা বলে, জননী বলে ডেকেছি তাঁদের। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এরপর আর কোনো দায়িত্ব আমরা নিজেরাও পালন করি নি।

মা আপনিই লাল সবুজ। স্বাধীনতাও মাকে মুক্তি দেয় নি, তাঁকে আজীবন লড়তে হয়েছে সমাজ, সংসার, আপনজনদের ছুরির নিচে।

এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলে কান পাতলেই শোনা যাবে ৪৭ বছরের বেদনা, দুঃখের লড়াই করা এক যোদ্ধার, আলোর অভিযাত্রীর পথ চলা।

মা সম্মানটা আমরা দেই নি কিন্তু তুমি ত ফিরিয়ে দাও নি, বঞ্চিত কর নি। এখানেই তোমার সকলের মা হয়ে উঠা।

আজ আমার জননীর, আজ একাত্তরের জননীর জন্মদিন। তোমার কবিতা বলে দেয়
দেশকে কিভাবে ধারণ করতে

‘যাব না, ভাই, যাব না/ স্বর্গে আমি যাব না/ দুধের নদী, ক্ষীরের সাগর/ যতই সেথা থাকুক না।/ চাই না যেতে স্বর্গে আমি/ যদি বকুল সেথা নাহি ফোটে’ (স্বর্গে আমি যাব না)


  • ৩১০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা