সানজিদা সুলতানা

হিউম্যানিস্ট এক্টিভিস্ট

এইডস দিবসে কিছু কথাঃ

নব্বই দশকের শেষের দিকে এইডস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সাংস্কৃতিক জগতের প্রায় সকল তারকার ঠোঁটে একটা গান প্রচার হতো বিটিভিতে 'শোনো মানুষ' শিরোনামে। কোনো এক অজানা কারণে গানটির প্রতি আমার দারুণ আগ্রহ কাজ করতো আবার ভয়ও। একটা ভীতিকর ব্যাপার ছিলো গানটাতে। প্রথমে একটা কালো বিড়াল আসে, তারপরে গান।

আগে তো এতোকিছু বুঝতাম না। বড়োদের জিজ্ঞেস করলে বলতো, "এইটা একটা খারাপ রোগ, বড় হইলে বুঝবা।" সেটা বোধহয় পশ্চিমে বা আফ্রিকাতে এর প্রকোপ বৃদ্ধির ব্যাপারটা আবিষ্কৃত হবার প্রথম দিককার ঘটনা। তারপরে প্রথম দিকে দেখেছি এই নিয়ে জনসচেতনতায় বেশকিছু কাজ হয়েছে বাংলাদেশে। সেই সময়টা ছিলো 'চিঠি দিও প্রতিদিন' শেষ হচ্ছে হচ্ছে যুগ, ল্যান্ডফোনে, বড়জোর সারা বছরে দুই দেখা, এক প্রেম, এক বিয়ে এক জীবন এর যুগ। সময়ের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীপুরুষের অরক্ষিত সংস্রবও হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে রোগবালাইও বাড়ছে। এখন হলো ক্রাশ আসে ক্রাশ যায়, ব্রেক আসে, ব্রেক যায় এর যুগ। সবই বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে।

সময়ের সাথে সাথে আমাদের যৌনবাহিত রোগবালাই, শারিরীক সংস্রব নিয়ে সচেতনতা আরো অনেক বাড়ার কথা ছিলো। স্কুল, কলেজ পর্যায়ে যৌনশিক্ষার আয়োজন বাড়ার কথা ছিলো। বিশেষ করে বয়ঃন্ধিকাল, যখন ছেলেমেয়েরা শারিরীক, মানসিকভাবে খুবই নাজুক অবস্থায় থাকে, তখন তাদের অজানা অচেনা নিষিদ্ধ(!) আচরনের প্রতি কৌতুহলও অনেক বেশি থাকে। সেই সময়টাতে বিভিন্ন ক্ষতিকর ভুল উৎস থেকে এই সম্পর্কে ভুল ধারনা নিয়েই ছেলেমেয়েদের বড়ো হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। যার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজে।

দুঃখজনকভাবে হঠাৎ যৌনশিক্ষা নিয়ে একদম টু শব্দটি করা বন্ধ হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে গনমাধ্যমে এ ব্যাপারে আলোচনা, সমালোচনা কমতে কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে এলো। কেনো যেনো কাকের মতো সবার চোখ বন্ধ করে রাখার প্রবণতাও বাড়ছে। যেনো আমি চোখ বন্ধ করে রেখেছি বলে কোথাও কিচ্ছু ঘটছে না। সুস্থ নাগরিক জীবনের লক্ষ্যে জনসচেতনতাও বাড়ছে না। আমরা হয়তো ধরেই নিয়েছি, ছেলেমেয়ে এমনি এমনি সব জেনে বুঝে যাবে।

যৌনশিক্ষা নিয়ে আমাদের উপমহাদেশে প্রচলিত ধারনা হলো, পেনেট্রেশন জানতে পারলেই হয়ে গেলো শিক্ষা। আর এটা তো জানতে হয় না, এমনি এমনি সবাই জেনে যায়! কী যে ভয়ংকর ধারনা!

