বাজেটে নারী

মঙ্গলবার, মে ১৫, ২০১৮ ২:৪১ AM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


বাজেটে কি আদৌ নারীর উন্নয়ন নিয়ে ভাবা হয়? প্রতি বছর বাজেট পাশ হয়। উন্নয়নের জোয়ারে কত প্রকল্প নেয়া হয়। কিন্তু সেখানে নারীকে আসলে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়?

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নারী শিক্ষার প্রসারে বিনা বেতন, উপবৃত্তির সুবিধা পর্যন্ত বাজেট আটকে আছে। আর নারীর বাজেট সম্পর্কিত দৃষ্টি ভংগি আটকে আছে নিত্যপন্যের দাম বেড়ে গেলে সংসার খরচার বড় অংশ চলে যায় এ দুঃচিন্তা নিয়ে।

আদৌ বাজেট নারীকে ক্ষমতায়ন এনে দিচ্ছে কি না সে বিষয়ে নীতি নির্ধারক বা নারী উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা ভাবছেন কী? হোক সে নারী কর্মজীবি কিংবা গৃহিনী তার হাত দিয়ে আয়কৃত অর্থ সংসার খরচ, সন্তান লালন পালন ,সঞ্চয়, নতুন বিনিয়োগ কিংবা অর্থকে পুনঃ আয় করার খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা নিয়ে কোনো গবেষনা দেখা যায় না বাজেট প্রনয়ণে। অর্থাৎ বাজেট প্রনয়ণ অপেক্ষা বাজেট বাস্তবায়নে নারীর অংশগ্রহন একেবারে শূন্যের কোঠায়। অথচ নারীর উন্নয়নে বাজেট নিশ্চিত করতে নারীর এরুপ অংশগ্রহন গুরুত্বপূর্ন। এটি একেবারেই আমার নিজস্ব মত।

এবার বাস্তব কিছু উদাহরণ দেই-

বাজেটে নারীর উন্নয়ন মানেই গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকার নারীটিও এ থেকে দূরে নন। যিনি তার অবলা গরুটিকে ঘাস খাইয়ে দুধ বিক্রি করে সংসার চালান। তিনি গরুটি কিনেছিলেন হয়তো ঋণ করে। কিছূদিন পর তার গরুটি বন্যার পানিতে রোগে পড়লো এবং মারা গেলো। তার জন্য ঋণের বোঝা এবং একই সাথে সংসার খরচ চালানো তাকে কতটা নির্মম পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে তা বলা বাহুল্য। প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কেনো ওই গরুটির ওপর লোন নেবার সময় সীমিত হলেও ইন্সুরেন্সের ব্যবস্থা করেন নি। হোক তা গ্রামীন ব্যংক, আশা, ব্রাকের মতো ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়। তবুও এত ক্ষুদ্র পন্যের ওপর ইন্স্যুরেন্সকে বিনিয়োগে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে না এবং এই ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্স্যুরেন্সকে সম্বন্বয় করানোতে সরকারের মধ্যস্ততা প্রয়োজন। ইন্সুরেন্স বা বীমা বাংলাদেশে ক্রেতার কাছে আগ্রহের বা আকর্ষনীয় হয়ে উঠছে না। ইন্সুরেন্স কোম্পানীর ওপর সরকার মনিটরিংটা জোরদার করছেন না। এখাতে প্রচুর সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। যতদূর জানি প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের সাথে বিশ্বব্যাংকের এ ধরনের একটা প্রকল্প (ডিআরএমপি) হবার কথা যাতে এই গৃহপালিত পশুগুলির ওপর বীমা করানো যেতে পারে। কিন্ত তা নিয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন দেখা যায় নি। আশা করি তৃণমূল নারীর বাজেটে সত্যিকার অংশগ্রহণে এরুপ প্রকল্প সফলতার মুখ দেখবে। নচেৎ দিনে দিনে তার বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়াবে।

এ বছর  ২১ মার্চ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে কমিশন অন দ্যা স্ট্যাটাস অব উইমেন (সি এস ডব্লিউ) এর ৬২ তম সেশনের সাধারন বিতর্কে অংশ নিয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, এম পি বাংলাদেশের নারীর উন্নয়নে  নীতিগত নির্দেশিকা প্রনয়ণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি, জীবনমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান, ক্ষুদ্র ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প সৃষ্টির মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারী বান্ধক ব্যাংক ব্যবস্থা এবং মেয়েদের সুরক্ষা ও এগিয়ে নেয়ার প্রকল্পের কথা, আশ্রয়ন, একটি বাড়ি একটি খামার ও জয়িতা সহ নারী সহযোগিতা, উৎসাহ ও প্রনোদণা প্রদানে বিভিন্ন প্রকল্পের পদক্ষেপের উল্লেখ করেন। 

