রামিছা পারভীন প্রধান

অফিসার, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি

মোবাইলের নেশায় আসক্ত তরুণ সমাজ ও দাম্পত্য জীবনে এর প্রভাব

বর্তমানে মোবাইল নামক যন্ত্রটি অতিরিক্ত ব্যবহার করার ফলে তরুণ প্রজন্ম ধংসের মুখে পড়েছে। মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার এখন আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য মাদকদ্রব্যের মত এটাও এখন এক ধরনের নেশা। নেশাকারীরা নেশা জাতীয় বস্তু না পেলে যেমন অস্তির হয়ে চুরি, ডাকাতি এমন কি খুনও করে তেমনি অতিরিক্ত ব্যবহারকারীরা মোবাইল না পেলে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে আত্মহত্যার হুমকী দেয়। মনোচিকিৎসকরা বলছেন আগে অভিভাকরা বিভিন্ন মাদকদ্রব্যে আসক্ত হওয়ার কারণে তাদের সন্তানদেরকে চিকিৎসার জন্য আমাদের কাছে নিয়ে আসতেন। এখন তারা ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসেন মোবাইল আসক্তি থেকে কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে তাদের ফিরিয়ে আনা যায় সে চিকিৎসার জন্য। মোবাইল আসক্তি মানে এক ধরনের রোগ । তবে একে কোন ধরণের রোগ বলা যায় তা এখনও নির্নয় করা না গেলেও সারাবিশ্বে একে মোবাইল এডিকশন ডিসঅর্ডার বলে।

মোবাইলে বিভিন্ন ভিডিও গেইম ও ইন্টারনেটের অন্যান্য সামাজিক সাইটে আজকাল তরুণ প্রজন্ম সারাদিন বুদ হয়ে থাকে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে তারা ভাল ফলাফল থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। এমনকি ইন্টারনেট ভিত্তিক সাইটগুলো যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টুইটারে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার কারণে ক্লাসের বন্ধুদেরকেও তারা ঠিকমত চিনে না। যোগাযোগ থাকে র্ভাচুয়াল বন্ধুদের সাথে বেশি। পড়তে বসলে বার বার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখে তার পোস্টে কতগুলো কমেন্ট ও লাইক পড়লো বা কে কী নতুন স্ট্যাটাস দিলো? ফলে পড়াশুনার প্রতি তাদের কোনো মনোযোগ থাকে না। ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এমন কি তারা স্কুলের ক্লাসে, কোচিংয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ছাত্রদের অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিক্ষকেরা অতিষ্ট হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রদের বহিষ্কার করেছেন এমন নজির অনেক আছে।

বাস্তবের সামাজিক যোগাযোগ থেকেও তরুণরা অনেক পিছিয়ে আছে। এমন কি বাবা মায়ের সাথে তাদের কথা বলার সময় নেই। বাসায় কোনো গেস্ট আসলে তাদের সাথে দেখা করারও সময় নেই। এমন কি তারা টাইম মতো নিজেদের খাওয়া দাওয়ার কথা ভুলে যায়। বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করার যে একটা অভ্যাস ছিলো চিরকাল সেটা এখন হারিয়ে গেছে। বাবা-মা'র সাথে দু/একদিনের জন্য নেটওর্য়াকের বাহিরে গেলেও অস্থির হয়ে বাবা-মার সাথে খারাপ আচরণ করে। ফলে সামাজিক বন্ধনে অনেকটা ফাটল ধরেছে। তাছাড়া ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইলে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয়, মাথা ঝিমঝিম করে, নার্ভের সমস্যা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক রোগ দেখা দেয়।

স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে তরুণ সমাজ অল্প বয়সে ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের বয়ফ্রেন্ড ও গালফ্রেন্ড তৈরি করছে। বয়সন্ধির এই বয়সটা খুব জটিল। এই বয়সে কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তাদের পক্ষে বুঝে উঠা কঠিন। অনেক সময় রিলেশন ব্রেকআপ হওয়ার পর গালফ্রেন্ডের ছবি নোংরাভাবে এডিট করে ভাইরাল করে তারা। এছাড়া স্মার্টফোনে খুব সহজেই তারা খুঁজে পায় বিভিন্ন বিনোদনের মাধ্যম। এমন কি হাতের কাছে র্স্মাটফোন থাকায় পর্নেগ্রাফির প্রতিও তারা খুব সহজেই ঝুকে পড়ে। ফলে খুব সহজেই তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায়।

অনেক চাকুরীজিবী বাবা-মা আছেন তাদের সন্তানদের খোঁজ খবর, যোগাযোগের জন্য ছেলেমেয়েদের হাতে র্স্মাটফোন তুলে দেন। অনেক সময় ছেলেমেয়েরা তাদের নিজেদের স্ট্যাটাসের কথা ভেবে র্স্মাটফোনের আবদার করে। মোবাইল কিনে দেওয়ার সময় বাবা-মা'রা চিন্তা করেন না যে তারা তাদের সন্তানকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কিছুদিন আগে ঢাকায় অষ্টম শ্রেনীর এক ছাত্রী মোবাইলে ব্লু হোয়েল গেইম খেলার নেশায় আত্মহত্যা করে বলে তার ফ্যামিলি দাবী করে। ঢাকা শহরে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে বাসায় এক রকম বন্দি থাকে বলে মোবাইলটা তাদের এক মাত্র সঙ্গি হয়ে উঠে। শুধু ঢাকা নয় বাংলাদেশের সব জায়গায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মোবাইলের আসক্তি বেড়ে গেছে।

