কল্পনা চাকমা কোথায় ?

শনিবার, জুন ১৩, ২০২০ ৮:৪৬ PM | বিভাগ : আলোচিত


কল্পনা চাকমা ছিলেন হিল উইমেন'স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক। মাত্র তেইশ বছর বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন গহীন পাহাড়ের মানুষগুলোর পক্ষে প্রতিবাদী এক কন্ঠস্বর। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে ফেলা বাঙালি সেটেলার আর নিপীড়নকারী আর্মি অফিসাররা দাঁড়াতেই পারতো না কল্পনার দৃঢ়তার সামনে। আর সে জন্যেই সম্ভবত তাকে সরিয়ে ফেলাটা জরুরি হয়ে পড়েছিলো। ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক ঘন্টা আগে, রাতের অন্ধকারে নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হলেন কল্পনা চাকমা। তারপর কেটে গিয়েছে গুনে গুনে চব্বিশটি বছর। রাষ্ট্র কল্পনা চাকমাকে খুঁজে বের করতে পারে নি।

খুঁজে বের করতে পারে নি, নাকি খুঁজে বের করতে চায় নি সে প্রশ্নটা করা জরুরি। রাষ্ট্রের কাছে কল্পনা চাকমা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কি না, নাকি কল্পনা চাকমাকে ফিরিয়ে আনলেই রাষ্ট্রের সমস্যা, সে প্রশ্ন আমাদের মনে গত চব্বিশ বছর ধরে ঘুরপাক খায়। শুরু থেকেই এই ঘটনা নিয়ে রাষ্ট্রের নীরবতা ছিলো চোখে পড়ার মতো। কল্পনা চাকমা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদে নামলে বাঙালি সেটেলারদের হাতে মারা যায় রূপন চাকমা, মনোতোষ চাকমা, সমর বিজয় চাকমা আর সুকেশ চাকমা নামের চার কিশোর। তখন চাপে পড়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে বলাই বাহুল্য, সে কমিটির প্রতিবেদনে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় লেফট্যানেন্ট ফেরদৌস-সহ অপহরণকারী চিহ্নিত সেনা সদস্যরা। কল্পনা চাকমার পরিবার তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তদন্ত প্রতিবেদন আজ পর্যন্ত জনগনের সামনে প্রকাশ করার সাহস রাষ্ট্র করে উঠতে পারে নি।

পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিলেন কল্পনা। রুখে দাঁড়িয়েছেন গহীন পাহাড়ের নিপীড়ক আর্মি অফিসারদের বিরুদ্ধে। অথচ কল্পনা নিখোঁজ হওয়ার পরের বছর স্বাক্ষর হওয়া শান্তি চুক্তিতে আমরা পাহাড়ে নারী নিপীড়ন নিয়ে কোনো আলাপ দেখি না।

গত চব্বিশ বছর ধরে পাহাড়ি অ্যাক্টিভিস্ট সংগঠনগুলো-সহ সারা বাংলাদেশ যখন কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনায় লাগাতার প্রতিবাদ করে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্র নির্লজ্জের মতো পাহাড় কেটে, গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে, পাহাড়িদের উচ্ছেদ ও জমি দখল করে বানিয়ে চলেছে পর্যটন কেন্দ্র আর সেনা ক্যাম্প।

কল্পনা চাকমা নিখোঁজ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে ৩৫ বার। পরিবার আজও পর্যন্ত কল্পনার ফিরে আসার অপেক্ষায় তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সপন্ন করে নি। আমাদের বিস্ময় নিয়ে দেখতে হলো পরিবারের সদস্যদের অসংখ্যবার দেয়া চাক্ষুষ বিবরণের পরেও "সাক্ষ্যের অভাবে" ২০১৬ সালে মামলাটি বন্ধ করে দেয়া হলো। স্পষ্টতই বোঝা যায়, অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের বাঁচাতে নিখোঁজ নিয়ে একটি কৃত্রিম ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয় নিখুঁত চতুরতার সঙ্গে। অবশ্য আমরা যারা এ প্রজন্মের অ্যাক্টিভিস্ট বা রাজনৈতিক কর্মী, তাদের কাছে এই ধোঁয়াশা সৃষ্টি একটু বিস্ময়কর ঘটনাই বটে। কারণ এখনকার সরকার পাহাড় বা সমতলে কোনোখানেই মানুষ খুন, ধর্ষণ বা নিখোঁজ করতে কোনো চতুরতা বা ধোঁয়াশারও ধার ধারেন না। প্রয়োজন মনে হলেই এখনো কল্পনার চাকমার মতো নিখোঁজ করে দেয়া হয় আপনাকে বা আমাকে। কোনো ব্যাখ্যা, বিচার বা জবাবদিহিতার প্রয়োজন রাষ্ট্রের পড়ে না। রাষ্ট্র তার নিপীড়ক, খুনি, ধর্ষক, অপহরণকারীর চেহারা নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তার উগ্র জাতীয়বাদী দৃষ্টি দিয়ে জায়েজ করে ফেলে কল্পনা চাকমার গুম।

কল্পনার নিখোঁজের মতো হাজারো রাজনৈতিক আর জাতিগত নিপীড়নের ঘটনা গহীন পাহাড়ের ভেতর চাপা পড়ে যায় প্রতিদিন। আমরা চিৎকার করি। পাহাড়ের গায়ে বাড়ি খেয়ে আমাদের কন্ঠস্বর বারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে আমাদেরই কাছে ফিরে আসে, "কল্পনা চাকমা কোথায়...?"


  • ৩৫৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঋদ্ধ অনিন্দ্য

ছাত্রনেতা এবং এক্টিভিস্ট