সঠিক যৌনশিক্ষা থাকে না বলে প্রথমত, যৌনবাহিত সংক্রমন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকে না। যার কারণে, একজনের যৌনবাহিত রোগ গোপন করার মাধ্যমে বহুজনের সংক্রমন হবার আশংকা থাকে। অথবা, কারো যে যৌনবাহিত রোগ আছে, তা সে জানতেই পারে না। অথবা জানলেও গোপন করার প্রবণতা থাকে। কারণ, সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করার মাধ্যমে জনগনের নিজের ব্যক্তিজীবনে প্রেম, বিচ্ছেদ আসা যাওয়া তো আর থেমে থাকে না, শারিরীক সংস্রবও থেমে থাকে না। সেক্ষেত্রে সচেতনতা এবং সচেতনতাই পারে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে। আর সেই সচেতনতা বৃদ্ধি করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আমি সবসময়েই মনে করি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সুতরাং ভূমিকায় থাকতে হবে প্রশাসনকে। এবং দ্বিতীয়টি হল মিডিয়া। সেখানে এখনো সরকারী বেতার, টেলিভিশনের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। এরপরেই আছে বেসরকারী মিডিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়ার বর্তমান করুণ মৃতপ্রায় দশা আমায় প্রতিনিয়ত ক্ষুদ্ধ, ব্যথিত এবং আহত করে। এক্ষেত্রে সরকারী না হলেও বেসরকারী মিডিয়া অন্তঃসারশুন্য সুড়সুড়ি পর্যায়ের নাটক সিনেমা ছাড়া সাধারন যৌনশিক্ষামুলক আয়োজনও প্রচার, প্রমোট করতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

এছাড়া সঠিক যৌনশিক্ষা থাকে না বলে আমাদের নারীপুরুষদের ভেতর যৌন হয়রানী কী, এবং উক্ত পরিস্থিতিতে করনীয় কী সেই সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকে না।

আমাদের কিশোর কিশোরীদের এ ব্যপারে কোনো জ্ঞান নেই, বলার কেউ নেই, শেখানোর কেউ নেই। এইজন্য অনেক শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেই দেখা যায় দিনের পর দিন, এমনকি বছরের পর বছর ধরে তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে থাকে এবং থেকেও কথা বলার জায়গা পায় না, অভিযোগ করার জায়গা পায় না, জানেও না কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। অনেকেই বিপর্যস্ত শৈশব কৈশোরের স্মৃতি বয়ে পরে আর কখনোই পুরোপুরি সুস্থ মানসিক অবস্থায় যেতে পারে না।

এক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিশুকিশোরদের প্রতি আমি অপরিসীম মর্মবেদনা এবং মমতা অনুভব করি। একে তো এরা বেশিরভাগ একদম প্রান্তিক অংশের প্রতিনিধি বলে সমাজের প্রিভিলাইজড অংশের কাছে অপাঙতেয়। দ্বিতীয়ত, আসলে প্রধানত, তাদের যৌন নিরাপত্তায় প্রশাসনের ভূমিকা থাকে শুণ্যেরও কম। হাজারে, লাখে, কোটিতে একটি হত্যা, আত্মহত্যার খবর মিডিয়ায় এলে জনগন ইস্যুর গুরুত্ব, আরো জনপ্রিয় ইস্যুর তাৎক্ষণিক অভাব থাকলে সেটা বুঝে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায়। প্রশাসন কখনো নড়ে বসে, কখনো বেখেয়ালে, অসততায় ধুলো পড়ে যায় খুব দ্রুত। সমাজের এই বিরাট একটি অংশ সঠিক যৌনশিক্ষা থেকে একটা জীবন একদম অন্ধকারেই থেকে যায় যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক প্রজন্মে পড়ে। আবার তারাই যখন একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরে সাংস্কৃতিক সামাজিক প্রভাববিস্তারকারী অংশের প্রতিনিধি হয়ে যায়, তখন তাদের লব্ধ অবৈজ্ঞানিক, অরক্ষিত তথ্য জনমনে বিস্তৃত হয়, তখন খুব খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যায়। আমাদের মাদ্রাসাক্ষেত্রে তারা কী শিখলো, কী জানলো, কতোটুকু যত্ন পেলো, কীভাবে বড় হলো, এসব ব্যাপারে প্রশাসনকে খুব উদাসীন দেখা যায়। তারা হয়তো এটা ভাবেন না, কয়েকবছর পরে এই অবহেলিত গোষ্ঠীটিই সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীতে পরিণত হবে। যার উদাহরণ আমরা বর্তমানে চারপাশে তাকালেই দেখতে পাই। সুতরাং ছোটবেলা থেকে যদি তাদের শারিরীক, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিতে না পারি, বড়ো হলে তারা যে নির্যাতক হবে না, সেটা ভাবাই বরং উচ্চাশা।

এছাড়া গ্রামপর্যায়ে যৌনশিক্ষার অভাব শহর থেকে অনেক অনেক বেশি। বাংলাদেশ মানে তো কেবল নাগরিক কয়েকটি শহর নয়। এর গ্রামগুলোই এর প্রাণ।