এর মধ্যে মহিলা অধিদপ্তরের অধীনে প্রকল্প জয়িতায় নারীরা প্রত্যন্ত গ্রামের নারীদের হাতে বোনা নকশায় বিভিন্ন পোশাক ও গৃহাস্থালীর পন্য তৈরি করায়। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে এ পণ্যের বাজারজাত করণে সঠিক পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধতা আছে। রাজধানীর রাপা প্লাজায় এদের বিপনন সুবিধা সৃষ্টির জন্য দোকান বরাদ্দ করা হয়েছে এবং কাছেই ধানমন্ডি সাতাশে নিজস্ব ভবনে বিপননের সুবিধা সৃষ্টি করার প্রকল্প চলমান। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে স্বল্প খরচায় দেশে দেশের বাইরে বিপন্ন সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন মেলার সৃষ্টি করা হয়। কিন্ত পন্যর গুনগত মান নিয়ে এখনো কোনো মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় নি। পূর্বে সৃষ্ট পন্যের ওয়াকসনে বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা হয় নি। ফলে অনেক নারী উদ্যোক্তা দিনে দিনে হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। তাদের জন্য এস এম ই লোন বা ক্ষুদ্র ও মাঝারী ঋনের সম্ভাবনার দুয়ার সীমিত। কেননা ব্যাংক ও অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ বাৎসরিক যে লেনদেন বা ট্রান্সজেকশন প্রত্যাশা করেন তা তাদের প্রায় থাকে না বললে চলে। ওদিকে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইতিমধ্যে ডিফোল্ডার হবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে ঋণ প্রদানে কিছুটা সীমিতকরণ করেছে। কিন্ত ২০১১ তে প্রস্তাবিত নারী নীতিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২১ সাল পর্যন্ত রুপকল্পেও নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋন ও বিনা জামানতে ঋন সহায়তা প্রদান ও পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে নারীর নিশ্চিত অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা উল্লেখ আছে ।

নারী উদ্যোক্তা যেনো তুলনামূলকভাবে পুরুষ উদ্যোক্তা থেকে বেশী দক্ষতা প্রদর্শন করতে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেন তা নিয়ে ব্যাংকের তরফ থেকেও বিভিন্ন প্রশিক্ষনের ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আগত বাজেটে থাকবে আশা করি। কেননা  এরুপ তদারকি না করলে এ খাতেও বিনিয়োগকারী নারীর সংখ্যা দিনে দিনে কমবে। নারীর জন্য প্রকল্প গ্রহণ অপেক্ষা তাতে প্রবেশাধিকার বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বোপরি নারীকে মানবসম্পদে পরিণত করার জন্যে নারী নীতিমালায় নারীর নিরাপত্তা,প্রতিবন্ধী নারীর প্রতি আচরণ, কাজের জায়গায় নারীবান্ধব সংস্কৃতি, নারীর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মত প্রকাশসহ সকল দিকে প্রস্তাবনা থাকলেও গৃহিনী নারীর গৃহশ্রমের মূল্যপ্রদান বা তাকে শ্রমবাজারের সাথে সম্বন্বয় সাধনে কোনো কর্মসূচি নেয়া হয় নি। অথচ শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত, কর্মক্ষম এই অর্ধেকের বেশী জনসমষ্টিকে বাদ দিয়ে কিভাবে নারী বান্ধব এবং নারী উন্নয়নমূলক বাজেট প্রনয়ণ সম্ভব? আশা করি বাজেটে এ বিষয়টি আমলে নেয়া হবে।


  • ২৩৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রুমানা রশিদ রুমি

রুমানা রশীদ রুমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ হতে স্নাতক আর স্নাতকোত্তর ড্রিগ্রি নেবার পর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এম বিএ করেন। বর্তমানে আইন বিজ্ঞানে অধ্যায়নরত। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। ছিটকে পড়ে যোগ দেন ব্যাংকে। লেখালিখি আর কাটখোট্টা ব্যাংকিং এক সাথে তাল মেলাতে না পেরে বর্তমানে আছেন ‘দি বাংলাদেশ মনিটর’ এর ‘ফিচার রাইটার”হিসেবে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ম্যাগাজিন ‘রংঢং’। নিয়মিত লেখেন ‘দি বাংলাদেশ অবজারভারে”। লিখছেন বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়। কাজ করছেন নারী সম্পদ নিয়ে। ‘শূন্য প্রকাশ’ প্রকাশনী থেকে ২০১৫ সালের ‘একুশে বইমেলায়’ বের হয় তাঁর প্রথম ফিউশন ‘জয়িতা’। পাঠকের উৎসাহে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে “এ শহরের দিদিমনি “।

ফেসবুকে আমরা