মেয়ে তুমি পারবে একদিন, আর সেদিন যেনো অনেক দূরে না হয়

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৮, ২০১৮ ১১:০৪ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


মেয়ে তুমি আর কতো সহ্য করবে? ভ্রুন থেকে শুরু করে ছাই হওয়া পর্যন্ত -জন্মটাই যেনো আজন্ম পাপ তোমার। জন্মদাতা বাবা মেয়ে চায় না, তারপরও তুমি জন্ম নিলে -জীবনের প্রত্যেকটা স্তরে, অধ্যায়ে তোমার যুদ্ধ। কড়া পাহারার মধ্যেও তোমার শরীরের নিষিদ্ধ স্থানে লোভী ইতরের হাত, কী বিচ্ছিরি রকমের শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণা। তোমাদের কারো ক্ষত এতোটাই যে এই ট্রমাটাইজ হয়েই চলতে হচ্ছে। কাউকে বলতে পারছো না তুমি মেয়ে, তোমার কথা কেউ শুনবে না, বুঝবে না -মাকে বলবে? মা বলবে চুপ থাক কাউকে বলিস না -আত্মীয়? বন্ধু? কাকে?

আমি নিজেও বহুবার যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছি, বলতে পারি নি কাউকে সে কথা, নিজের ভুল নিজের অন্যায় ভেবে চুপ করে ছিলাম -কি যন্ত্রণা, কী মানসিক চাপ নিয়ে ছিলো এই ছোট্ট বালিকা মনটা আমার!

অপরাধবোধ নিজের কাধে বয়ে নিয়ে বেরিয়েছি -কোনোদিন কাউকে বলার সাহসটুকু পাই নি। বলবো কী, আমার কথা বুঝাতো দুরের কথা কেউতো শুনবেই না। ছিঃ! এগুলো আবার বলার মতো কথা নাকি? অথচ তারা ছিলো আমার কাছের মানুষ; আত্মীয়, শিক্ষক!

প্রথম যার সাথে প্রান খুলে সব বলতে পেরেছিলাম সেই মেয়ে অন্য কনো মেয়ে না আমার নিজের মেয়ে, গড় গড় করে বলে যাচ্ছিলাম ভিতরের সমস্ত অব্যক্ত যন্রনার কথা, এতটুকুন বাড়িয়ে বা কমিয়ে না -ঠিক যা ঘটেছিল তাই বলেছিলাম।

স্তব্ধ হয়ে চোখের পলক না ফেলে, কোনো প্রশ্ন না করে শুধু শুনে যাচ্ছিলো তার মায়ের জীবনের এবিউজিং-এর কথা। নীরবতারও একটা ভাষা থাকে, থাকে একটা চাপা আর্তনাদ, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের তীব্র ইচ্ছা। আমি খুব বুঝতে পারছিলাম ওর ভিতর কী ঝড় বয়ে যাচ্ছিলো! সব শুনে শুধু বললো আংকেল! আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বললাম, সাবধানে থাকিস মা এসব নরপশুদের হাত থেকে। সুযোগ পেলে এরা তোকেও ছাড়বে না।

মেয়েকে শিখেয়েছি কিভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, প্রতিবাদী হতে হয়, চোখ রাঙাতে হয়, রুখে দাঁড়াতে হয় যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে। অন্যায় মেনে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার বিষয় না। প্রতিবাদের বীজটা মেয়ের ভিতর বপণ করার চেষ্টা করেছি।

এবিউজড একটা মানুষ শুধু সেক্সুয়ালি বা ফিজিক্যালি হয় না; যেকোন বাজে কথা, বাজে ইঙ্গিত যেটা তোমাকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলবে, সেটাও এবিউজিং, মেন্টাল এবিউজিং। একটুও দেরী না করে উচিৎ জবাব দিবে, বিরুদ্ধাচারণ করবে, সে যেই হোক।

একটা ঘটনা না বলে পারছি না। নাম না প্রকাশের জন্য বিশেষ অনুরোধ করে তার জীবনের ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা ওভার ফোনে আমাকে বললো। ফোনটা রাখার পর আমি ১৫/২০ মিনিট শুধু চুপ করে বসে রইলাম, হাত পা রীতিমতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো শুনে, মাথা কাজ করছিলো না।

মেয়েটি নিজের আপন খালুর দ্বারা নিযার্তনের শিকার! এরচেয়ে ভয়াবহ হলো তার পরের চিত্র। পরিবারে ব্যপারটা জানাজানি হবার পর প্রত্যেকটা মানুষ মেয়েটির উপর আঙুল তুললো। তাদের অভিযোগ, মেয়ে তুই নিজেকে কেনো সামলে রাখলিনা? তোর ফরসা শরীর দেখলে যে কোন পুরুষের লোভতো হবেই। পুরুষদের একটু আধটু দোষ থাকেই, ওটা এমন কিছুনা।

নিজ খালার বাড়িতে আশ্রিত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটির মানসিক আর সামাজিক চাপের কথা চিন্তা করলেই দম বন্ধ হয়ে যায়, প্রচন্ড কান্না পায়, চরম অসহায় লাগে নিজেকে। ট্রমাটাইজিং এর এক্সট্রিম মুহুর্তেই হয়তো কোন মেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এই মেয়েটির বেলায় অবশ্য তা ঘটেনি। এখন সে দুই বাচ্চার মা। স্বামী সংসার নিয়ে সুখেই আছে। ও পেরেছে, সবাই পারে না।

আমি এদেরকে বলবো রেপিস্ট। বিকৃত রুচির এই মানুষ গুলো যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো মেয়ে/শিশুর যৌনাঙ্গ স্পর্শ করার লোভ সামলাতে না পারে, তবে এরা সুযোগ পেলে যে কাউকে ধর্ষণ করতে দ্বিতীয়বার ভাববে না।

আমি আমার এই পরিনত বয়সে এসেও আঙুল তুলে ওই পিসাচগুলোর চেহারা সবার সামনে তুলে ধরতে পারছি না। এরা এখনো আমার সামনে ঘুরে বেড়ায়, আমি পরে থাকি অনেক সামাজিক বেড়াজালে। তবু খুবই আশাবাদী, মেয়ে তুমি পারবে একদিন আর সেদিন যেনো অনেক দূরে না হয়।


  • ৩৯৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সাফিয়া শামা

স্বত্তাধিকারী এসএম শামা।

ফেসবুকে আমরা