আমাদের দেশে যৌনকর্মীরা কিছু এনজিও বা বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী মাধ্যমে কিছুটা ধারণা পেলেও, তারা যেহেতু সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত গোষ্ঠী, তাদের জ্ঞান খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না খদ্দেরদের উপর। বাকিরাও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেরা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন এবং তাদের শারীরিক সংস্পর্শে যারা আসে তাদেরও ঝুঁকির মধ্যে রাখেন।

এছাড়া আমাদের যৌনপল্লীর মেয়েরা যেই ভয়াবহ, নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করেন, সেই কাহিনী বেঁচে পশ্চিমাদের মরাকান্না দেখতে দেখতেও ক্লান্তবোধ করি।

তবে এর কারণ কী, এর প্রতিকারের উপায় কী, সমাজপতিত মেয়েগুলোর জীবন/স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা এবং সমাজের অংশ তাদের ক্লায়েন্টদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, এসব নিয়ে তেমন কোথাও কোনো টু শব্দটি নেই এই তীব্র রক্ষণশীল সমাজে। যেনো আলোচনার মাধ্যমেই যৌনবাহিত রোগ ছড়িয়ে যাবে। আসলে ব্যাপারটি তো উল্টো, তা বোঝাবে কে?

আমি অনেকের সাথেই শেয়ার করেছি, নিজে ব্যক্তিগতভাবে ক্লাস নাইনে পড়া সময়ে বাংলাদেশ রাইফেলস স্কুল ইউনেস্কো থেকে কয়েক বান্ডিল কিশোর যৌনশিক্ষার বাংলা বই পাই এক সাবেক শিক্ষানবিশ শিক্ষকের মাধ্যমে। বইগুলো সকালে আমাদের বিতরণ করে ছুটির আগেই দুপুরে ফেরত নেয়া হয় কিছু রক্ষনশীল শিক্ষকের তীব্র আপত্তির কারণে। এতে আমাদের নৈতিক চরিত্রের স্খলন হবে বলে তাদের বিশ্বাস ছিলো। এই যদি হয় ঢাকার একটি প্রতিযোগীতাপূর্ণ পরিচিত বিদ্যালয়ের চিত্র, তাহলে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। শিশুকিশোররা যে শিখবে, তাদের যে শেখাবে, সেই শিক্ষকদের শেখাবে কে যৌনশিক্ষার গুরুত্ব? উল্টো দেখা যায়, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো কোনো শিক্ষকই জড়িত থাকেন হয়রানীতে। বেশিরভাগ শিক্ষকই ধরলাম ভালো। কিন্তু বাচ্চাদের যদি আগে থেকেই শেখানো হতো, যে এমন পরিস্থিতিতে করনীয় কী, এবং এইক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি আর তার অধিকার কী, তাহলে তো তারাও উক্ত অনৈতিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনী অভিযোগে যাওয়ারও সাহস পেতো। কিন্তু না, আমাদের দেশে সকল অপরাধের বড় অপরাধ হল, যৌনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা৷

এই যে যৌনতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জানাশোনা হচ্ছে না, তাতে কি বিভিন্ন অবিশ্বাস্য, ক্ষতিকর সোর্সগুলো থেকে ছেলেমেয়েদের অসত্য ভুল তথ্য পাওয়া কমছে? নারীপুরুষের অরক্ষিত সংস্রব কমছে? রোগবালাই কমছে? যৌনবিকৃতি কমছে? ধর্ষন কমছে? যৌন হয়রানী কমছে? যদি না কমে সবগুলোই বেড়ে থাকে, তাহলে আমাদের কেনো মনে হয় না, আমাদের রক্ষনশীল মানসিকতায় গলদ আছে? কেনো মনে হয় না সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে যৌণশিক্ষার গুরুত্ব দেয়ার দরকার আছে। যেই সকল প্রানীর যৌন প্রজনন হয়, তারা সকলেই প্রাকৃতিকভাবে যৌনতাশক্তি প্রাপ্ত। তাদের কারো যৌনশিক্ষা নেই বলে কি মানুষেরও দরকার নেই?

আজকে একুশ শতকে এসে কেনো যৌনশিক্ষা প্রয়োজনীয়, সেটা নিয়েও কাউকে কাউকে এতো বড় বড় রচনা লিখতে হয় ভাবলে কষ্টই লাগে। যদি প্রশাসন বুঝতে না পারে, যদি আমরা নিজেরাও বুঝতে না পারি তাহলে অন্ধকার থেকে অন্ধকারের দিকে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।

692 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।