রাস্তা পার হওয়ার সময় অনেকে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে রাস্তা পার হয়। ফলে অনেকে র্দূঘটনার শিকার হয়। তারা এতটাই র্স্মাটফোনের নেশায় আসক্ত হয় যে নিজের জীবনের কথা ভাবার সময় তাদের নেই।

আবার অনেক বাবা-মা আছেন ছোট সন্তানটির সামান্য বিরক্ত সহ্য না করতে না পেরে নিজেরা একটু ভাল থাকার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইল বাচ্চাদের হাতে দিয়ে রাখেন। ফলে বাচ্চাটা মোবাইলের প্রতি একটা সময় আসক্ত হয়ে যায়। এমন কি সারাদিন মোবাইল ব্যবহারের ফলে রাতে ঘুমের মধ্যে বকবক করে। এরপর যখন আপনি এটা ছাড়াতে চাইবেন তখন তারা অসম্ভব জেদ দেখিয়ে অসুস্হ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়।

র্স্মাটফোন যে শুধু তরুণ সমাজকে ধংস্স করছে তা নয়। দাম্পত্য জীবনে অনেক নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। ইন্টারনেটের আর্শিবাদে আমরা অনেক নতুন বন্ধু তৈরি করে অবাঞ্ছিত সর্ম্পকে জড়িয়ে যাই। ভার্চুয়াল এসব বন্ধুদের সাথে চ্যাট ও ভিডিও কলে সময় দিতে গিয়ে দাম্পত্য জীবনে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এমনও ঘটনা আছে অফিস থেকে ঘরে ফিরেই মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তিন মাসের মাথায় তাদের বিচ্ছেদ হয়ে দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। মোবাইলে অনৈতিক সম্পর্কে এমন কি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার ফলে বিচ্ছেদের ঘটনা আজকাল বেড়ে গেছে। বাসায় ঢুকে ফেসবুকে বসলে ছেলেমেয়ে ও পরিবারের সাথে সর্ম্পকটা ধিরে ধিরে ফিকে হতে শুরু করে। সংসারে তখন নেমে আসে অন্ধকারের ছায়া। সেই অন্ধকার আস্তে আস্তে জীবনে ঘনীভুত হয়ে জটির আকার ধারন করে।

আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামীতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এজন্য তাদেরকে সুস্থ সুন্দর পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য অভিভাকদের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে। সন্তানদের বন্ধু হয়ে তাদেরকে প্রচুর সময় দিতে হবে যাতে তারা নিজেদেরকে একা না ভেবে মোবাইলের প্রতি আসক্ত না হয়। ক্লাসের বাহিরে অন্যান্য বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। ই-বুক নয় দরকার হলে অভিভাবকেরা বাসায় বুকসেলফ রেখে বিভিন্ন ধরণের বই সংগ্রহ করে তাদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহি করতে হবে। প্রয়োজনে নিদির্ষ্ট একটা বয়সে সন্তানের হাতে মোবাইল দিতে হবে এবং অভিভাবকদের তাদের মোবাইল ব্যবহারের প্রতি নজরদারী করতে হবে। চাকুরীজিবী বাবা-মা'রা তাদের উদ্বিগ্নতা কমানোর জন্য সন্তানের হাতে যোগাযোগের জন্য নিম্নমানের মোবাইল  দিতে পারেন যাতে তারা শুধু রিসিভ ও কল করতে পারে।

বতর্মানে ইন্টারনেটের জনপ্রিয় একটা সাইট হলো ফেসবুক। বাবা মাকে তাদের ফ্রেন্ডলিস্টে থাকতে হবে যার কারণে তারা হয়ত অনেকটা নিযন্ত্রণে থাকবে। তাদের সাথে শিক্ষামুলক পোস্টগুলো শেয়ার করতে হবে বেশি করে। প্রকৃতি আমাদের মনকে অনেকটা প্রশান্তি এনে দেয়। কর্মব্যস্ততার মাঝে মাঝে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদেরকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যেতে পারে।

তরুণ প্রজন্মই যেহেতু আমাদের দেশকে এক সময় পরিচালনা করবে, সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে তাই তাদের সুন্দর একটা পরিবেশে বড় হওয়ার ব্যাপারে শুধু পরিবার নয় সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। ইন্টারনেটের সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে নিজের ও দেশের উন্নয়ন করা যায় সে সম্পর্কে সচেতনামুলক কার্যক্রম বেশি করে হাতে নিতে হবে সরকারকে। আর সরকার যদি ফেসবুক ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ বছর বাধ্যতামূলক করে তাহলে হয়ত তরুণ প্রজন্মকে এই আসক্তি থেকে কিছুটা রক্ষা করা যেতে পারে।

তরুণ সমাজের পাশাপাশি বড়দেরকে মোবাইলের ব্যবহার সম্পর্কে নিজেদেরকেই সচেতন হতে হবে। দাম্পত্য জীবনে মোবাইলটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। মানসিকভাবে ভাল থাকার জন্য অফিস থেকে ঘরে ফিরে একে অপরকে সময় দিতে হবে। তাহলে হয়তো আপনাদের সন্তানেরাও সুস্থ্য, সুন্দর ও সুখী পরিবেশে বড় হবে। ফলে তারাও একসময় মোবাইলের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে। তা না হলে অচিরেই গোটা জাতি মোবাইলের নেশায় আসক্ত হয়ে অন্ধকারে ডুবে যাবে। আসুন আমরা সবাইকে সচেতন করি, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার মাদকাসক্তির মতো একটা নেশা, এই নেশার ফাঁদে পরে জীবনের মূল্যবান সময়গুলোকে যেন আর নষ্ট না করি।

1721 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।