সামাজিক কাঠামোঃ প্রতিষ্ঠা আর বিয়ে যেখানে মুখোমুখি

শনিবার, ফেব্রুয়ারী ২, ২০১৯ ৩:৩৮ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই একটা বিশাল লড়াই ই বটে! শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবন পদার্পণ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা পরিবর্তন।  শিক্ষাজীবন আর কর্মজীবনের মাঝে যে বিশদ ফারাক।  একদিকে গায়ে লেগে থাকে টগবগে তারুণ্য আর অন্যদিকে মাথা নত করা কর্মজীবনের নগ্ন সত্যতা।

পড়াশুনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লাগে। অনেকটা সময়।  সোনার বা রূপার চামচ মুখে নিয়ে না জন্মালে এই লড়াই বেশ কঠিন।  অফিস থেকে অফিসে পরীক্ষা, ইন্টারভিউ, নিজেকে উপস্থাপন করতে শিখা, ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে নিজেকে বেঁচতে জানতে হয়, আদর্শ বদল, আদর্শের অবস্থান বদল সব মিলিয়ে নদী থেকে মহাসমুদ্রে ডিংগী নৌকা নিয়ে হাবুডুবু খাওয়া আরকি।

এই অবস্থায় খাপ খাইয়ে নিতেও সময় লাগে।  সেই সময়েরই বড় অভাব আমাদের।  আগে মেয়েরা কুড়িতে বুড়ি ছিলো।  এখন বেশ একটা ডিসকাউন্ট পাওয়া গেছে।  টেনে হিঁচড়ে সেটা প্রায় ২৫ এ নিয়ে আসা গেছে।  পড়াশুনা শেষ করবে, একটা ডিগ্রী থাকবে, সবাই জানবে শিক্ষিত তবেই না হাটে দাম আরো বাড়বে।  পঁচিশ পেরিয়ে ধরুন তিরিশে পৌছে গেলে সেই আইব্যুড়ো মেয়েদের আর কোনো ঘর বা বর বা ভালবাসা নেই বা হতে পারেনা।  তাই এই ২৫ তীরবর্তী সময়ের চাপটাও খুব বেশি বাবা!

যেহেতু এই বয়সে অনেকেরই বিয়ে হয়ে যেতে থাকে। যারা বাকী থাকে তাদের দিকে সবাই প্রথমে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায় “আহারে মেয়েটার এখনো বিয়ে হয়নি”! সবাই ধরেই নেয়, কোনো বিশেষ একটা সমস্যার কারনে এমন ঘটছে।  যেখানেই যাক সবাই নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকবে নিজেদের মত করে ছেলে দেখার।

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেলো মেয়েটা আসলে বিয়েতে আগ্রহীই না! সেক্ষেত্রেও সবার প্রথম দুঃশ্চিন্তা, না জানি কি সমস্যা! “কোথায় ছ্যাকা খেয়েছো?”, “এমন পছন্দ আসবে যাবে কিন্তু জীবন থেমে থাকবে না”, “বয়ফ্রেন্ড আর হাজবেন্ড এক না”, “সঠিক মানুষ পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে”, “তোমার জন্য রাজপুত্র ঠিক আছে দেখো”, “তুমি কি ওইসব এন্টি ম্যারেজ দলের নাকি?”, “তুমি কি ফেমিনিস্ট টাইপ নাকি?”, “এই সব র‍্যাডিক্যাল ফেমিনিজম কিন্তু ভালো জিনিস না, তোমাদের বিয়ের সাথে সমস্যাটা কি বলতো” “ওহ আচ্ছা! বুঝেছি তুমি ফেমিনাজি”।  এদের বলা হয়- একলাই মেয়ের বাপ,একলাই ছেলের বাপ।  বিয়ের প্রতি অনীহার কারন উপরে বর্ণিতদের মাঝে যেকোনো একটা যেমন হতে পারে সেরকম কোনোটাই কারন নাও হতে পারে। 

ছোটো থেকে কথায় কথায় “অমুকটা না হলে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে”, “তমুকটা হলে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে” শুনে বড় হওয়া প্রজন্মের যদি বিয়ে সম্পর্কিত ভীতি থাকে তা কি খুব অস্বাভাবিক হয়?

একটা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থাটা এমন ছিলো যে এই বয়সী ছেলেদের মাঝে যেকোনো বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রতি একটা ভীতি দেখা যেতো যা “ফিয়ার অফ কমিটমেন্ট” হিসেবে প্রচলিত।  তারা নিজেদের মত করে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইতো, ঘুরতে চাইতো, দুনিয়া দেখতে চাইতো।  আর মেয়েরা পড়া শেষ করে ধরেই নিতো যে এবার তবে বিয়ে।  কেনোনা তাদের তাদের ঘুরা, দুনিয়া দেখা আর সমাজে সম্মানিত প্রতিষ্ঠা পাওয়া সবই নির্ভর করতো একটা “স্বামী”র ওপর।

