রূপাঞ্জলী রূপা

নারীবাদী লেখক রূপা পেশায় একজন শিক্ষক।

চয়েস আপনার নাকি ধর্মের!

বোরকা ইজ মাই চয়েস কিংবা হিজাব ইজ মাই চয়েস এটা কোনো কথা হতে পারে না। আমার ক্লাস টু এর বাচ্চাটাকেও আপাদমস্তক বোরকা পরে স্কুলে ক্লাস করতে দেখেছি। পরিবার চাপিয়ে না দিলে এতটুকু বাচ্চার বোরকা বা হিজাব পরার কথা মাথায় আসতো না। এইক্ষেত্রে বোরকা হিজাব তার চয়েস নয়। বাবা মায়ের নিজস্ব চয়েস এখানে বাচ্চাটার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অনেকে স্টাইল করার জন্য হিজাব পরে। আশেপাশে এমন বহু উদাহরণ দেখবেন। আমি আমার অনেক বান্ধবীকে দেখেছি বোরকা পরে ডেটিং করতে যেতে। আদৌও তারা বোরকা পরে না। এইক্ষেত্রে বোধহয় ডেটিং করার আগের মুহূর্তে বোরকা বা হিজাব তার চয়েস হতে পারে না।

অনেক বান্ধবীকে দেখেছি বিয়ের পরে বোরকা পরতে। তাদেরকে প্রশ্ন করা হলে, বোরকা বিয়ের আগে পরা হলো না কেনো? উত্তর আসতো বিয়ের পরে শখ হয়েছে কিংবা মনের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু উত্তর সেটা নয়, জামাই, শ্বশুর বাড়ির লোকজন খুশি হবে তাই পরছে। তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্বশুর বাড়ি আর বাবার বাড়ি এক নয়। শ্বশুরবাড়িতে পর্দাটাই আসল, তাদের খুশি করাটাই আসল। এক্ষেত্রে অবস্থার খাতিরে তারা বোরকাকে চয়েসে পরিনত করতে বাধ্য হয়।

অনেকে বলেন বোরকা, হিজাব আসল পর্দা নয়, মনের পর্দাই আসল পর্দা। এই কথা শুনলে আমি আরও কনফিউজড হয়ে যাই। আসলে পর্দা শব্দটা শুনলেই আমি কনফিউজড হয়ে যাই। আমার এক কলিগ খ্রিস্টান থেকে মুসলমান হয়ে যাওয়ার অনেক পরে হজ্ব করতে যান। তার আগে আমার মুসলমান কলিগরা তাকে বোরকা গিফট করেন। কিন্তু হজ্ব করে আসার পরে ওনাকে বোরকা হিজাব পরতে দেখিনি। আমার আরেক হিজাবওয়ালি কলিগ মেয়ের সাথে দেখা করতে জাপানে যাওয়ার পরে হিজাব খুলে অনেক ছবি ফেবুতে আপলোড দিয়েছেন। ১ম জনের ক্ষেত্রে বোরকা গিফট করে বোঝানো হয়েছে, তোমার বোরকা পরা উচিৎ। ২য় জনের ক্ষেত্রে হিজাব বা বোরকা কিংবা পর্দা চয়েস নয় স্টাইল হতে পারে। নাকি দেশ ভিত্তিতে চয়েসের পরিবর্তন হয়?

এখন, ওনারা আসলে পর্দা বলতে কী বোঝান? এই ২০২০ সালে এসে বিশ্ব যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে কেনো বাংলাদেশ পর্দার ভিতরে পড়ে আছে কিংবা আরও ঢুকে যাচ্ছে? ২০০০ সালেও এত পর্দাওয়ালি দেখিনি। হিজাবটাও প্রকট আকারে চোখে পড়েছে আরও পরে। তাহলে আগে কী পর্দার দরকার ছিলো না?

হঠাৎ করে আপনারা এত পর্দা পিপাসী এবং বিলাসী হলেন কেনো? যদি বলেন পরপারের ভয়ে। আমাকে কেউ বলবেন, পরপার থেকে ফিরে এসে আপনাকে কেউ বলেছে পর্দা না করার অপরাধে আজরাইল আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। কিংবা আপনি আমাকে বলতে পারবেন, কবরের আজাব বলে একটা টার্ম ইউজ করেন সেটা কি পরপার থেকে কিংবা কবর থেকে ভিডিও করা হয়েছে?

আপনি বোরকা পরে খেলছেন, ঘুরছেন, বেড়াচ্ছেন খবর নিয়ে দেখলাম আপনি অতীতেও খেলতেন, ঘুরতেন, বেড়াতেন। বর্তমান আর অতীতের মধ্যে পার্থক্য হলো পোশাক মানে বোরকা মানে পর্দা। এটা ধর্মীয় পোশাক ব্যতিত অন্য কিছু নয়। ধর্ম আপনাকে ফাঁকা বুলি দিয়ে ভুলিয়ে অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে। পর্দার ভিতরে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।

এখন বিভিন্ন অফিস আদালতে গেলে বোরকা খুলে মুখ দেখাতে হয়, নইলে ভেতরে ঢোকার অনুমতি পাওয়া যায় না। ব্যাংক, পোস্ট অফিসে মুখ না খুললে টাকা দেয় না৷ ইন্ডোর অনেক বড় বড় রাজনৈতিক মিটিংগুলোতে বোরকা পরা মহিলাদের এলাউ না৷ একটা চাকরির এপ্লিকেশন করতে গেলেও আপনার মুখ দেখানো ছবি ছাড়া আপনার ছবি গ্রহণযোগ্য হবে না। আপনি বিসিএস, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা দিতে যান বোরকা খুলে আপনাকে পরীক্ষার হলে ঢুকতে হবে। এত না না শোনার পর আপনি কিভাবে বলবেন বোরকা ইজ মাই চয়েস? হিজাব আপনার চয়েস।

কারও পোশাক নিয়ে কথা বলা উচিৎ নয়, তা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই যদি হয়, সেদিন আমার সামান্য ব্রা এর ফিতা বের হয়ে যাওয়ার জন্য আপনার কেনো জ্বলেছে? বড় গলার ব্লাউজ পরেছি বলে আপনারা কেনো মুখ টিপে হেসেছেন, আলোচনা করেছেন? আমি শাড়ি পরলে পেট পিঠ দেখা গেলে কেনো আপনাদের শরীরে জ্বালা ধরায়? সেখানে কেনো আমার চয়েসটাকে আপনারা মেনে নিতে পারছেন না?

বেরিয়ে আসুন পর্দা থেকে। এই পর্দাই আপনার মস্তিষ্ককে অন্ধকার করে দিয়েছে। আপনার চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিকেও নিয়ন্ত্রণ করছে। যারা আপনাকে পর্দার ভিতরে ঢুকিয়েছে তারাই একদিন আপনাকে ঘরের এক কোনায় বন্দি করবে। তখন আপনার বাঙালী নারী জাগরণের অগ্রদূত এর নাম মনে করার পরে আফসোস এবং দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই বের হবে না।

‌দিনশেষে এটাই বলবো, বোরকা, হিজাব is not your choice. আপনার ধর্মীয় choice. আপনাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া অন্য কারও choice.

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।