নারীবাদ মানে পুরুষকে ঘৃণা নয়

বুধবার, জানুয়ারী ৩০, ২০১৯ ৫:৫৮ PM | বিভাগ : ওলো সই


নারীবাদ মানে কি? এক কথায় বলতে গেলে আমার কাছে নারীবাদ হচ্ছে -নারী পুরুষ একে অপরের সহযোগী হওয়া, নিজেকে অপরের চেয়ে উচ্চতর মনে না করা।

আমি সমান অধিকারে বিশ্বাসী। মফস্বল থেকে উঠে আসা অল্প বয়সে ঘর ছাড়া হয়ে জীবন থেকে যা অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে তা থেকেই সমান অধিকারে বিশ্বাস করি।

দুই দশক আগে এদেশে এসে অড-জব করার ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনার গণ্ডি ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত গড়িয়েছি। বিদেশে এসে সাধারণত মানুষ পড়ার ফাঁকে কাজ করে আর আমি কাজের ফাঁকে পড়েছি। এর মধ্যেই দেশে ফেলে আসা বাপ-মা, ভাইবোনের দায়িত্ব নিয়েছি কারো অনুরোধ বা উপদেশে নয়, নিজ থেকে। নিজেকে কখনও মেয়ে বা ছেলে মনে হয় নি, মনে হয়েছে বড় সন্তান। বড় সন্তানরা সাধারণত যেমন হয় আমিও তার চেয়ে ব্যতিক্রম নই।

সময়ের তোড়ে পছন্দের মানুষকে বিয়ে করেও বিচ্ছেদে গিয়েছি কারণ নিজেকে কখনও পুরুষ বা নারী মনে হয় নি, মনে হয়েছে একজন ব্যক্তি। একজন ব্যক্তির আত্মসম্মানবোধ থাকে, সে আত্মসম্মানবোধের সাথে কম্প্রোমাইজের সীমা থাকে আর সে সীমা অতিক্রম হলে তাতে রেখা টানতেই হয় নইলে মেরুদণ্ডহীন হয়ে যেতে হয়৷ মেরুদণ্ডহীন হয়ে বাঁচার চেয়ে না বাঁচাই ভালো - এটা আমার মনে হয়েছে। সবার একইরকম মনে হতে হবে তা নয়।

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এত বছরে কখনও মনে হয় নি অন্য কোনো পুরুষ বা নারীর চেয়ে আমার পারিশ্রমিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা কোনো অংশে কম। সমান অধিকারের বিষয়টিতে আপোষহীন নিজের অভিজ্ঞতার কারনণেই। শারীরিক শক্তি পুরুষের একভাবে বেশী আর নারীর অন্যভাবে বেশী।

কোনো চাকরীতে নারী বলে বেতনে কম্প্রোমাইজও করি নি। যে যোগ্যতায় ক্যারিয়ারের যে পর্যায়ে থাকার কথা ঠিক সেখানেই আছি আপোষহীনভাবেই। নিজের পরিশ্রমে বিশ্বাসী বলেই কখনও বাবার কাছে বা অন্য কোনো পুরুষের উপর নির্ভরশীল হওয়ার চিন্তা একমুহূর্তের জন্যও আসে নি কোনোদিন। হতে হয় নি।

এতগুলো বছর ধরে একা আছি, বাচ্চা বড় করছি একাগ্রতা দিয়ে, নিরিবিলি সুন্দর একটা সংসার সাজিয়েছি নিজের মতো করে। এসবে নিজের চাওয়াটাই বড়। মানুষ চাইলে কি না পারে! চাওয়া পুরণের জন্য নারী বা পুরুষ ব্যপার নয়; মানুষই ব্যাপার। ছোটবড় নিত্যদিনের কঠিন সময়গুলি সামলে নেই আর দশটা মানুষের মতোই।

কখনোই পুরুষ বা পুরুষের মতো হতে চাই নি, এখনও চাই না। প্রকৃতি আমাকে যেমন করে বানিয়েছে তেমনভাবেই আমি পরম কৃতজ্ঞ।

আমি কৃতজ্ঞ যে আমি একজন নারী, একজন মা। আমি কৃতজ্ঞ যে আমার বুদ্ধিমত্তা নারী-পুরুষ-সাদা-কালো নির্বিশেষে সমান। কেউ আমার ব্যক্তিসত্তার উপর জবরদস্তি করবে না, আমিও কাউকে করবো না।

সমান অধিকার মানে স্বাধীনভাবে একজন নারী হয়ে নিজের জায়গায় বেঁচে থাকা। নারীবাদ কেবল নারীর জন্য তা নয়, একজন পুরুষ যখন আশেপাশের নারীদের স্বাধীনভাবে সমান অধিকার নিয়ে বাঁচার অধিকারটা বুঝে নিজেকে উচ্চতর শ্রেণির মনে না করে সেটাও নারীবাদ।

আমার নারীত্ব আমার অহংকার। নারী-পুরুষ একে অপরের সহযোগিতায় নিজের মতো বাঁচাই সমান অধিকার। জাত-ধর্ম-বর্ন-লিঙ্গ সবকিছুর উর্ধ্বে সবাই মানুষ।

নারীবাদ মানে পুরুষকে ঘৃণা নয়, পুরুষ হতে চাওয়া নয়, উচ্ছন্নে যাওয়া নয়, উগ্রতা নয় বরং যার যার জায়গায় সে সে সমান অধিকার নিয়ে থাকা, নিজেদের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে। নারীবাদ মানে নিজেকে বিশেষ কিছু মনে করা নয়। নারীবাদ উশৃঙ্খল কিংবা বেপরোয়া জীবনের চাবিকাঠি তো অবশ্যই নয়।


  • ৪৩৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

সানজিদা রোমান

লেখক একজন প্রবাসী

ফেসবুকে আমরা