কিন্তু বর্তমান সময়ে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের মাঝেও ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতনতা গড়ে উঠেছে।   বিষয়টা এমন ভাবে আসেনি যে “ছেলেরা করছে আমরাও করবো”। বিষয়টা এমন ভাবে এসেছে “আমার নিজেরও কিছু থাকতে হবে, গড়তে হবে”।  এ গড়ে তোলার তাগিদ সমাজ কাঠামোতে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনলেও তা নিতান্তই দুই পাতা শিক্ষার জোরে এসেছে নাকি সামাজিক বাস্তবতার কারনে অথবা দুইটা মিলিয়ে এসেছে সে নিয়ে বিশেষ কোনো গবেষনা হয়েছে বলে জানা যায় না।  তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে যে এখন অনেকেই বিয়ে করে প্রচলিত অর্থের নারীসুলভ আচরনে আর স্বচ্ছ্যন্দবোধ করছেন না।  

সঠিক সংগী পেলে বিয়ে হয়ে ওঠে আরাধ্য, কেননা এখানকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্মানের সাথে একসাথে বাস করার একমাত্র পথ হচ্ছে বিয়ে। আবার এখনো অনেকের কাছে বিয়ে হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন সেইরকম, অর্থাৎ একটা ক্যারিয়ার অপশন।  যে যেভাবে ভালো থাকবে তার জন্য সেই পথ বেছে নিতে কোনো সমস্যা তো নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরী হয় সেখানেই যেখানে বিয়ে একটা মেয়ের জীবনের সফলতার মাপকাঠি হয়ে যায়।  

পড়াশুনা শেষ করার পর পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা-সম্মানের সমন্বয় ঘটাতে যেকোনো ছেলেরই মাথার ঘাম পায়ে যেয়ে মিলায় সেইখানে একটা মেয়ের বেলায় প্রকটভাবে যুক্ত হয় লৈংগিক রাজনীতির সমীকরণ।  একইসাথে আরেকদিকে থাকে বুড়িয়ে গিয়ে বর না পাবার দুঃশ্চিন্তা।  সব মিলিয়ে যা মানসিক অবস্থা দাঁড়ায় তা সমাজের দৃষ্টিতে হয় ন্যাকামো অথবা দায়িত্ব থেকে পলায়ন।  আর সাথে তাড়াহুড়ো, পাছে তিরিশ না পেরিয়ে যায়!

বিয়ে হয়তো জীবনের একটা অংশ, কিন্তু সেটা কারো সফলতার মাপকাঠি না এমন কথা যেনো কানে শোনাও পাপ! আমার জীবন আরেকজনের উপস্থিতিতে সফল এ ধারণায় বিশ্বাসী হওয়ার সময় কি এখন আর আসলেও আছে? বিশেষ করে তখন যখন সেটা অচেনা কারো সাথে হয়।  যারা সেখানে আনন্দ খুঁজে নিতে পারে সেক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই কিন্তু এমন এক বাজি জেনে শুনে যদি কেউ এক হাত খেলতে না চায় তবে তাও কি অস্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা উচিত?

বিগত বছর গুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি নিয়ে গ্রাফ দেখা গেলেও এর আগে ও পরের কারন ও সমাধান নিয়ে যতটা গভীরভাবে আলোচনা হওয়া দরকার ছিলো তা আমাদের এইখানে কখনো হয় নি।  অথচ এই বিষয়ে গভীর আলোচনা আমাদেরকে দেখাতে পারতো প্রতিষ্ঠা আর বিয়ের বিরোধ আছে কি না বা থাকলে সেটা কোথায় আছে এবং কেনো আছে।

একটা মেয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা আর বিয়ের বিরোধের মূল জায়গা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বিয়ের পরের শিকলবদ্ধ অবস্থাকেই ধরা হয়।  শিকল বদ্ধ মানে এই না যে একবিংশ শতাব্দীতেও সবাইকে ঘরে বন্দী করে রাখা হয়।  কিন্তু এই সামাজিক বন্ধনে ত্যাগের বেশিরভাগ অংশ মেয়েটাকেই কাঁধে তুলে নিতে হয় যেইখানে তার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াইটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় অথবা আরো প্রতিবন্ধকতা পূর্ণ হয়ে যায়।

আর তাছাড়াও বলি কি, তিরিশের মাঝেই বিয়ে এই কঠোর সমীকরন নিয়ে আর কতদিন?।বিয়ে জীবনে স্বাভাবিক ভাবে লেখা থাকলে আসুক, নিজ পরিচয়ে যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা হোক মূল লক্ষ্য।  কেননা তিরিশে পর আমার দাম কমে যাবে এই চিন্তায় তাড়াহুড়া করে বিয়ে করে ফেললে কি আমি কখনও তিরিশে পৌছাব না? যে আমাকে তিরিশের পর দেখলে আর ভালোবাসবে না তার সাথে তিরিশের আগে বিয়ে করে ফেলে কি লাভ, তিরিশ পার হলে তো ভালবাসা পালাবে যে!


  • ৩২২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সাদিয়া রহমান

একটি বেসরকারী আইটি ফার্মে চাকরীরত। পাশাপাশি একজন নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা